ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড রায়ান ও এভানিলসনের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং জয়ের সুবাদে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে বোর্নমাউথ। ব্রাজিলিয়ান ক্রীড়া মাধ্যম ইউওএল এসপোর্টের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। প্রিমিয়ার লিগে নিজেদের সংকটময় সময় পার করতে থাকা রেড ডেভিলরা ঘরের মাঠে আরও একবার লজ্জাজনক পরাজয়ের স্বাদ পেল। এই হারের মাধ্যমে লিগ টেবিলে মার্সেই বা চেলসি ম্যাচের আগের সমীকরণগুলো আরও জটিল করে তুলল দলটি। ঘরের মাঠে খেলা সত্ত্বেও স্বাগতিকরা ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। ম্যাচের প্রতিটি বিভাগে মার্কো রোসের দল বোর্নমাউথ নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে মাঠ ছাড়ে।
### ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে বোর্নমাউথের প্রাধান্য
ইউওএল এসপোর্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম থেকেই পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় সফরকারী বোর্নমাউথ। যদিও তাদের পায়ে বলের দখল কিছুটা কম ছিল, তবুও তারা স্বাগতিকদের তুলনায় দ্বিগুণ আক্রমণ শানায়। প্রথমার্ধেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের তিন শটের বিপরীতে ছয়টি শট নেয় বোর্নমাউথ। মার্কো রোসের শিষ্যরা তাদের এই আক্রমণাত্মক মানসিকতাকে মাঠের খেলায় দারুণভাবে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে, ইংলিশ কোচ মাইকেল ক্যারিকের দল শুরু থেকেই দিশেহারা ছিল। মাঠে তাদের আক্রমণভাগ এবং রক্ষণভাগের মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়নি।
ম্যাচের ৩৭তম মিনিটে জেমস টাভারনিয়ারের ফ্রি কিক থেকে আসা বলে দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়ান ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার রায়ান। দ্বিতীয় পোস্টের ঠিক পেছনে অবস্থান নেওয়া রায়ান ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে গোল করে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে বোর্নমাউথকে এগিয়ে দেন। এই গোলের মাধ্যমে ব্রাজিলিয়ান জাতীয় দলের এই তরুণ ফরোয়ার্ড চলতি মৌসুমে তার চতুর্থ গোলটি তুলে নিলেন। একই সঙ্গে প্রিমিয়ার লিগের ক্যারিয়ারে এটি তার প্রথম গোল। এই গোলটি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের রক্ষণভাগের চরম উদাসীনতা ও দুর্বলতাকে সবার সামনে উন্মোচন করে দেয়।
প্রথম গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র চার মিনিট ব্যবধানে ব্যবধান দ্বিগুণ করে সফরকারী দল। ডিফেন্ডার জাঁ-লুক ইয়োরো বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ভুল করে বসেন এবং বোর্নমাউথের খেলোয়াড়রা সেই সুযোগ লুফে নেয়। ট্রুফার্ট বল ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত জেমস টাভারনিয়ারের উদ্দেশ্যে পাস বাড়ান এবং তিনি সহজেই বল জালে জড়িয়ে দেন। মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল হজম করে মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে স্বাগতিকরা। ডাগআউটে বসে থাকা কোচ মাইকেল ক্যারিভ ও দলের ফুটবলারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ম্যাচের প্রথমার্ধে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর বিরতির সময় দলে পরিবর্তন আনেন কোচ মাইকেল ক্যারিক। বেলজিয়ান মিডফিল্ডার ইউরি টিিলেমান্সের পরিবর্তে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড মাথেউস কুনহাকে মাঠে নামানো হয়। এই পরিবর্তনের পর দ্বিতীয়ার্ধে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিছুটা বেশি বলের দখল নিজেদের পায়ে রাখতে সক্ষম হয়। তারা কয়েকটি আক্রমণও পরিচালনা করে, তবে প্রতিপক্ষ গোলরক্ষক পেত্রোভিচকে খুব একটা বিপদে ফেলতে পারেনি। বোর্নমাউথের রক্ষণভাগ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে স্বাগতিকদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়।
ম্যাচের ২৫তম মিনিটে বোর্নমাউথ তাদের জয় নিশ্চিত করে আরেকটি দুর্দান্ত গোলের মাধ্যমে। রক্ষণভাগ থেকে বাড়ানো লম্বা বল ধরতে এগিয়ে আসেন গোলরক্ষক লাম্মেন্স, কিন্তু তিনি বক্সের বাইরে এসে চরম বিভ্রান্তির শিকার হন। এই সুযোগে বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেন্টার ফরোয়ার্ড এভানিলসন দূরপাল্লার শট নেন এবং বল ফাঁকা জালে জড়িয়ে দেন। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের দর্শকরা এভানিলসনের এই চমৎকার গোল দেখে স্তব্ধ হয়ে যান। এই গোলটি ম্যাচের বাকি সময়ের সকল অনিশ্চয়তা দূর করে বোর্নমাউথের বড় জয় নিশ্চিত করে।
ইউওএল এসপোর্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে কোমো দলের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হারের পরই এই পরাজয়ের মুখোমুখি হলো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় দলের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর কোচ মাইকেল ক্যারিক এই ম্যাচে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দলের নিয়মিত অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেজকে শুরুর একাদশ থেকে বাদ দেন। উল্লেখ্য, পর্তুগিজ মিডফিল্ডার ব্রুনো ফার্নান্দেজ ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার পর ক্লাবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কড়া সমালোচনা করেছিলেন। যার খেসারত হিসেবে তাকে এই ম্যাচে বেঞ্চে বসে থাকতে হয় এবং পুরো ম্যাচ জুড়েই তিনি মাঠে নামার সুযোগ পাননি।
এই হারের ফলে পয়েন্ট টেবিলে অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ে গেছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। রেড ডেভিলরা অবনমন অঞ্চলের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে এবং বর্তমানে তারা ১৬তম অবস্থানে রয়েছে। লিগে তাদের সংগ্রহ মাত্র সাত পয়েন্ট। এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা থেকে বের হয়ে আসার জন্য দলকে দ্রুত কৌশলগত পরিবর্তন আনতে হবে। আগামী শনিবার প্রিমিয়ার লিগের পরবর্তী ম্যাচে স্টামফোর্ড ব্রিজে চেলসির মুখোমুখি হবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। কঠিন এই অ্যাওয়ে ম্যাচের আগে দলের ড্রেসিংরুমের পরিবেশ এবং আত্মবিশ্বাস তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
বিপরীতে, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে পয়েন্ট টেবিলে পেছনে ফেলে ১৩তম স্থানে উঠে এসেছে বোর্নমাউথ। নয় পয়েন্ট সংগ্রহ করে মার্কো রোসের দল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। চলতি মৌসুমে বোর্নমাউথের এই পারফরম্যান্স ফুটবল বিশেষজ্ঞদের নজর কেড়েছে। আগামী শনিবার তারা নিজেদের মাঠ ভাইটালিটি স্টেডিয়ামে লিডস ইউনাইটেডের মুখোমুখি হবে। এই জয়ের পর বোর্নমাউথ শিবিরে দারুণ আত্মবিশ্বাস কাজ করছে এবং তারা পরবর্তী ম্যাচেও এই ধারা বজায় রাখতে চাইবে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জন্য এই ভরাডুবি দলটির ইতিহাসে অন্যতম কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল।