ফরাসি গণমাধ্যম আরএমসি স্পোর্ট জানিয়েছে যে ফুটবলের রেকর্ড বইয়ে নিজের নাম আরও উজ্জ্বল করার পথে এক ধাপ এগিয়ে গেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সৌদি প্রো লিগে আল-খুলুদের বিপক্ষে ম্যাচে ৫-৩ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়েছে আল-নাসর। এই রুদ্ধশ্বাস ও গোলবন্যা ম্যাচে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করেছেন পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা তার বর্ণিল ও রেকর্ডসমৃদ্ধ ক্যারিয়ারে এক হাজার গোলের মাইলফলকের আরও কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। বর্তমান এই জয়ের পর তার নামের পাশে ক্যারিয়ারে মোট গোলের সংখ্যা দাঁড়াল ৯৮৪টি। অর্থাৎ ইতিহাসের অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছাতে তার মাত্র ষোলোটি গোলের প্রয়োজন রয়েছে। মাঠের লড়াইয়ে আল-নাসরের হয়ে তার এই পারফরম্যান্স দলটিকে পয়েন্ট টেবিলে আরও উঁচুতে নিয়ে গেছে।
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য রোনালদোর জন্য অন্যভাবে হতে পারত। খেলার একদম প্রথমার্ধের দিকে তার একটি শট জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে সেই গোলটি বাতিল ঘোষণা করা হয়। তবে এই হতাশাকে দ্রুত পেছনে ফেলে ম্যাচের দ্বিতীয় আর্ধে নিজের সেরা রূপের ঝলক দেখান তিনি। সতীর্থ জোয়াও ফেলিক্সের কাছ থেকে একটি দারুণ পাস পেয়ে ম্যাচের ৬৬তম মিনিটে প্রথম গোলটি করেন রোনালদো। ফেলিক্সের বাড়ানো পাস থেকে গোল করে তিনি দলের আক্রমণভাগকে আরও শাণিত করেন। এই গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই ৭২তম মিনিটে আরও একটি দুর্দান্ত গোল আদায় করে নেন এই পর্তুগিজ তারকা।
ম্যাচের ৭২তম মিনিটে স্বদেশী জোয়াও ফেলিক্সের দ্বিতীয় আরেকটি নিখুঁত পাস থেকে হেডের সাহায্যে গোল করে নিজের জোড়া গোল তথা ডাবল পূর্ণ করেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। হেডের মাধ্যমে করা এই গোলটি ছিল তার স্বভাবসুলভ ক্ষিপ্রতার প্রতীক। এরপর ম্যাচের ৮১তম মিনিটে সতীর্থ সাদিও মানের একটি অসাধারণ বলের গতিপথ ধরে এবং মানের একক আক্রমণ বা রাশ থেকে বল জালে জড়িয়ে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তিনি। এই হ্যাটট্রিকের মধ্য দিয়ে আল-খুলুদের রক্ষণভাগ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। খেলার শেষ পর্যন্ত এই ব্যবধান ধরে রেখে দল পূর্ণ তিন পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়তে সক্ষম হয়।
দলের সামগ্রিক সাফল্যের দিক থেকেও এই ম্যাচটি আল-নাসরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সৌদি প্রো লিগে এটি ছিল আল-নাসরের টানা চতুর্থ জয়। এই জয়ে পয়েন্ট টেবিলের সমীকরণে বড় পরিবর্তন এসেছে। আল-নাসর সাময়িকভাবে পয়েন্ট তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। মজার বিষয় হলো, বর্তমান পয়েন্ট টেবিলে তারা শীর্ষস্থানাধিকারী দল আল-কাদসিয়াহর ঠিক সমপরিমাণ পয়েন্ট নিয়ে অবস্থান করছে। আল-কাদসিয়াহ দলে খেলছেন টিিজানি রেইজডার্স এবং জুলিয়ান কুইনোনসের মতো ফুটবলাররা। লিগের এই তীব্র প্রতিযোগিতায় আল-নাসরের এমন ফর্ম সমর্থকদের আশাবাদী করে তুলেছে।
ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্য সপ্তাহটি অত্যন্ত আনন্দের এবং অর্জনে ভরপুর ছিল। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সপ্তাহের শুরুতেই অনলাইনে একটি পেইড ভোটিংয়ের মাধ্যমে তাকে সর্বকালের সেরা ব্যালন ডি'অর তথা ব্যালন ডি'অর অব অল টাইম খেতাবে ভূষিত করা হয়েছে। তার এই দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের স্বীকৃতি স্বরূপ ভক্তরা তাকে এই সম্মাননা জানান। ক্লাব ফুটবলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার জন্য সুসংবাদ রয়েছে। পর্তুগাল জাতীয় দলের কোচ জর্জ জেসুসের সাথে অতীতের কিছু দ্বন্দ্ব বা মতপার্থক্য ভুলে এবার তাকে পর্তুগালের আসন্ন ম্যাচগুলোর জন্য একটি প্রি-কনোভোকেশন বা প্রাথমিক স্কোয়াডে রাখা হয়েছে।
