স্প্যানিশ লা লিগার ২৬৫তম ঐতিহ্যবাহী এল ক্লাসিকোতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনাকে তাদেরই ঘরের মাঠ স্পোটিফাই ক্যাম্প ন্যু-তে ২-১ ব্যবধানে পরাস্ত করেছে রিয়াল মাদ্রিদ। মার্কিন ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম সিবিএস স্পোর্টস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, পর্তুগিজ কোচ হোসে মরিনহোর নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল পরিকল্পনা এবং ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পের অসাধারণ জোড়া গোলের ওপর ভর করে এই স্মরণীয় জয় তুলে নিয়েছে লস ব্লাঙ্কোসরা। রিয়াল মাদ্রিদের ঐতিহ্যবাহী সাদা জার্সিতে নিজের তৃতীয় মৌসুমে মাঠে নেমে এই ম্যাচের মাধ্যমেই নিজের ৯৯ ও ১০০তম গোলের গৌরবময় মাইলফলক স্পর্শ করলেন এমবাপ্পে। এই জয়ের ফলে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষস্থানে থাকা বার্সেলোনা এবং দ্বিতীয় স্থানে থাকা রিয়াল মাদ্রিদের ব্যবধান কমে মাত্র তিন পয়েন্টে নেমে এসেছে।
ম্যাচে বার্সেলোনার স্বভাবজাত পজেশনভিত্তিক ফুটবলকে সুযোগ দিয়ে নিজেদের অর্ধে কঠোর পজিশনাল ডিসিপ্লিন বা অবস্থানগত শৃঙ্খলা বজায় রাখার কৌশল বেছে নেয় মরিনহোর দল। সিবিএস স্পোর্টসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরো ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে সফরকারী রিয়াল মাদ্রিদের পায়ে বলের দখল ছিল মাত্র ৩৭.৬ শতাংশ সময়। ঘরের মাঠে আক্রমণাত্মক মানসিকতা নিয়ে খেলতে নেমে বার্সেলোনা মোট ১৮টি শট নেয়, যার বিপরীতে রিয়াল মাদ্রিদ প্রতিআক্রমণ থেকে ১০টি শট নিতে সক্ষম হয়। তবে হান্সি ফ্লিকের শিষ্যরা টানা আক্রমণ করলেও রিয়ালের জমাটবদ্ধ রক্ষণ ভেদ করতে হিমশিম খেয়েছে। চলতি মৌসুমে লা লিগায় বার্সেলোনা ম্যাচপ্রতি গড়ে ৩.৫ এক্সপেক্টেড গোল (xG) তৈরি করলেও, এই ম্যাচে রিয়ালের সুসংগঠিত ডিফেন্সের সামনে তারা মাত্র ১.১৯ এক্সপেক্টেড গোল তৈরি করতে পেরেছে।
রিয়াল মাদ্রিদের চমৎকার রক্ষণের পেছনে তাদের মিডফিল্ড ও ডিফেন্সের পারস্পরিক বোঝাপড়া ছিল চোখে পড়ার মতো। লস ব্লাঙ্কোসদের মিডফিল্ডের নিচে থেকে প্রতিপক্ষের হাই প্রেস প্রতিহত করা এবং ট্রানজিশন মুহূর্তে বার্সেলোনাকে বড় কোনো সুযোগ না দেওয়া নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন অরেলিয়েন চুয়ামেনি। তাকে দারুণ সহায়তা করেন ডান ব্যাক পজিশনে খেলা ফেদেরিকো ভালভার্দে এবং অন্য প্রান্তে থাকা ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেলা। এছাড়া আক্রমণাত্মক উইং পজিশন থেকে পিছু হটে এসে ডিফেন্সে সাহায্য করেন আরদা গুলার এবং ইয়ান দিওমান্দে, যা বার্সেলোনাকে প্রচুর পাস খেলা সত্ত্বেও পরিষ্কার সুযোগ তৈরি থেকে বিরত রাখে।
পুরো ম্যাচে সচরাচর দৃশ্যমান ভূমিকার চেয়ে কিছুটা কম সময় বল পেলেও নিখুঁত সুযোগসন্ধানী হিসেবে নিজের জাত চিনিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই ম্যাচে তিনি মাত্র ৩৬টি টাচ এবং ৩টি শট নেন, যা চলতি মৌসুমে লা লিগায় তার স্বাভাবিক গড় (ম্যাচপ্রতি ৫২.৭ টাচ ও ৫.২ শট)-এর চেয়ে বেশ কম। প্রথম গোলের ক্ষেত্রে আরদা গুলার দলের আক্রমণ গড়ে তোলেন এবং বার্সেলোনা ডিফেন্ডার জেরার্ড মার্টিনের ক্লিয়ারেন্স এমবাপ্পের গায়ে লেগে বল অপ্রত্যাশিতভাবে জালে জড়ায়। এরপর দ্বিতীয় গোলটি আসে রিয়ালের চমৎকার দলীয় সমন্বয় থেকে, যেখানে বেঞ্চ থেকে নামা এদুয়ার্দো কামাভিংগার দুর্দান্ত বাড়ানো বলকে নিপুণ দক্ষতায় বার্সেলোনাকে পরাজিত করে নিজের ১০০তম গোল নিশ্চিত করেন এমবাপ্পে। এ ম্যাচে মিডফিল্ডার জুড বেলিংহামও বেশ কিছু বিপজ্জনক আক্রমণ তৈরি করেছিলেন।
