সৌদি প্রো লিগে রোমাঞ্চকর এক ম্যাচে আল খুলুদের বিপক্ষে ৫-৩ গোলের ব্যবধানে জয় তুলে নিয়েছে আল নাসর। দলের এই দাপুটে জয়ের মূল কারিগর ছিলেন পর্তুগিজ সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, যিনি দ্বিতীয়ার্ধে মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে নিখুঁত এক হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন। আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম ইনফোবায়ে দেপোর্তেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথমার্ধে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর ম্যাচটি যখন অমীমাংসিত অবস্থায় ছিল, ঠিক তখনই মাঠে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন রোনালদো। এই জয়ের মধ্য দিয়ে লিগে আল নাসরের সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ২৮ পয়েন্ট, যা তাদের পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষস্থান দখল করে থাকা আল কাদিসিয়ার সাথে যৌথভাবে সমান অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
ম্যাচের প্রথমার্ধে একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হলেও রোনালদো দমে যাননি। স্কোরলাইন যখন ২-২ সমতায়, তখন ৬৬ মিনিটে বাঁ প্রান্ত ধরে আক্রমণ গড়ে তোলেন অ্যাঞ্জেলো। তিনি বল বাড়িয়ে দেন জোয়াও ফেলিক্সের দিকে। ফেলিক্স আল খুলুদের ডি-বক্সের ভেতর বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রোনালদোকে দারুণ পাস দেন। বক্সের একেবারে সামনে ফাঁকা থাকা রোনালদো কোনো ভুল না করে আলতো ছোঁয়ায় লক্ষ্যভেদ করে দলকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। এই গোলটি ম্যাচের গতিপথ পুরোপুরি আল নাসরের অনুকূলে ঘুরিয়ে দেয়।
দলটির আক্রমণভাগের এই যুগলবন্দী মাত্র ছয় মিনিট পর ফের দৃশ্যমান হয়। ম্যাচের ৭২তম মিনিটে অ্যাঞ্জেলো মাঠের মাঝখান দিয়ে আক্রমণ সাজিয়ে বল তুলে দেন ফেলিক্সের পায়ে। পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে পেনাল্টি সীমানায় এমন একটি সময়ে নিখুঁত ক্রস বাড়ান, যখন বলটি বাইলাইনের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সঠিক সময়ে গোলমুখে উপস্থিত হয়ে চমৎকার হেডে বল জালে জড়ান রোনালদো। এতে দলের ব্যবধান যেমন বাড়ে, তেমনি গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শকদের মাঝে সৃষ্টি হয় তুমুল উচ্ছ্বাস।
### বিতর্কিত গোলের হিসাব ও মেসির সাথে ব্যবধান
রোনালদো নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন ম্যাচের ৮১ মিনিটে। সেই আক্রমণের সূচনা করেছিলেন সাদিও মানে। সেনেগালিজ এই ফরোয়ার্ড আল খুলুদের গোলরক্ষক হামেদ আবদুল্লাহর সঙ্গে একাকী লড়াইয়ে পরাস্ত হলেও ফিরতি বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ডান দিক থেকে ফাঁকায় থাকা রোনালদোকে পাস দেন। শান্ত মাথায় ফিনিশিং টেনে রোনালদো ম্যাচে নিজের তৃতীয় গোলটি নিশ্চিত করেন। পুরো ম্যাচে রোনালদো লাইমলাইটে থাকলেও সতীর্থ জোয়াও ফেলিক্সের অবদানও ছিল অসাধারণ। প্রথমার্ধের দুটি গোলসহ ম্যাচে মোট চারটি গোলের সরাসরি অ্যাসিস্ট করেন তিনি।
মাঠের খবরে গত ২৯ অক্টোবরের প্রতিবেদনে আল খুলুদের বিপক্ষে ৫-৩ ব্যবধানের এই জয়ের প্রাথমিক তথ্য উঠে এসেছিল। তবে পরিসংখ্যানের খাতায় রোনালদোর গোলের মোট সংখ্যা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি এখনো দূর হয়নি। আল ফয়সালির বিপক্ষে ১১তম রাউন্ডের খেলায় রোনালদো একটি গোল উদযাপন করেছিলেন, যা তার তখনকার ৯৮১ গোলের রেকর্ডকে এগিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। সৌদি লিগের অফিশিয়াল কর্তৃপক্ষ সেই গোলটি রোনালদোর নামের পাশেই জমা করেছে। তবে শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া পরিসংখ্যান সরবরাহকারী অপ্টা সেটিকে ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় আন্দ্রেই গিরোত্তোর আত্মঘাতী গোল হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। স্প্যানিশ গণমাধ্যম মার্কা এই ঘটনাকে 'ভূতুড়ে গোল' হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিতর্কিত সেই গোলটি বাদ দিয়ে অপ্টার স্বীকৃত হিসাব অনুযায়ী, আল খুলুদের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর রোনালদোর অফিসিয়াল ক্যারিয়ার গোল সংখ্যা এখন ৯৮৪টি। ফুটবল ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ১,০০০ অফিসিয়াল গোলের অনন্য মাইলফলকে পৌঁছাতে তার প্রয়োজন আর মাত্র ১৬টি গোল। আল খুলুদের বিপক্ষে ম্যাচসেরার পুরস্কার পাওয়া রোনালদো এখন এই ঐতিহাসিক মাইলফলকের দিকেই ছুটছেন।
অন্যদিকে, ফুটবলের সর্বকালের সেরা গোলদাতার লড়াইয়ে রোনালদোর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি এখনও পিছিয়ে রয়েছেন। আর্জেন্টাইন অধিনায়কের বর্তমান ক্যারিয়ার গোল সংখ্যা ১,১৮৪টি অফিসিয়াল ম্যাচে ৯৩৬টি। রোনালদোর চেয়ে তিনি ৪৮ গোলে পিছিয়ে আছেন। তবে মেসির সামনে এই ব্যবধান কিছুটা কমানোর সুযোগ দ্রুতই আসছে। আগামী রবিবার মেজর লিগ সকারে ইন্টার মায়ামির জার্সিতে নিউ ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবেন মেসি, যা শুরু হবে আর্জেন্টিনা সময় রাত ৯টায়।
ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও সময়টা দারুণ কাটছে পর্তুগিজ অধিনায়কের। আল খুলুদের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করার মাত্র কিছুদিন আগেই ব্যালন ডি'অরের অফিশিয়াল প্ল্যাটফর্মে সমর্থকদের ভোটে 'ইতিহাসের সেরা ব্যালন ডি'অর' বা বোট খেতাব জিতেছেন রোনালদো। সাধারণ দর্শকদের জন্য এক ইউরো ব্যয়ে ভোট দেওয়ার সুবিধা সংবলিত এই প্রতিযোগিতায় ২০০৮ সালে রোনালদোর পাওয়া ব্যালন ডি'অরকে সর্বকালের সেরা ঘোষণা করা হয়। এই ভোটাভুটিতে দ্বিতীয় স্থানে ছিল ২০১২ সালে পাওয়া লিওনেল মেসির ব্যালন ডি'অর জয়টি। সব মিলিয়ে সৌদি প্রো লিগের শিরোপা লড়াইয়ে আল নাসরকে শীর্ষে রাখার পাশাপাশি রোনালদো এখন এগিয়ে চলেছেন ক্যারিয়ারের এক হাজার গোলের স্বপ্নের ঠিকানায়।