জাতীয় দলের স্কোয়াডে এই সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি পর্তুগিজ জার্সিতে তার মাঠে ফেরার পথকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। গত কিছু দিন ধরে জাতীয় দলের সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন শোনা গেলেও এই প্রি-কনোভোকেশন সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়েছে। দেশের হয়ে খেলার তাড়না এবং গোলসংখ্যা এক হাজারে উন্নীত করার তীব্র জেদ তাকে মাঠে এবং মাঠের বাইরে সমানভাবে ব্যস্ত রাখছে। আল-নাসরের জার্সিতে এই মৌসুমে তার ধারাবাহিক গোল করার ক্ষমতা প্রমাণ করে যে বয়সের সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান মাত্র। ৪১ বছর বয়সে এসেও ইউরোপ ও এশিয়ার ফুটবলে নিজের চিরচেনা ছন্দে গোল করে চলেছেন তিনি।
ম্যাচটিতে আল-খুলুদ দলও লড়াই করার চেষ্টা করেছিল এবং মোট তিনটি গোল করে আল-নাসরের রক্ষণভাগকে বেশ কয়েকবার পরীক্ষা করেছে। কিন্তু আল-নাসরের আক্রমণভাগের আধিপত্য এবং রোনালদোর এই বিধ্বংসী হ্যাটট্রিক শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। পাঁচ গোলের থ্রিলারে ভরপুর এই ম্যাচটি সৌদি প্রো লিগের মান ও উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফুটবলপ্রেমীরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন কবে এই মহাতারকা এক হাজার গোলের সেই কাঙ্ক্ষিত চূড়ায় পৌঁছাবেন। আর মাত্র ১৬টি গোল বাকি থাকায় প্রতিটি ম্যাচই এখন রোনালদোর জন্য একেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক ছোঁয়ার উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
### আল-নাসরের জয়যাত্রা এবং রোনালদোর লক্ষ্য
সামনের দিনগুলোতে আল-নাসর এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সামনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ রয়েছে। সৌদি প্রো লিগের শিরোপা লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। আল-কাদসিয়াহর সাথে পয়েন্টের ব্যবধান ঘুচিয়ে এককভাবে শীর্ষে চলে যাওয়ার জন্য আল-নাসর ম্যানেজমেন্ট এবং খেলোয়াড়রা মুখিয়ে আছেন। বিশেষ করে দলের ফরোয়ার্ড লাইনে জোয়াও ফেলিক্স এবং সাদিও মানের সাথে রোনালদোর বোঝাপড়া দিন দিন আরও পোক্ত হচ্ছে। এই ত্রয়ী আক্রমণভাগ প্রতিপক্ষের রক্ষণের জন্য রীতিমতো আতঙ্ক হয়ে উঠেছে, যা আল-খুলুদের বিপক্ষে ম্যাচেও স্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে।
অন্যদিকে, পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামার সুযোগ আসায় রোনালদোর সামনে আন্তর্জাতিক ফুটবলেও রেকর্ড বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ক্লাব ও দেশের হয়ে তার এই দ্বৈত পারফরম্যান্স বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলতি মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই এক হাজার গোলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব কিছু নয়, যদি তার বর্তমান ফর্ম ও ফিটনেস অটুট থাকে। ফরাসি সংবাদমাধ্যম আরএমসি স্পোর্টের এই প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যগুলো বিশ্বজুড়ে থাকা রোনালদোর কোটি কোটি ভক্তের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।