### কৌশলগত বিস্তার ও শিরোপা লড়াইয়ের নতুন মেরুকরণ
বার্সেলোনার হয়ে একমাত্র সমতাসূচক গোলটি করেন চমৎকার ফর্মে থাকা ফরোয়ার্ড রাফিনহা, যা লা লিগায় চলতি মৌসুমে তার শেষ ৯ ম্যাচে ১৩তম গোল। এর আগে 'মাঠের খবর'-এর ২৫ অক্টোবরের প্রাক-ম্যাচ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, স্পোটিফাই ক্যাম্প ন্যু-এর এই হাই-ভোল্টেজ দ্বৈরথে লামিন ইয়ামাল ও কিলিয়ান এমবাপ্পের দ্বৈরথই ছিল স্পটলাইটের কেন্দ্রে। ম্যাচে লামিন ইয়ামাল, রাফিনহা এবং ইংলিশ উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডন বারবার বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আক্রমণের চেষ্টা করলেও রিয়ালের কৌশলী ডিফেন্সিভ শেপের কারণে বক্সের বাইরে দূরপাল্লার শট নিতে বাধ্য হন। তাছাড়া ম্যাচের প্রথমার্ধেই বার্সেলোনার তরুণ বাম ব্যাক হাভি এসপার্ট চোট পেয়ে মাঠ ছাড়লে তার জায়গায় নামেন আলেহান্দ্রো বালদে, যা স্বাগতিকদের রক্ষণভাগে বাড়তি চাপ তৈরি করে। বছরের শুরুতে স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক এবং ব্যালন ডি'অর বিজয়ী রদ্রি একাকী বার্সেলোনার ডিফেন্সের এই ভুলগুলো শুধরে দিতে ব্যর্থ হন।
'মাঠের খবর'-এর ২৬ অক্টোবরের প্রকাশিত সংবাদ আর্কাইভ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হান্সি ফ্লিকের অধীনে চলতি ঘরোয়া মৌসুমে টানা ৯টি ম্যাচ জিতে অপরাজিত থেকে ক্লাসিকোতে নেমেছিল বার্সেলোনা। কিন্তু মরিনহোর মাস্টারক্লাসের মুখে পড়ে তাদের সেই টানা জয়ের ধারা থেমে গেল। তার ওপর মঙ্গলবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) কাছে ৪-২ ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই ঘরের মাঠে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে এই হার বেশ কোণঠাসা করে ফেলল কাতালানদের। অন্যদিকে, গত জানুয়ারিতে জাভি আলোনসোরunexpected বিদায়ের পর এটিই রিয়াল মাদ্রিদের সবচেয়ে কার্যকর এবং কৌশলগতভাবে সফল বড় জয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
২০২৩-২৪ মৌসুমে প্রধান শিরোপা জয়ের সময় রিয়াল মাদ্রিদ যেভাবে মূলত ব্যক্তিগত তারকাদের একক অসামান্য নৈপুণ্যের ওপর নির্ভর করেছিল, এই ম্যাচে ছিল তার সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। সুনির্দিষ্ট গেমপ্ল্যান এবং মাঠে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করে শিরোপার রেস আবার নতুন করে উন্মুক্ত করে দিয়েছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। এই ফলের পর লা লিগার পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে বার্সেলোনা এবং রিয়াল মাদ্রিদের ব্যবধান তিনে নেমে আসায় লিগের শিরোপা সমীকরণ চূড়ান্ত রোমাঞ্চকর মোড় নিয়েছে। আসন্ন ম্যাচগুলোতে হোসে মরিনহোর দলের এই রক্ষণাত্মক ও বিধ্বংসী কাউন্টার-অ্যাটাকিং ধারার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ফ্লিকের বার্সেলোনার ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতাই চলতি মৌসুমের স্প্যানিশ ফুটবলের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।