ফুটবল বিশ্বের এক যুগের সমাপ্তি ঘটল। পর্তুগালের কিংবদন্তি ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী বছর ৪২ বছরে পা দিতে যাওয়া এই তারকা ২৩ বছর ধরে পর্তুগালের জার্সিতে মাঠ কাঁপিয়েছেন। সিবিএস স্পোর্টস সকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরো ২০১৬ জয় এবং দুইবার উয়েফা নেশনস লিগ শিরোপা জেতা রোনালদো তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার এই ঘোষণা ফুটবল বিশ্বে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।
রোনালদোর এই অবসরের সিদ্ধান্তটি হুট করে আসেনি। গত মাসে পর্তুগালের কোচ জর্জ জেসুসের সাথে তার একটি বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়। সিবিএস স্পোর্টস সকারের তথ্যমতে, সেই ঘটনার জেরে রোনালদো তার ব্যক্তিগত বিমানে করে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান। যদিও পরবর্তীতে তিনি ভক্ত ও দলের কাছে ক্ষমা চেয়ে একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন, তবে সেখানে কোচ জেসুসের নাম উল্লেখ করেননি। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন তাকে ৩০ দিনের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল। তবে ডেনমার্ক ও ওয়েলসের বিপক্ষে আসন্ন ম্যাচের জন্য তিনি দলে ফেরার যোগ্য ছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে রোনালদো তার অবসরের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পর্তুগিজ জনগণের কাছে, জাতীয় দলের সাত নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে, যা আমাদের সবার। আমি কখনোই মনে করিনি যে এটি শুধুমাত্র আমার। কিন্তু ২৩ বছর ধরে এটি পরা, রক্ষা করা এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে তা বহন করার বিশেষাধিকার ও দায়িত্ব আমার ছিল। আজ সময় এসেছে এটি ভবিষ্যতের হাতে তুলে দেওয়ার। এটি সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না, কারণ কিছু সিদ্ধান্ত কেবল মাথা দিয়ে নেওয়া হয় না; সেগুলো হৃদয় দিয়েও নেওয়া হয়।
রোনালদোর এই বিদায় তার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসির অবসরের ঠিক এক মাস পরেই এল। আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদোর পরিসংখ্যান অবিশ্বাস্য। পর্তুগালের হয়ে ২৩৪টি ম্যাচ খেলে তিনি মোট ১৪৬টি গোল করেছেন। এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি কেবল রেকর্ড বা ট্রফিই দেখেননি, বরং দেখেছেন মানুষ এবং আবেগের এক মেলবন্ধন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি মানুষের সাথে সম্পৃক্ত একটি আবেগ।
### মাঠের লড়াই ও ব্যক্তিগত অর্জন
রোনালদো তার ক্যারিয়ারে পাঁচটি ব্যালন ডি'অর জিতেছেন। এই গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে তিনি তার ষষ্ঠ এবং শেষবারের মতো অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই টুর্নামেন্টে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে স্পেনের কাছে হেরে পর্তুগাল বিদায় নেয়। মাঠের খবর-এর আর্কাইভ অনুযায়ী, রোনালদো সম্প্রতি আল-নাসরের হয়ে দারুণ ফর্মে ছিলেন। গত ৩০ অক্টোবর আল-খুলুদের বিপক্ষে ১৫ মিনিটে হ্যাটট্রিক করে তিনি ১০০০ গোলের মাইলফলকের খুব কাছে পৌঁছে গেছেন। যদিও জাতীয় দলের জার্সি তিনি তুলে রাখছেন, তবে ক্লাব ফুটবলে তার গোলক্ষুধা এখনো অটুট।
নিজের বিদায়ী বার্তায় রোনালদো আরও বলেন, ২০০৩ সালের আগস্টে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং যা আমার জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছে, তা এখন শেষ হতে চলেছে। আমি যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন কেবল ম্যাচ, গোল বা ট্রফি দেখি না। আমি দেখি সেই অভিবাসীদের, যারা ৯০ মিনিটের জন্য পর্তুগালকে একটু কাছে অনুভব করত। আমি দেখি সেই লক্ষ লক্ষ পর্তুগিজদের, যাদের সাথে আমার সরাসরি দেখা হয়নি, কিন্তু তারা আমার জীবনের অংশ হয়ে আছে।
তিনি আরও যোগ করেন, আমি সবসময় নিজের ওপর কঠোর ছিলাম। আমি সবসময় আরও বেশি চেয়েছি এবং বিশ্বাস করেছি আমরা আরও দূরে যেতে পারি। আমি এই জার্সির জন্য আমার সবকিছু দিয়েছি। এমন কিছু বিকেল ও সন্ধ্যা ছিল যা নিখুঁত, এমন কিছু জয় ছিল যা আমি কখনোই ভুলব না। আবার এমন কিছু পরাজয় ছিল যা আজও মনে করা কঠিন। আমি ব্যর্থ হয়েছি, ভুগেছি, কিন্তু আমি কখনোই হাল ছাড়িনি।
রোনালদো তার বার্তায় পর্তুগিজদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, যদি আমি আপনাদের কখনো আনন্দ দিয়ে থাকি, যদি আমার কোনো গোল আপনাদের কাউকে জড়িয়ে ধরতে সাহায্য করে থাকে, তবেই আমার এই পরিশ্রম সার্থক। গোল আসে এবং যায়, ট্রফি জাদুঘরে জমা হয়, রেকর্ড ভেঙে যায়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে আমরা যে জায়গা করে নিই, তা সময় কখনোই মুছে ফেলতে পারে না।
পরিশেষে, রোনালদো নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, পর্তুগাল এমন এক দেশ যারা সবসময় নতুন নায়ক তৈরি করে। কোনো অধিনায়ক একা হাঁটে না এবং পর্তুগালের তরুণদের স্বপ্ন দেখা থামানো উচিত নয়। রোনালদোর এই বিদায় পর্তুগিজ ফুটবলের জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা করবে, যেখানে নতুনরা তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার বহন করবে।