ইতালিয়ান দৈনিক কোরিয়েরে দেল্লো স্পোর্ট জানিয়েছে যে কোমো ফুটবল ক্লাব উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বের চতুর্থ ম্যাচে এক ঐতিহাসিক রাত কাটিয়েছে। ফরাসি ক্লাব লঁসের বিপক্ষে স্টাদে বোলায়ার্ট-ডেলেলিস স্টেডিয়ামে তারা ৯-১ গোলের এক বিশাল ব্যবধানে জয় তুলে নিয়েছে। এই অবিশ্বাস্য জয়ে দলটির হয়ে হ্যাটট্রিক করেছেন স্ট্রাইকার দুভিকাস। এছাড়াও স্কোরশিটে নাম লিখিয়েছেন নিকো পাজ, দা কুन्हा, কেম্পফ, লিবেরালি, বাচুরিস্তা এবং বদলি হিসেবে নেমে অভিষিক্ত পাপাচিওলি। ফরাসিদের হয়ে একমাত্র সান্ত্বনার গোলটি করেন রুবেন আগুইলার। ফ্যাব্রোগাসের দল এর আগের রাউন্ডে সিনিকালিয়ায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ৪-১ গোলে পরাজিত করেছিল। এই জয়ে তারা ৯ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের চতুর্থ অবস্থানে উঠে এসেছে। এই জয়ের মাধ্যমে কোমো এমন একটি রেকর্ড ভেঙেছে যা গত ৫৫ বছরে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মূল পর্বে কেউ করতে পারেনি। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে ফেইেনুর্ড অলিম্পিয়াকোস নিকোসিয়ার বিপক্ষে ৯-০ গোলে জেতার পর এই প্রথম কোনো দল অ্যাওয়ে ম্যাচে নয়টি গোল করল।
ম্যাচের শুরু থেকেই কোমো আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলতে শুরু করে। মাত্র সাত মিনিটের মাথায় কর্নার কিক থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন দুভিকাস। পেরোনের হেডের পর কাছ থেকে বল জালে পাঠান তিনি, যেখানে তার সতীর্থ রামনও গোলের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। ষোলোতম মিনিটে ম্যাচের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে যখন থাভিনের ক্রসে সজ্জির হ্যান্ডবলের অভিযোগে পেনাল্টি দেয় রেফারি। তবে ভিএআর মনিটরের সাহায্য নিয়ে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। সেই যাত্রায় রক্ষা পাওয়ার পর কোমো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। প্রথমার্ধের অর্ধেকের বেশি সময় পার হওয়ার পর ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটি আসে। নিকো পাজের ক্রস থেকে বল পেয়ে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে নিজের দ্বিতীয় গোল পূর্ণ করেন দুভিকাস। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে নিখুঁত কাউন্টার অ্যাটাক থেকে কোমো তাদের তৃতীয় গোলটি করে। এই গোলটি করেন নিকো পাজ, যিনি গোল করার পর জেসুস দে মিগুয়েলকে উৎসর্গ করা একটি জার্সি প্রদর্শন করেন।
### দ্বিতীয়ার্ধের গোলবন্যা এবং ইতিহাস গড়া জয়
খেলার দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও কমোর আক্রমণভাগের ধার একবিন্দুও কমেনি। দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরুর মাত্র দুই মিনিটের মাথায় ডি বক্সের ভেতর থেকে কোনাকুনি শটে গোল করে ব্যবধান ৪-০ করেন দা কুन्हा। এরপর লঁসের গোলরক্ষক রিসার কমোর অধিনায়ককে একটি নিশ্চিত গোলের হাত থেকে বাঁচালেও বেশিক্ষণ রক্ষা করতে পারেননি। তেপান্নতম মিনিটে মিলার নিখুঁত ক্রস থেকে হেডের সাহায্যে গোল করে দলের পঞ্চম গোলটি করেন কেম্পফ। এর ঠিক চার মিনিট পর নিকো পাজের জাদুকরী পাস থেকে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন ফর্মে থাকা দুভিকাস। স্কোর তখন ৬-০। ম্যাচের বাষট্টিতম মিনিটে মাঠে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই লিবেরালি দলের সপ্তম গোলটি করেন। রামন তাকে বল বাড়িয়ে দিলে তিনি নিখুঁত শটে গোলরক্ষক রিসারকে পরাস্ত করেন। এর অল্প পরেই লঁসের রুবেন আগুইলার একটি চমৎকার ভলিতে দলের হয়ে একটি গোল পরিশোধ করেন।
