/
হোম › ক্রীড়া সংবাদ › প্রতিবেদন
ভাষা / Language:

মাও সেতুংকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য: চীনে স্পন্সর হারিয়ে বিপাকে এমবাপ্পে, সম্প্রচার বন্ধের পথে লা লিগা

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান (মূল প্রতিবেদন →) • এআই-সহায়তায় বাংলায় প্রস্তুত, সম্পাদকীয় নীতি

চীনে রাষ্ট্রনেতা মাও সেতুংকে নিয়ে অসংবেদনশীল কৌতুকের জেরে বড় ধরণের বাণিজ্যিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ডংপেং ও মেংনিউয়ের মতো একাধিক শীর্ষ চীনা স্পন্সর ফরাসি তারকাকে বাদ দিয়েছে, যার পাশাপাশি লা লিগা সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
মাও সেতুংকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য: চীনে স্পন্সর হারিয়ে বিপাকে এমবাপ্পে, সম্প্রচার বন্ধের পথে লা লিগা
এআই-নির্মিত প্রতীকী ছবি
সারসংক্ষেপ: মূল ৩ তথ্য
•
কী ঘটেছে: মাও সেতুংকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের জেরে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে একাধিক চীনা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।
•
ম্যাচের প্রভাব: চীনের বাজারে ফরাসি তারকার ব্র্যান্ড ভ্যালুতে বড় ধাক্কা এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভিতে লা লিগা সম্প্রচার স্থগিতের বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
•
সামনে কী: তিন ভাষায় এমবাপ্পের ক্ষমা চাওয়ার পর সিসিটিভি লা লিগা ম্যাচ সম্প্রচার স্থায়ীভাবে বন্ধ করে কি না, সেদিকেই নজর থাকবে ক্রীড়াবিশ্বের।

মাঠের পারফরম্যান্সে একের পর এক মাইলফলক স্পর্শ করলেও মাঠের বাইরের এক বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে চীনে বড় ধরনের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সংকটে পড়েছেন রিয়াল মাদ্রিদ ও ফরাসি সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পে। চীনের সাবেক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী ও দেশটির প্রতিষ্ঠাতা নেতা মাও সেতুংকে নিয়ে করা এক অনভিপ্রেত মন্তব্যের কারণে ২৭ বছর বয়সী এই ফুটবলারের সঙ্গে সব ধরণের বাণিজ্যিক চুক্তি বাতিল করেছে চীনের একাধিক শীর্ষস্থানীয় স্পন্সর প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে স্প্যানিশ ফুটবল লিগ লা লিগার সম্প্রচার স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন।

ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে এমবাপ্পে জানান যে নিজের চেহারা নিয়ে দেখা সবচেয়ে মজার ইন্টারনেট মিম ছিল মাও সেতুংয়ের ছবির ওপর নিজের মুখ বসানো একটি মিম। ভিডিওতে ওই নেতাকে একজন চীনা স্বৈরাচারী হিসেবে উল্লেখ করেন এমবাপ্পে। ১৯৭৬ সালে প্রয়াত মাও সেতুংকে নিয়ে চীনে যেকোনো ধরনের কৌতুক বা নেতিবাচক মন্তব্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও সামাজিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর চীনা ক্রীড়ামোদী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে নিজের ভুলের জন্য ফরাসি, চীনা ও ইংরেজি—তিন ভাষায় আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে ক্ষমা চান রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড। ক্ষমা প্রার্থনার বিবৃতিতে এমবাপ্পে বলেন, "আমার মন্তব্যটি ছিল একদমই বিচারবুদ্ধিহীন। আমি এখন বুঝতে পারছি যে এটি চীন এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা চীনা সম্প্রদায়ের অনেকের মনে আঘাত দিয়েছে। আমার কথায় যারা কষ্ট পেয়েছেন, তাদের সবার কাছে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাচ্ছি।"

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে স্প্যানিশ লিগ কর্তৃপক্ষ লা লিগাও। এক বিবৃতিতে লা লিগা জানিয়েছে, "কিলিয়ান এমবাপ্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে চীনা সমর্থকদের মনে যে আঘাত লেগেছে, তার জন্য লা লিগা গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করছে। এই মন্তব্যটি সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে করা এবং এটি কোনোভাবেই লা লিগার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে না।"

