ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের বর্তমান শক্তিমত্তার সমীকরণে ম্যানচেস্টার সিটির সমর্থকদের মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা তুলে ধরা হয়—তাদের ক্লাবটি নাকি ঐতিহ্যবাহী লিগ পরাশক্তি 'রেড কার্টেল' অর্থাৎ আর্সেনাল, লিভারপুল এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক দুর্গ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সিবিএস স্পোর্টসের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তত্ত্বের পেছনের বাস্তবতা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়মভঙ্গের ১১৪টি অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক শুনানির প্রেক্ষাপটে এই তথাকথিত রেড কার্টেলের প্রভাব কতটা সত্য তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ম্যানচেস্টার সিটির সমর্থক এবং ক্লাবটির প্রধান নির্বাহী ফেরান সোরিয়ানো যখন প্রিমিয়ার লিগের 'ষড়যন্ত্র তত্ত্ব' নিয়ে কথা বলেন, তখন তাদের নিশানা থাকে মূলত পুরনো তিন পরাশক্তি। সিটির সমর্থকদের মতে, ম্যানচেস্টার সিটিকে ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠতে না দেওয়ার জন্যই 'রেড কার্টেল' এই ষড়যন্ত্র রচনা করেছে। অথচ ৯টি মৌসুমে লিগের ১১৪টি নিয়মভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে ক্লাবটির বিরুদ্ধে। সিবিএস স্পোর্টসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখাতে তথাকথিত ভুয়া চুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। পেপ গুয়ার্দিওলার অধীনে ম্যানচেস্টার সিটি শতপয়েন্ট অর্জন সহ চার মৌসুমের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলেও, নিয়মভঙ্গের এই গুরুতর অভিযোগ তাদের সাফল্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সাবেক চেলসি মিডফিল্ডার জো কোল সম্প্রতি মন্তব্য করেছিলেন যে, প্রিমিয়ার লিগ এবং উয়েফার বর্তমান লাভ ও স্থায়িত্ব সম্পর্কিত নিয়মাবলী (পিএসআর) নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষী ক্লাবগুলোর পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, লেভেল প্লেইং ফিল্ড বা সমান সুযোগের জায়গায় যখন কোনো দল বিশাল অঙ্কের ভুয়া চুক্তির আশ্রয় নেয়, তখন নিয়মকানুনের সঠিক কার্যকারিতা বিচার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
### 'রেড কার্টেল' ধারণার বাস্তবতা এবং ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান
সিবিএস স্পোর্টসের তথ্য অনুযায়ী, লাল জার্সি পরিহিত এই তিন ক্লাব প্রিমিয়ার লিগ শাসন করে এসেছে—এমন দাবি ঐতিহাসিক তথ্যের সাথে পুরোপুরি মেলে না। ২০২৬-২৭ মৌসুমেই প্রথমবার ২০০৯-১০ মৌসুমের পর আর্সেনাল, লিভারপুল এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড—এই তিনটি দলই একসঙ্গে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার সুযোগ পেল। ২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শেখ মনসুর ম্যানচেস্টার সিটি কেনার পর বিগত ১৭ বছরে এই তিন লাল ক্লাবের কখনোই একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল না। এই সময়ে আর্সেনাল ও লিভারপুল দুইবার করে অষ্টম স্থানে শেষ করেছিল, অন্যদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডও পয়েন্ট তালিকায় মারাত্মক ধসের মুখোমুখি হয়।
ঐতিহাসিকভাবে ১৯৯৬ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যবর্তী সময়টি ছিল ব্যতিক্রম, যেখানে ১১টি মৌসুমের মধ্যে ১০টিতেই এই তিন দল শীর্ষ চারে ছিল। কিন্তু সিটি অধিগ্রহণের আগে বা পরে সার্বিকভাবে তিন দলের যৌথ আধিপত্য খুব কমই দেখা গেছে। ২০০৭ সালে সিটি অধিগ্রহণের আগের বছর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের রাজস্ব ছিল ৩২৪.৮ মিলিয়ন ইউরো, যা ইউরোপে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সেই সময় ম্যানচেস্টার সিটির আয় ছিল মাত্র ১০৪ মিলিয়ন ইউরো, যা তাদের ডেলয়েট মানি লিগে ২০তম স্থানে রেখেছিল। অথচ ২০২৪-২৫ মৌসুমে এসে লিভারপুল ৮৩৬.১ মিলিয়ন ইউরো আয় করে শীর্ষে রয়েছে এবং অ্যাস্টন ভিলার মতো দল ৪৫০.২ মিলিয়ন ইউরো আয় করছে।
ফুটবল অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ কিয়ারান ম্যাগুইয়ারের মতে, প্রিমিয়ার লিগ নিজেই এখন একটি 'সুপার লিগ'-এ পরিণত হয়েছে। যদিও ঐতিহাসিক পরাশক্তিরা ক্ষমতার কাঠামো ধরে রাখতে চেয়েছে, যেমন ২০২০ সালের অক্টোবরে লিভারপুল ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মালিকদের আনা 'প্রজেক্ট বিগ পিকচার' প্রস্তাব—যেখানে প্রিমিয়ার লিগের দল সংখ্যা কমানো এবং ৩২৫ মিলিয়ন ডলারের তহবিল জোগানোর বিনিময়ে ৯টি নির্দিষ্ট ক্লাবকে বিশেষ ভোটাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে ইউরোপিয়ান সুপার লিগ গঠনের চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি।
### মাঠের পারফরম্যান্স ও ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের বর্তমান সংকট
কাগজে-কলমে ক্ষমতার লড়াই যাই থাকুক না কেন, মাঠের খেলায় বর্তমান চিত্র একদম ভিন্ন। 'মাঠের খবর'-এর বিগত প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মাঠের পারফরম্যান্সে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তাদের ইতিহাসে অন্যতম বাজে সময় পার করছে। গত ২৫ অক্টোবর ২০২৬-এ ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে বোর্নমুথের কাছে ৩-০ গোলে শোচনীয় পরাজয় বরণ করে রেড ডেভিলরা, যেখানে রায়ান এবং এভানিলসন গোল করেন। এই হারের পর পয়েন্ট টেবিলের ১৬তম স্থানে নেমে যায় ক্লাবটি।
ম্যানেজার মাইকেল ক্যারিকের অধীনে টানা আট ম্যাচ জয়হীন থাকার পর এবং অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেসের প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশের মধ্য দিয়ে ড্রেসিংরুমে তৈরি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। ৩০ অক্টোবরের খবর অনুযায়ী দল সংকটে থাকলেও চেলসির বিরুদ্ধে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে মাইকেল ক্যারিকের ওপরই ভরসা রাখছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ।
এদিকে সিবিএস স্পোর্টস উল্লেখ করেছে, গত চার মৌসুমে অ্যাস্টন ভিলা, নিউক্যাসেল, ব্রাইটন এবং বোর্নমুথের মতো দলগুলো শীর্ষ ছয়ে জায়গা করে নিয়েছে। ওয়েস্ট হ্যাম বা ক্রিস্টাল প্যালেসের মতো ক্লাবগুলো ইউরোপীয় মঞ্চে খেলার স্বাদ পাচ্ছে। পিএসআর এবং উয়েফা অর্থনৈতিক নিয়ম কিছুটা বাঁধা তৈরি করলেও, তা লিডস ইউনাইটেড বা পোর্টসমাউথের মতো ক্লাবকে ধ্বংসের মুখ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। প্রিমিয়ার লিগের রাজস্ব কাঠামোর কারণে মাঠের লড়াই এখন অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক, যা কোনো একক কার্টেলের নিয়ন্ত্রণে নেই।