ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, ফ্রান্স ও রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে চীনে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ে খেলার সময় ক্লাবের নীতিনির্ধারণে নিজের কথিত প্রভাবের কারণে পাওয়া 'স্বৈরশাসক' বা 'ডিক্টেটর' ডাকনামের সূত্র ধরে এমবাপ্পে একটি মিমের প্রসঙ্গ তোলেন। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নিজের এবং চীনের সাবেক চেয়ারম্যান মাও সেতুংয়ের ছবির সমন্বয়ে তৈরি মিম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি সাবেক এই নেতাকে 'চীনা স্বৈরশাসক' হিসেবে উল্লেখ করেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই চীনের ভেতরে তুমুল সমালোচনার ঝড় ওঠে। এর ফলে চীনা স্পনসর প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত তার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে এবং চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন পুরো স্প্যানিশ লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়।
মাঠের লড়াইয়ে চলতি সপ্তাহের শুরুতেই বার্সেলোনার বিপক্ষে এল ক্লাসিকোতে জোড়া গোল করে দলকে ২-১ ব্যবধানে জয় এনে দিয়েছিলেন এমবাপ্পে। একই সপ্তাহে ব্যালন ডি’অর জয়ের লড়াইয়ে হ্যারি কেইনের কাছে পিছিয়ে পড়ার পর এই নতুন সংকট ফরাসি তারকার সামনে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। চীনের ফুটবল অ্যাপ ডংচিউদি দ্রুত এক বিবৃতি দিয়ে এমবাপ্পের মন্তব্যের নিন্দা জানায়। তারা উল্লেখ করে, এমবাপ্পের বক্তব্য চীন ও চীনা জনগণের প্রতি অবমাননাকর হওয়ায় তারা সেটি অনুবাদ করে প্রকাশ করতে অপারগ। চীনা গণমাধ্যমগুলো বিভিন্ন স্পনসর প্রতিষ্ঠানের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং চাইনিজ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের রিয়াল মাদ্রিদের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানোর খবর প্রকাশ করলেও এমবাপ্পে ঠিক কী বলেছিলেন, তা সরাসরি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা এড়িয়ে গেছে।
চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিতর্ক ব্যাপক আকার ধারণ করে। শুধু এমবাপ্পের ক্ষমাপ্রার্থনা সম্পর্কিত একটি হ্যাশট্যাগই ৬০ কোটির বেশি বার দেখা হয়েছে। 'আই অন ডিজিটাল চায়না' নিউজলেটারের সম্পাদক মানিয়া কোয়েটসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ভিপিএন ছাড়া থাকা অসংখ্য সাধারণ চীনা নাগরিক আসলে জানতেই পারেননি ঠিক কী কারণে এমবাপ্পেকে বয়কটের ডাক দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ চীনা নাগরিকদের অনেকেই এই মন্তব্যকে চীনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি চরম অসম্মান হিসেবে দেখেছেন। অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা স্টাডিজের অধ্যাপক মোবো গাও জানান, পশ্চিমা বিশ্বের ধারণার চেয়ে ভিন্নভাবে চীনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে মাও সেতুংয়ের ভাবমূর্তি এখনো ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
### স্পর্শকাতর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অর্থনৈতিক প্রভাব
চীনের আধুনিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মৃত্যুর ৫০ বছর পরও মাও সেতুংয়ের প্রভাব দেশটির সমাজে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড নীতির কারণে প্রায় ৩ কোটি মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ এবং পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি 'মারাত্মক ভুল' হিসেবে স্বীকার করে নিলেও মাওকে একজন বিপ্লবী নায়ক হিসেবেই মর্যাদা দেয় ক্ষমতাসীন দল। অধ্যাপক মোবো গাওয়ের মতে, চীনের ভেতরেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হওয়ার পর থেকে মাওকে ঘিরে সমর্থন ও বিরোধের মধ্যে অদৃশ্য এক টানাপোড়েন রয়েছে। অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের মধ্যে মাওয়ের আদর্শের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, যা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দেশটির নীতিনির্ধারকরা। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগের অধ্যাপক জেনিফার প্যানের মতে, চীনে জনমতের সঠিক প্রকৃতি বোঝা অত্যন্ত জটিল, কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং রাষ্ট্র ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত পদক্ষেপ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে।
এই বিতর্কের কারণে এমবাপ্পেকে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। 'স্পোর্টিং সুপারপাওয়ার' বইয়ের লেখক মার্ক ড্রেয়ার গার্ডিয়ানকে জানান, চীনের সাবওয়ে, বাস এবং অনলাইন বিজ্ঞাপনে এমবাপ্পের নিয়মিত উপস্থিতি ছিল এবং সেখানে তার বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোর বার্ষিক মূল্য ছিল প্রায় ৩ কোটি মার্কিন ডলার বা ২ কোটি ২৬ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত। ড্রেয়ার ব্যাখ্যা করেন, চীনে একবার রাজনৈতিক সীমারেখা অতিক্রমের অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দ্রুততম সময়ে সম্পর্কচ্ছেদ করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অতীতে তিব্বত, হংকং কিংবা তাইওয়ান ইস্যুতে অবস্থান নিয়ে মার্সিডিজ, ভার্সেসের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ড এবং জন সিনা ও কেটি পেরির মতো তারকারাও চীনা বাজার থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় মঙ্গলবার এমবাপ্পে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে বলেন, তার মন্তব্যটি সুবিবেচনাপ্রসূত ছিল না এবং তিনি বুঝতে পেরেছেন যে এটি চীনের অসংখ্য মানুষের অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে। একই দিনে লা লিগা কর্তৃপক্ষ চীনা সমর্থকদের কাছে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। বুধবার রিয়াল মাদ্রিদও ক্লাবের পক্ষ থেকে চীনা জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। এর আগে ২০১৯ সালে হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের পক্ষে তৎকালীন হিউস্টন রকেটস কর্মকর্তা ড্যারিল মোরির মন্তব্যের জেরে বাস্কেটবল লিগ এনবিএর প্রাক-মৌসুম ম্যাচগুলো টানা ছয় বছর চীনে বন্ধ ছিল। লা লিগা দ্রুত ক্ষমা চেয়ে সেই চরম পরিণতি এড়ানোর পথ খুঁজছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াচুন বুধবার জানান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টিকে তারা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়েছেন। এছাড়া রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তারা এমবাপ্পের বক্তব্যের পাশাপাশি তার পরবর্তী কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।