/
হোম › ক্রীড়া সংবাদ › প্রতিবেদন
ভাষা / Language:

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো: এক বর্ণিল অধ্যায়ের সমাপ্তি

পর্তুগালের হয়ে ২৩ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। স্কাই স্পোর্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করা এই কিংবদন্তি খেলোয়াড় কোচ জর্জ জেসুসের সাথে মতবিরোধের জেরে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো: এক বর্ণিল অধ্যায়ের সমাপ্তি
এআই-নির্মিত প্রতীকী ছবি
সারসংক্ষেপ: মূল ৩ তথ্য
•
কী ঘটেছে: ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন।
•
ম্যাচের প্রভাব: কোচ জর্জ জেসুসের সাথে মতবিরোধের জেরে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
•
সামনে কী: পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন তাকে বড় বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

পর্তুগালের জার্সিতে ২৩ বছরের দীর্ঘ এবং বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা তার অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন, যা বিশ্ব ফুটবলের একটি বিশাল অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। স্কাই স্পোর্টসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোনালদো তার জাতীয় দলের হয়ে ২৩৪টি ম্যাচ খেলেছেন এবং ১৪৬টি গোল করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি পর্তুগালকে ইউরো ২০১৬ এবং দুটি নেশনস লিগ শিরোপা জেতাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে তার এই বিদায়টি এসেছে পর্তুগিজ কোচ জর্জ জেসুসের সাথে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিরতিতে হওয়া এক তিক্ত মতবিরোধের পর।

রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছিল ট্রফি, চোখের জল, রেকর্ড এবং বিতর্কের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। ২৩ বছর ধরে তিনি অত্যন্ত আবেগের সাথে পর্তুগালের জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন। তার অর্জন এবং জাতীয় দলের হয়ে তার উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক আগামী অনেক বছর ধরে চলবে। প্রধানত দুটি প্রশ্ন সামনে আসছে: তার সেরা সময়ে তিনি কি পর্তুগালকে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে পারতেন? এবং ক্যারিয়ারের শেষ বছরগুলোতে তিনি কি দলের পূর্ণ সম্ভাবনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন? এই বিশ্লেষণগুলো যখন লিওনেল মেসির মতো প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে তার রেকর্ডের তুলনা করবে, তখন এটি ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে রোনালদোর উজ্জ্বলতা পর্তুগালকে গৌরবময় দিন উপহার দিয়েছে।

পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে রোনালদো যুগই সবচেয়ে সফল সময়। ইউরো ২০১৬ জয় ছিল দেশটির একমাত্র বড় টুর্নামেন্ট শিরোপা। যদিও ইনজুরির কারণে ফাইনালের বেশিরভাগ সময় তাকে সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের নির্দেশনা দিতে দেখা গিয়েছিল, তবুও তিনি ছিলেন সেই উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ প্লে-অফে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের সুইডেনের বিপক্ষে তার হ্যাটট্রিক ছিল একটি মহাকাব্যিক মুহূর্ত, যা পর্তুগালকে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়েছিল। রোনালদো নিজেই বলেছিলেন, পর্তুগালের প্রয়োজনে তিনি সবসময় উপস্থিত ছিলেন। ছয়টি বিশ্বকাপ এবং ছয়টি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে তার অংশগ্রহণ তার অদম্য মানসিকতার পরিচয় দেয়।

রোনালদো তার অবসরের বিবৃতিতে বলেছেন, আমি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার জন্য আমার জীবন উৎসর্গ করেছি। আজ আমি বুঝতে পারছি যে আমার সবচেয়ে বড় জয় ছিল বিশ্বের সেরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সম্মান অর্জন করা। ১৭২ বার পর্তুগালের অধিনায়কত্ব করা এই খেলোয়াড় জাতীয় দলের প্রতি তার গভীর আনুগত্য সবসময় প্রকাশ করেছেন। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে ওয়েইন রুনির লাল কার্ডের ঘটনায় তার ভূমিকা ইংল্যান্ডের সমর্থকদের কাছে আজও স্মরণীয়। তবে আবেগী হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক পরাজয়ের আঘাতগুলো তিনি ক্লাবের চেয়েও বেশি গভীরভাবে অনুভব করতেন।

২০২২ সালের বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের সময় টানেলে তার কান্নার দৃশ্যটি ছিল বড় মঞ্চে ব্যর্থতার যন্ত্রণার এক নিষ্ঠুর প্রতিফলন। তিনি স্বীকার করেছেন যে, এমন কিছু মুহূর্ত ছিল যখন তিনি পর্তুগিজ জনগণকে তাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দিতে পারেননি। ২০০৪ সালের ইউরো ফাইনালে গ্রিসের কাছে হার ছিল তার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের এক বড় ধাক্কা। চারটি বিশ্বকাপে তিনি মাত্র একটি গোল করেছিলেন এবং এই গ্রীষ্মের আগে পর্যন্ত বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তার কোনো গোল ছিল না। এই পরিসংখ্যানগুলো নিয়ে অনেক সময় প্রশ্ন উঠেছে যে, তার উপস্থিতির কারণে পর্তুগালের প্রতিভাবান প্রজন্ম কি আরও শিরোপা জিততে পারত?

মেসির ক্যারিয়ারের সাথে রোনালদোর এই তুলনা অনিবার্য। মেসি তার ক্যারিয়ারের শেষ দিকে বিশ্বকাপ এবং কোপা আমেরিকা জিতে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। অন্যদিকে, রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে নরওয়েতে দলের অব্যবহৃত বদলি খেলোয়াড় হিসেবে। ৪১ বছর বয়সে এসে রোনালদো দলের সিস্টেমের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। গঞ্জালো রামোস ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জয়সূচক গোল করেছিলেন যখন রোনালদো মাঠের বাইরে ছিলেন। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ৬-১ গোলের জয়েও রামোস হ্যাটট্রিক করেছিলেন, যখন রোনালদো কোচ ফার্নান্দো সান্তোসের সাথে মতবিরোধের কারণে বাদ পড়েছিলেন।

নরওয়েতে যখন রোনালদো ওয়ার্ম-আপ করছিলেন, তখন তিনি পর্তুগিজ কোচ জর্জ জেসুসের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তোলেন। সেই ক্যাম্প থেকে তিনি দ্রুত বেরিয়ে যান, যা ছিল একটি অস্বস্তিকর বিদায়। রোনালদো পরবর্তীতে দাবি করেন যে তিনি পেলে বা ম্যারাডোনার উচ্চতার একজন খেলোয়াড়। তার এই আত্মবিশ্বাস এবং অহংবোধ তাকে চূড়ায় নিয়ে গেলেও, দলের একজন সাধারণ খেলোয়াড় হিসেবে মানিয়ে নিতে বাধা দিয়েছে।

ফিফা তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় তিনি উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে পর্তুগালের হার ছিল হতাশাজনক। রোনালদো এখন নিজেই চূড়ান্ত বাঁশি বাজিয়েছেন। পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন তাকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে তার এই বিদায় কি চূড়ান্ত, নাকি আরও কোনো চমক অপেক্ষা করছে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। পর্তুগাল কি রোনালদোকে ছাড়া আরও সুসংহত দল হিসেবে গড়ে উঠবে, তা দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব। তবে তার ব্যক্তিগত রেকর্ডগুলো পর্তুগালের ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

প্রতিবেদনটি শেয়ার করুন:
WhatsApp Facebook X (Twitter)