উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বের চতুর্থ রাউন্ডের হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে অনুষ্ঠিত হলো এক মহানাটকীয় লড়াই। ম্যাচের প্রথম ৪৫ মিনিটে রোমার আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড মাতিয়াস সুলে নিজের প্রতিভার চূড়ান্ত স্বাক্ষর রেখে দলকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। তবে বিরতির পর ২৮ মিনিটের এক বিধ্বংসী ঝড়ে তিন গোল ফিরিয়ে দিয়ে ৩-২ ব্যবধানের এক ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিয়েছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।
স্প্যানিশ ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম ইনফোবায়ে দেপোর্তেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথমার্ধে সুলের একক নৈপুণ্যে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের স্বাগতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একপ্রকার ভেঙে পড়েছিল। ম্যাচের ১০ম মিনিটে রদ্রিগো মোরার একটি দীর্ঘ ক্রস-ফিল্ড পাস বক্সের ডান কোণে নিয়ন্ত্রণে নেন সুলে। অত্যন্ত নিপুণতার সাথে বাঁ পায়ের মাপা শটে বল দূরবর্তী পোস্টে পাঠায় এই তরুণ ফরোয়ার্ড। এটি ছিল উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে সুলের ক্যারিয়ারের প্রথম গোল।
গোল করার ছয় মিনিট পরেই আবারও ডান প্রান্ত ধরে আক্রমণে ওঠেন মার ডেল প্লাতায় জন্মগ্রহণকারী এই ফুটবলার। নিজের ডান পায়ে বল স্থানান্তরিত করে জোরালো শট নেন তিনি, যা বক্সের ভেতর ইউনাইটেড ডিফেন্ডার এইডেন হেভেনের হাতে লাগে। রেফারি সাথে সাথে পেনাল্টির বাঁশি বাজান। ১৭তম মিনিটে সেই পেনাল্টি থেকে গোল করে রোমার ব্যবধান ২-০ করেন দনিয়েল মালেন। প্রথমার্ধের শেষ ভাগে নিজের দ্বিতীয় গোলটি পেয়েই যেতেন সুলে, কিন্তু তার দূরপাল্লার জোরালো শট গোলপোস্টে লেগে প্রতিহত হয়।
মাঠে সুলের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি তার আক্রমণাত্মক মেজাজেরও দেখা মেলে। প্রথমার্ধের খেলা চলাকালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেস রোমার ডিফেন্ডার মারিও হারমোসোকে একটি ‘কাণো’ (পায়ের নিচ দিয়ে বল গলানো) করলে চটে যান সুলে। আর্জেন্টাইন এই ফরোয়ার্ড সরাসরি ফার্নান্দেসের মুখোমুখি হন। উত্তেজনার একপর্যায়ে পর্তুগিজ তারকা সুলের থুতনির নিচে হাত তুললে, ভেলেজ সার্সফিল্ডের প্রাক্তন খেলোয়াড় সুলে তাকে সজোরে ধাক্কা দেন। পরবর্তীতে রোমা সতীর্থ ব্রায়ান ক্রিস্তান্তে দ্রুত এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। প্রথমার্ধে দলকে এমন ছন্নছাড়া খেলতে দেখে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের স্বাগতিক সমর্থকরা গ্যালারি থেকে দুয়োধ্বনি দিতে থাকেন।
এর আগে ‘মাঠের খবর’-এর ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছিল যে, আটলেতিকো মাদ্রিদ বনাম বাভের্ন মিউনিখ লড়াইয়ের পাশাপাশি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও রোমার ম্যাচটি ছিল ইউরোপীয় ফুটবল ক্যালেন্ডারের এই সপ্তাহের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচগুলোর একটি। তবে এই ম্যাচের আগে ইউনাইটেডের পরিস্থিতি মোটেও অনুকূলে ছিল না। গত ৩০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ‘মাঠের খবর’ তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, টানা আট ম্যাচে জয়হীন থাকা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ড্রেসিংরুমে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল এবং অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেসসহ জ্যেষ্ঠ খেলোয়াড়দের অসন্তোষের কারণে চরম চাপের মুখে ছিলেন কোচ মাইকেল ক্যারিক।
### দ্বিতীয়ার্ধে ইউনাইটেডের ঘুরে দাঁড়ানো ও নাটকীয় জয়
বিরতির পর ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামে স্বাগতিক ইউনাইটেড। ম্যাচের ৫৭তম মিনিটে (দ্বিতীয়ার্ধের ১২তম মিনিট) রোমা ডিফেন্ডার জিয়ানলুকা মানচিনি বক্সে ম্যাথিউস কুনহাকে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় ইউনাইটেড। সুনির্দিষ্ট শটে গোল করে ব্যবধান ১-২ করেন ব্রুনো ফার্নান্দেস, যা স্বাগতিকদের ম্যাচে ফেরার অক্সিজেন জোগায়। ডিফেন্স সামলাতে ৭৪তম মিনিটে আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে মাঠে নামান ক্যারিক। অন্যদিকে রোমাও আক্রমণ সতেজ করতে শেষ দিকে আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড সান্তিয়াগো কাস্ত্রোকে বিকল্প হিসেবে খেলায় টান।
ম্যাচটি যখন রোমার দিকেই হেলে ছিল, ঠিক তখনই শেষ বাঁশির কয়েক মিনিট আগে তাণ্ডব চালান ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড ম্যাথিউস কুনহা। ৮২তম মিনিটে (দ্বিতীয়ার্ধের ৩৭তম মিনিট) দারুণ এক ফিনিশিংয়ে সমতা ফেরান কুনহা (২-২)। এর ঠিক তিন মিনিট পর, ৮৫তম মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করে দলকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে নেন তিনি। মাত্র ২৮ মিনিটে তিন গোল ফিরিয়ে দেওয়ার এই অবিশ্বাস্য কীর্তিতে স্তব্ধ হয়ে পড়ে রোমা শিবির। তবে খেলার ৯০তম মিনিটে এক কড়া ফাউল করে সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন কুনহা, ফলে শেষ কয়েক মিনিট ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় স্বাগতিকদের।
গত ৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে ‘মাঠের খবর’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দ্বিতীয়ার্ধের এই ঝোড়ো জয়ে কোচ মাইকেল ক্যারিক সাময়িক স্বস্তি পেলেও ইউনাইটেডের খেলায় এখনো গভীর কৌশলগত দুর্বলতা স্পষ্ট। অপরদিকে, ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের এই ম্যাচের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই সুলে খবর পান যে, আর্জেন্টিনার জাতীয় দল প্রধান লিওনেল স্কালোনি তাকে নভেম্বর মাসের প্রীতি ম্যাচের স্কোয়াডে ডাক দিয়েছেন। আর্জেন্টিনা দল আগামী সপ্তাহে উরুগুয়ে ও কোস্টারিকার মুখোমুখি হবে, যেখানে রোমার সহকর্মী লিওনার্দো বালার্দি ও সান্তিয়াগো কাস্ত্রোর পাশাপাশি প্রতিপক্ষ লিসান্দ্রো মার্তিনেসও সতীর্থ হিসেবে থাকছেন। পরাজয় সত্ত্বেও সুলের প্রথমার্ধের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স তার আন্তর্জাতিক এবং ক্লাব ক্যারিয়ারে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে।