স্প্যানিশ লা লিগার ২৬৫তম এল ক্লাসিকোয় বার্সেলোনার বিপক্ষে স্মরণীয় এক জয় তুলে নিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। জার্মানির বিখ্যাত ক্রীড়া মাধ্যম স্পোর্টসচাউ ফুসবালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিপক্ষের মাঠে অনুষ্ঠিত এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদ ২-১ গোলে স্বাগতিক এফসি বার্সেলোনাকে পরাজিত করেছে। এই জয়ের ফলে পয়েন্ট টেবিলে ক্যাতালানদের সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে এনেছে রিয়াল মাদ্রিদ। ম্যাচের পুরোটা সময় জুড়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে লস ব্লাঙ্কোসরা প্রমাণ করেছে যে তারা শিরোপা দৌড়ে শক্তভাবে টিকে রয়েছে। কোচ হোসে মরিনহোর শিষ্যরা এই জয়ে টেবিলের শীর্ষস্থানের আরও কাছাকাছি পৌঁছে গেল।
ম্যাচের প্রথমার্ধের শুরু থেকেই একটি রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নিয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ। বার্সেলোনা ঘরের মাঠে বলের দখল নিজেদের পায়ে রেখে খেলার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করলেও রিয়ালের সুসংহত রক্ষণ ভাঙতে ব্যর্থ হয়। রিয়ালের ব্যাকলাইন এবং মিডফিল্ড এমনভাবে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছিল যে হান্সি ফ্লিকের দল কোনো পরিষ্কার গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। উল্টো কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং আর্দা গুলাররা কাউন্টার অ্যাটাকে গিয়ে বার্সেলোনা ডিফেন্সকে বেশ কয়েকবার চাপে ফেলার চেষ্টা করেন। প্রথমার্ধের শুরুর দিকে খেলাটি বেশ কিছুটা ছন্নছাড়া ও আক্রমণহীন ছিল।
প্রথমার্ধের মাঝপথে দুই দলই কিছু সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা চালায়। খেলার একুশ মিনিটে বার্সেলোনার রাফিনিয়া প্রায় কুড়ি গজ দূর থেকে একটি শট নেন, যা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ক্রসবারের উপর দিয়ে চলে যায়। এর তিন মিনিট পর ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড রাফিনিয়া আরও একবার দারুণ কম্বিনেশনের পর বক্সের বাইরে থেকে শট নেন, যা রিয়ালের গোলরক্ষক আন্দ্রি লুনিনের পোস্টের খুব কাছ দিয়ে বেরিয়ে যায়। রিয়াল মাদ্রিদের নিয়মিত গোলরক্ষক থিবাউট কোর্তোয়া ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে অনুপস্থিত থাকায় এ দিন পোস্টের নিচে দায়িত্ব সামলান আন্দ্রি লুনিন। অন্যদিকে প্রথমার্ধের এক পর্যায়ে আর্দা গুলারের চমৎকার ক্রস থেকে বল পেয়ে সাইডভলি করার চেষ্টা করেন এমবাপ্পে, তবে সেটিও গোলবারের বাইরে চলে যায়।
ম্যাচের একচল্লিশ মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত, যা ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখে। ইয়ান দিওমান্দের নিচু ক্রসে বক্সের ভেতর বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন জেরার্ড মার্টিন। তার পায়ে লেগে প্রতিহত হওয়া বলটি রিয়াল ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পের গায়ে এবং পরবর্তীতে তার হিপ বা নিতম্বে লেগে দিক বদলে জালে জড়িয়ে যায়। এই আকস্মিক আত্মঘাতী ধাঁচের গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় রিয়াল মাদ্রিদ। প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে বার্সেলোনা সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পায়, কিন্তু বার্সা তারকা লামিন ইয়ামাল গোলপোস্টের মাত্র ছয় গজ দূর থেকেও বল জালে পাঠাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হন।