উয়েফা নেশনস লিগের আসন্ন দুটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ক্রোয়েশিয়া ও স্পেনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইংল্যান্ড। এই দুই ম্যাচের জন্য ২৫ সদস্যের দল ঘোষণা করেছেন থ্রি লায়ন্সদের হেড কোচ থমাস টুখেল। দল গঠনে বেশ কয়েকটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই জার্মান কৌশলবিদ। ফর্ম ও ফিটনেস থাকা সত্ত্বেও স্কোয়াডে জায়গা পাননি চেলসির তারকা আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার কোল পালমার, ম্যানচেস্টার সিটির ফিল ফোডেন এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের তরুণ মিডফিল্ডার কোবি মাইনু। তবে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের জ্যেষ্ঠ জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা জুড বেলিংহামের ছোট ভাই জোবে বেলিংহাম এবং ফুলহামের ১৯ বছর বয়সী উদীয়মান মিডফিল্ডার জশ কিং। স্কাই স্পোর্টস ফুটবলের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই দল ঘোষণার বিষয়টি বিস্তারিত নিশ্চিত করা হয়েছে।
চেলসির হয়ে এই মৌসুমে ১১টি ম্যাচে অংশ নিয়ে ৫টি গোল এবং ৩টি অ্যাসিস্ট করার পরও জাতীয় দল থেকে বাদ পড়া কোল পালমারের জন্য এটি এক বড় ধাক্কা। গত গ্রীষ্মের বিশ্বকাপে বাদ পড়ার পর সেপ্টেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতিতে সামান্য ফিটনেস সমস্যার কারণে স্কোয়াড থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন এই চেলসি তারকা। তবে বৃহস্পতিবার চেলসি মেডিকেল দলের সাথে যোগাযোগের পর স্কাই স্পোর্টস নিউজ নিশ্চিত করে যে, পালমার শতভাগ ফিট ছিলেন এবং আসন্ন নেশনস লিগের ম্যাচ খেলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন। এরপরেও তাকে দলে না রাখার বিষয়ে টুখেল স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সিদ্ধান্তটি ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নয়। তিনি জানান, জাতীয় দলের আন্তর্জাতিক ক্যাম্পে খেলোয়াড়দের উপস্থিতি ও পারফরম্যান্সকে তিনি অগ্রাধিকার দেন। ক্যাম্পের সুযোগগুলো বারবার হাতছাড়া করার কারণেই پالমার আপাতত এই তালিকায় পিছিয়ে পড়েছেন, তবে তার জন্য ভবিষ্যতের দরজা সবসময়ই খোলা রয়েছে।
একইভাবে বাদ পড়েছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোবি মাইনু ও ম্যানচেস্টার সিটির ফিল ফোডেন। বিশ্বকাপের স্কোয়াডে থেকেও কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ না পাওয়া মাইনু পূর্ববর্তী জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে অজ্ঞাত আঘাতের কারণে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। অন্যদিকে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে টানা ছয় ম্যাচে ছয়টি গোলে সরাসরি অবদান রাখা সত্ত্বেও ফোডেনের কপাল খোলেনি। গ্রীষ্মের টুর্নামেন্ট ও শরতের স্কোয়াডের পর আবারও টুখেলের আস্থার বাইরে থেকে গেলেন এই ফরোয়ার্ড। টুখেল স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, যারা জাতীয় দলের ডাকে সাড়া দিয়ে ক্যাম্পে উপস্থিত থাকেন এবং নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দেন, তারাই তার দলে পুরস্কৃত হবেন।