তবে কমোর গোলবন্যা থামেনি। এর কিছুক্ষণের মধ্যে লিবেরালির হিল-পাস থেকে বল পেয়ে দলের অষ্টম গোলটি করেন বাচুরিস্তা। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে এসে গোলের দেখা পান আঠারো বছর বয়সী তরুণ পাপাচিওলি। মূল দলে অভিষেক ম্যাচেই তিনি দলের হয়ে নবম গোলটি করেন। প্রথমে অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হলেও পরে ভিএআর চেক করে সেটি বৈধ ঘোষণা করা হয়। এই ৯-১ গোলের বিশাল জয়ের মাধ্যমে কোমো ইউরোপিয়ান ফুটবলে নিজেদের শক্ত অবস্থানের জানান দিল। ফ্যাব্রোগাসের দল যেভাবে একের পর এক রেকর্ড ভেঙে এগিয়ে চলেছে, তাতে চলতি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ মৌসুমে তারা অন্যতম আলোচিত দলে পরিণত হয়েছে। কোরিয়েরে দেল্লো স্পোর্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই জয় কেবল পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষ চারে তাদের স্থান নিশ্চিত করেনি, বরং ইউরোপের অন্যতম ভয়ের প্রতিপক্ষ হিসেবে তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কমোর এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের পেছনে দলের ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলা এবং তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের দুর্দান্ত সমন্বয় কাজ করেছে। ম্যাচজুড়ে মিডফিল্ডে নিকো পাজ এবং পেরোনে যেভাবে খেলা নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তা ফরাসি রক্ষণভাগকে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছিল। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে কমোর বদলি খেলোয়াড়রা যেভাবে মাঠে নেমে প্রভাব বিস্তার করেছেন, তা কোচ ফ্যাব্রোগাসের কৌশলগত সাফল্যেরই প্রমাণ। লঁসের ঘরের মাঠে এত বড় ব্যবধানে জয় পাওয়া যেকোনো ইতালিয়ান ক্লাবের জন্যই একটি বিরাট অর্জন। সমর্থকরাও এই জয়ের পর আনন্দে মেতে উঠেছে, যা ক্লাবের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে।
ম্যাচ পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় এই জয়ের গুরুত্ব আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। চার ম্যাচ শেষে নয় পয়েন্ট নিয়ে কোমো এখন ইউরোপের জায়ান্টদের ঠিক পেছনেই অবস্থান করছে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে আগের জয়ের ধারা ধরে রেখে লঁসের বিপক্ষে এই পারফরম্যান্স প্রমাণ করে যে ফ্যাব্রোগাসের শিষ্যরা কেবল অংশগ্রহণ করতে আসেনি, তারা ইউরোপীয় ফুটবলে নতুন ইতিহাস রচনা করতে এসেছে। এই ম্যাচটি দীর্ঘদিন ধরে ফুটবলপ্রেমীদের মনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, বিশেষ করে ৫৫ বছরের রেকর্ড ভেঙে অ্যাওয়ে ম্যাচে নয়টি গোল করার কীর্তির জন্য। দলের প্রতিটি খেলোয়াড় মাঠে নিজেদের শতভাগ উজড়ে দিয়েছেন এবং তা স্কোরবোর্ডে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।