রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পেকে নিয়ে তৈরি একটি ডিজিটাল মিমকে কেন্দ্র করে চীন, স্পেন ও ফ্রান্সের সামাজিক এবং বাণিজ্যিক অঙ্গনে যে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তার মূলে থাকা তরুণ এবার নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'ফ্রেঞ্চআইকভারস' নামে পরিচিত ইউনেস খেলিফি নামের ওই ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা প্রকাশ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সংকটের রূপ নেওয়া এই ঘটনার পর তিনি তারকা ফুটবলারের কাছ থেকে আইনি নোটিশ বা মামলার মুখোমুখি হওয়ার চরম আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। ব্রাজিলের প্রখ্যাত ক্রীড়া মাধ্যম ইউওএল এসপোর্তে (UOL Esporte) ফরাসি সাময়িকী 'সো ফুট'-এর বরাতে খেলিফির সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ফ্রান্সের সংবাদমাধ্যম 'সো ফুট'-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউনেস খেলিফি জানান, রিয়াল মাদ্রিদ তারকার এই মিমটি তিনি অতি সাধারণ উদ্দেশ্যে বানিয়েছিলেন। সম্পূর্ণ নিছক বিনোদন ও বন্ধুদের সঙ্গে মজা করার তাগিদেই চিত্রটি তৈরি করা হয়েছিল বলে দাবি খেলিফির। তিনি বলেন, যখন তিনি বিছানায় শুয়ে ছবিটি এডিট করছিলেন, তখন চিন্তাও করতে পারেননি যে এটি বিশ্বের দুই পরাশক্তি ও আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে এমন তোলপাড় সৃষ্টি করবে। ঘুম থেকে উঠে পুরো ঘটনা আন্তর্জাতিক রূপ নিতে দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না বলে জানান এই তরুণ নির্মাতা।
### আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও আইনি মামলার আতঙ্ক
নিজের তৈরি ছবির পরিণতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে খেলিফি বলেন, "আমার খারাপ লাগছে না, তবে এটা ভেবে সত্যিই অদ্ভুত লাগছে যে একদিক থেকে এই সবকিছুর মূলে আমি নিজেই ছিলাম। আমি বিছানায় শুয়ে ছিলাম এবং নিজেকে বারবার বলছিলাম, 'কী অদ্ভুত এক পাগলামি হচ্ছে এটা!'" সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) নিজের বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি লেখেন, "সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি যে আমি একটি কূটনৈতিক ঘটনার জন্ম দিয়ে ফেলেছি।" তবে এই বিস্ময়ের পরপরই তার মনে চেপে বসেছে আইনি পরিণতির ভয়। এমবাপ্পে ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করতে পারেন—এমন ভাবনায় তিনি উদ্বিগ্ন। খেলিফি বলেন, "এমবাপ্পে যদি আমাকে আদালতে নিয়ে যান, তবে আমি পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যাব!"
এই চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেও খেলিফি জানান, তিনি এমবাপ্পের সার্বিক পরিস্থিতির জন্য সহানুভূতি অনুভব করছেন। অনিচ্ছাকৃতভাবে ফরাসি জাতীয় দলের অধিনায়ক যে বিরাট বাণিজ্যিক লোকসানের মুখোমুখি হয়েছেন, তা নিয়ে খেলিফি নিজেও দুঃখিত। বিষয়টি এতটাই জটিল রূপ নিয়েছিল যে, বেইজিংয়ে পরিস্থিতি ঠিকঠাক আছে কি না তা জানতে খেলিফি চীনে অবস্থিত ফরাসি দূতাবাসে যোগাযোগ করার কথাও ভেবেছিলেন বলে জানান।
ফরাসি এক টেলিভিশন টকশোর পুরোনো ভিডিও ক্লিপ চলতি সপ্তাহে নতুন করে ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়ার পর থেকে এই বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। ওই অনুষ্ঠানে এমবাপ্পেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, অনলাইনে কোন মিমটি তাকে সবচেয়ে বেশি হাসায়? উত্তরে রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড অকপটে বলেছিলেন, "যেটিতে ফরাসিরা আমার মুখটি একজন চীনা একনায়কের চেহারার ওপর বসিয়ে দেয়, সেটি।" এমবাপ্পে আরও যোগ করেছিলেন যে, এই মিমটি তার এতটাই পছন্দের যে তিনি এটি ব্যক্তিগতভাবে বন্ধুদের সাথে প্রতিনিয়ত শেয়ার করেন এবং তা দেখে হেসে থাকেন।
ভিডিওতে যদিও এমবাপ্পে নির্দিষ্ট করে কারও নাম উচ্চারণ করেননি, তবে সেখানে যে ডিজিটাল ছবিটি যুক্ত করা হয়েছিল তা ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুংয়ের ঐতিহাসিক পোর্ট্রেটের ওপর এমবাপ্পের মুখ বসানো। খেলিফির তৈরি সেই মিমটি টেলিভিশন ফ্রেম থেকে কেটে নিয়ে রেডইট এবং চীনের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর পরপরই চীনা ভক্তদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।
### বাণিজ্যিক ধাক্কা ও আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা
মাঠের খবরের আগের দুটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৬ সালের ২৮ ও ২৯ অক্টোবরের মধ্যে ঘটনার রেশ ধরে চীনে এমবাপ্পের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যে ভয়াবহ ধস নামে। চাইনিজ স্পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুততার সঙ্গে তাদের কোটি ডলারের চুক্তি বাতিল ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) লা লিগার সমস্ত সম্প্রচার অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দেয় এবং রিয়াল মাদ্রিদ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সব ধরনের আলোচনা বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সংবাদ সংস্থা এএফপির (AFP) মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা বার্তা পাঠাতে বাধ্য হন এমবাপ্পে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, কাউকেও আঘাত করার উদ্দেশ্য তার ছিল না এবং চীনা জনগণের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা রয়েছে।
এমবাপ্পের দুঃখপ্রকাশের পর স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদও একটি দীর্ঘ আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে চীন সরকারের কাছে এবং দেশটির কোটি কোটি ক্লাবের সমর্থকদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে। রিয়াল মাদ্রিদ তাদের বার্তায় জোর দিয়ে জানায় যে, স্প্যানিশ ক্লাবটি চীনা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও নাগরিকদের সম্মান করে এবং দুই দেশের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে খেলিফির এই সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার প্রমাণ করে যে, মাঠের বাইরের এক ডিজিটাল রসিকতা কীভাবে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় এবং শীর্ষ ক্লাবকে এক অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।