### উদীয়মান তরুণ তারকারা ও প্রত্যাবর্তনকারীদের সুযোগ
তারকা খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতি আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চে নতুনদের সুযোগ করে দিয়েছে। বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে আলো ছড়ানো জোবে বেলিংহাম জ্যেষ্ঠ দলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে বড় ভাই জুড বেলিংহামের সতীর্থ হিসেবে জাতীয় দলে প্রবেশ করলেন। একই সাথে ফুলহামের ১৯ বছর বয়সী মিডফিল্ডার জশ কিংয়ের ডাক পাওয়া টুখেলের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আলভারো আরবেলোয়ার অধীনে ফুলহামের হয়ে চলতি মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের প্রতিটি ম্যাচে একাদশে মাঠে নেমেছেন কিং। তিনি ক্লাবের রেকর্ড সাইনিং ইমিল স্মিথ রোকে পেছনে ফেলে ১০ নম্বর পজিশনটি নিজের করে নিয়েছেন। প্রিমিয়ার লিগে এ পর্যন্ত ২টি গোল ও ১টি অ্যাসিস্ট করা এই তরুণের মূল শক্তি প্রতিপক্ষের বক্সে তার প্রভাব; এ মৌসুমে প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে রেকর্ড ৫৭টি টাচ করেছেন তিনি, যা আর্লিং হাল্যান্ড কিংবা জেরেমি ডোকুর চেয়েও বেশি।
রক্ষণভাগ ও স্কোয়াডের অন্যান্য পজিশনেও এসেছে বেশ কিছু রদবদল। ২০২২ বিশ্বকাপের সময় তৎকালীন কোচ গ্যারেথ সাউথগেট ও স্টিভ হোল্যান্ডের সাথে বিতর্কের পর দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে থাকা আর্সেনাল ডিফেন্ডার বেন হোয়াইট পুনরায় স্কোয়াডে ফিরে এসেছেন। গত মার্চে উরুগুয়ের বিপক্ষে ওয়েম্বলিতে সমর্থকদের কাছ থেকে দুয়ো ধ্বনি শুনলেও আর্সেনালের হয়ে ফুল-ব্যাক পজিশনে চমৎকার পারফরম্যান্সের কারণে টুখেল তাকে ফিরিয়ে এনেছেন। ৭টি প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচে ৩টি অ্যাসিস্ট করা হোয়াইটের বহুমুখী খেলার ক্ষমতা দলকে বাড়তি শক্তি জোগাবে। চোট কাটিয়ে দীর্ঘ সময় পর স্কোয়াডে স্থান পেয়েছেন ইন্টার মিলানের ডিফেন্ডার ডেড স্পেন্স। রিয়াল মাদ্রিদের রাইট-ব্যাক ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড স্কোয়াডে নিজের স্থান ধরে রাখতে সক্ষম হলেও চোটের কারণে বাদ পড়েছেন ট্রেভো চ্যালোবাহ ও টিনো লিভরামেন্টো। তাছাড়া ম্যানচেস্টার সিটির বাম-ব্যাক নিকো ও'রাইলি শতভাগ ফিট না থাকায় বাদ পড়েছেন।
আক্রমণভাগ ও মধ্যমাঠে চোটের আঘাত বেশ প্রকট। অ্যালেক্স স্কট উরুর চোটের কারণে ছিটকে যাওয়ায় স্কোয়াডে সুযোগ পেয়েছেন এভারটনের জেমস গার্নার। বুকাও সাকা ও মার্কাস রাশফোর্ড চোটজনিত কারণে বাইরে থাকায় তাদের শূন্যস্থান পূরণে ডাকা হয়েছে নটিংহ্যাম ফরেস্টের মরগান গিবস-হোয়াইট এবং লিভারপুলের তরুণ ফরোয়ার্ড রিয়ো এনগুমোহাকে। অবশ্য আর্সেনালের উইঙ্গার নোনি মাদুয়েকে এবারও সুযোগ পাননি। সব মিলিয়ে থমাস টুখেলের এই নতুন ২৫ সদস্যের থ্রি লায়ন্স স্কোয়াড ক্রোয়েশিয়া ও স্পেনের শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেমন পারফর্ম করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
চূড়ান্ত ২৫ সদস্যের থ্রি লায়ন্স স্কোয়াড: গোলরক্ষক: জর্ডান পিকফোর্ড (এভারটন), জেসন স্টিল (ব্রাইটন অ্যান্ড হাভ অ্যালবিয়ন), জেমস ট্রাফোর্ড (লিডস ইউনাইটেড)। রক্ষণভাগ: জারার্ড ব্রান্থওয়েট (এভারটন), মার্ক গেহি (ম্যানচেস্টার সিটি), লুইস হল (নিউক্যাসেল ইউনাইটেড), এযরি কোনসা (আর্সেনাল), জ্যারেল কোয়ানসা (বায়ার লেভারকুজেন), ডেড স্পেন্স (ইন্টার মিলান), ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড (রিয়াল মাদ্রিদ), বেন হোয়াইট (আর্সেনাল)। মিডফিল্ডার: এলিয়ট অ্যান্ডারসন (ম্যানচেস্টার সিটি), জুড বেলিংহাম (রিয়াল মাদ্রিদ), জোবে বেলিংহাম (বরুসিয়া ডর্টমুন্ড), এবেরেচি এজে (আর্সেনাল), জেমস গার্নার (এভারটন), জশ কিং (ফুলহাম), মাইলস লুইস-স্কেলি (আর্সেনাল), ডেকলান রাইস (আর্সেনাল)। আক্রমণভাগ: ডমিনিক কালভার্ট-লুইন (লিডস ইউনাইটেড), মরগান গিবস-হোয়াইট (নটিংহ্যাম ফরেস্ট), অ্যান্থনি গর্ডন (বার্সেলোনা), হ্যারি কেইন (বায়ার্ন মিউনিখ), রিয়ো এনগুমোহা (লিভারপুল), মরগান রজার্স (চেলসি)।