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ব্যবধান বাড়ানোর আরেকটি সুযোগ পায় রিয়াল মাদ্রিদ। ইয়ান দিওমান্দে বাঁ দিক থেকে প্রায় একা এগিয়ে গিয়ে শট নেন, যা সামান্যর জন্য বার্সেলোনার গোলপোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়। বিরতির পর দ্বিতীয়ার্ধেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালাতে থাকে হান্সি ফ্লিকের দল। কিন্তু হোসে মরিনহোর ট্যাকটিক্যাল ডিসিপ্লিনের কারণে রিয়ালের রক্ষণভাগ অত্যন্ত শক্ত ও জমাটবদ্ধ থাকে। বার্সেলোনা বারবার আক্রমণ চালালেও রিয়ালের কাউন্টার অ্যাটাকগুলো অনেক বেশি মারাত্মক প্রমাণিত হয়, যার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন জুড বেলিংহাম।
### সমতা এবং শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোল
দ্বিতীয়ার্ধের মাঝপথে রিয়ালের সামান্য ক্ষণস্থায়ী অসাবধানতার সুযোগ নেয় বার্সেলোনা। ম্যাচের একষট্টি মিনিটে একটি কর্নার কিক থেকে ফাঁকায় বল পেয়ে যান রাফিনিয়া। দশ গজ দূর থেকে নেওয়া তার নিখুঁত শট সোজা জালে জড়ায় এবং খেলার স্কোরলাইন ১-নির্ধারিত হয়। এই সমতাসূচক গোলের পর বার্সেলোনা ম্যাচের গতি ফিরে পায় এবং আক্রমণের তীব্রতা বাড়ায়। জেরার্ড মার্টিনের একটি চমৎকার হেড গোলবারে আঘাত হানার উপক্রম হলে রিয়াল গোলরক্ষক আন্দ্রি লুনিন এক দুর্দান্ত সেভ করে দলকে রক্ষা করেন এবং ক্যাতালানদের লিড নেওয়া থেকে বিরত রাখেন।
ম্যাচের শেষ দিকে রিয়াল মাদ্রিদ মূলত স্কোরলাইন ধরে রাখার চেষ্টা করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামা এদুয়ারো কামাভিঙ্গা নিজের শক্তির পুরোটা নিংড়ে দিয়ে প্রায় পুরো মাঠ জুড়ে এক অবিশ্বাস্য স্প্রিন্ট দেন। দুর্দান্ত গতিতে বল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে তিনি একদম নিখুঁত একটি পাস বাড়ান কিলিয়ান এমবাপ্পে বরাবর। ফাঁকা জায়গায় বল পেয়ে এমবাপ্পে ঠান্ডা মাথায় দশ গজ দূর থেকে বল খালি জালে ঠেলে দেন এবং নিজের ও দলের দ্বিতীয় গোল পূর্ণ করেন। ম্যাচের বয়স তখন সাতাশিত মিনিট, আর এই গোলেই রিয়াল মাদ্রিদের ২-১ গোলের জয় নিশ্চিত হয়।
এই পরাজয়ের ফলে হান্সি ফ্লিকের দল মাঠে তাদের সেরা ফর্ম ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং দিন শেষে পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। স্পোর্টসচাউ ফুসবালের কভারেজে উল্লেখ করা হয়েছে যে বার্সেলোনা পুরো ম্যাচজুড়ে প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স দিতে পারেনি। অন্যদিকে এই জয়ে রিয়াল মাদ্রিদ বার্সেলোনার সঙ্গে পয়েন্ট ব্যবধান কমিয়ে মাত্র তিন পয়েন্টে নামিয়ে এনেছে। মাঠের খবর এর নিজস্ব আর্কাইভ অনুযায়ী, ম্যাচটি ঘিরে ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক উন্মাদনা ছিল এবং এমবাপ্পে ও ইয়ামালের দ্বৈরথ নিয়ে নানা জল্পনা চলেছে। শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পের জোড়া গোলই লা লিগার এই ক্লাসিকো যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় এবং রিয়ালকে শিরোপা লড়াইয়ে সগৌরবে ফিরিয়ে আনে।