তবে এমবাপ্পে ও লা লিগার ক্ষমা প্রার্থনার পরও পিছু হটেনি চীনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো। চলতি বিশ্বকাপ চলাকালীন এমবাপ্পেকে নিয়ে এআই প্রযুক্তির বিজ্ঞাপন তৈরি করা পানীয় প্রস্তুতকারক জায়ান্ট ডংপেং ফরাসি অধিনায়কের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। ডংপেং তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছে, "জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে—এমন যেকোনো আচরণের বিরুদ্ধে আমাদের কোম্পানি কঠোর অবস্থান বজায় রাখে এবং এতে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না।" চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতে ডংপেং কর্তৃক এমবাপ্পের চুক্তি বাতিলের বিষয়সংক্রান্ত হ্যাশট্যাগটি ৪৩ কোটি বার দেখা হয়েছে। একই সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে চীনের সর্ববৃহৎ দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মেংনিউ এবং পনির প্রস্তুতকারক মিল্কগ্রাউন্ড।

### মাঠের সাফল্যের মাঝে ভূরাজনৈতিক ধাক্কা ও সম্ভাব্য পরিণতি

চীনা ফুটবলপ্রেমী ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের মধ্যেও এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। চীনের শীর্ষ অনলাইন ফুটবল পোর্টাল দংকিউদি এমবাপ্পের মন্তব্যকে চীন এবং চীনা জনগণের জন্য অপমানজনক বলে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ডিজিটাল সংবাদপত্র দ্য পেপারের তথ্যমতে, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি লা লিগার সব ধরনের ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিত করার পাশাপাশি এমবাপ্পে সংক্রান্ত সব বিজ্ঞাপন সরিয়ে নিয়েছে। বেইজিংয়ের ৩০ বছর বয়সী মল কর্মী ঝাং জিংকি জানান, আগে তিনি এমবাপ্পের খেলা দেখতে ভালোবাসলেও এই ঘটনার পর ফরাসি তারকার প্রতি তিনি শ্রদ্ধা হারিয়েছেন।

নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন জানান, সরকার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, "চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন যেকোনো বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড চীনা সমাজের সর্বস্তরের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সর্বসম্মতভাবে প্রত্যাখ্যান করবে।"

দ্য গার্ডিয়ান স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যুতে মন্তব্য করে চীনে বাণিজ্যিক ক্ষতির মুখে পড়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ২০১৯ সালে হিউস্টন রকেটসের তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার ড্যারিল মোরে হংকংয়ের বিক্ষোভের সমর্থনে টুইট করায় টানা এক বছর চীনা টিভিতে এনবিএ ম্যাচ সম্প্রচার বন্ধ ছিল। এছাড়া ২০২৩ সালে সাবেক এনবিএ তারকা ডোয়াইট হাওয়ার্ড তাইওয়ানকে একটি পৃথক দেশ হিসেবে আখ্যা দেওয়ায় চীনে ব্যাপক বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছিলেন।

মাঠের ফুটবলে অসাধারণ এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার মুহূর্তেই এই ভূরাজনৈতিক ধাক্কায় পড়লেন এমবাপ্পে। মাঠের খবরের আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৬ অক্টোবর স্পটিফাই ক্যাম্প ন্যু-তে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনাকে ২-১ গোলে হারানোর ক্লাসিকো ম্যাচে জোড়া গোল করেন এমবাপ্পে। সেই ম্যাচের মাধ্যমে জোসে মরিনহোর ট্যাকটিক্সে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে শততম গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। এর পরপরই লন্ডনে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ব্যালন ডি'অর পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইনের পেছনে থেকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন রিয়াল তারকা।

গত মাসে ফরাসি ক্রীড়া দৈনিক ল’ইকিপ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমবাপ্পে সামরিক স্বৈরাচারীদের নিয়ে তৈরি মিমে নিজের ছবি থাকা প্রসঙ্গে কথা বলেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, এসব মিমের একটি অংশ মজার হলেও ইতিহাসের কালো অধ্যায়ের কারণে এর অন্য অংশটি অতটা হাস্যরসের নয়।

সব মিলিয়ে চীনের বাজারে লা লিগা ও এমবাপ্পের বাণিজ্যিক অবস্থান রক্ষায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হলো। যদিও সিসিটিভির ওয়েবসাইটে চলতি সপ্তাহান্তের লা লিগা ম্যাচের সময়সূচি এখনো সাময়িকভাবে দেখা যাচ্ছে, তবে দীর্ঘমেয়াদী সম্প্রচার নিষেধাজ্ঞা এবং কোটি কোটি ডলারের স্পন্সরশিপ হারানোর ঝুঁকি ২০২৬ মৌসুমের বাকি সময়ে মাঠের বাইরের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে রিয়ালের এই ফরাসি ফরোয়ার্ডের জন্য।

প্রতিবেদনটি শেয়ার করুন:
WhatsApp Facebook X (Twitter)