স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে চেলসির কাছে ২-০ গোলের শোচনীয় পরাজয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অভ্যন্তরীণ সংকট নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে। সিবিএস স্পোর্টস সকারের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলের ব্যর্থতার জন্য কোচ ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের কৌশলকে দায়ী করলেও, মাঠে সিনিয়র খেলোয়াড়দের বাজে পারফরম্যান্স ও শৃঙ্খলার অভাবই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ। হেড কোচ মাইকেল ক্যারিকের কৌশলগত ভুল থাকলেও, চেলসির মাঠে রেড ডেভিলদের এই পতন ছিল মূলত খেলোয়াড়দের নিজেদেরই ডেকে আনা এক বিপর্যয়।
ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় যখন মরগান রজার্স ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মধ্যমাঠ ও রক্ষণভাগ চিরে চেলসিকে এগিয়ে নেন। ইউনাইটেড রক্ষণভাগের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে রজার্স বক্সে প্রবেশ করেন, যেখানে রেফারি পিটার ব্যাংকসের স্পষ্ট দৃষ্টির সামনেই অ্যানদ্রে সান্তোস উন্মুক্ত জায়গায় বল বাড়িয়ে দেন। একটি ভুলই পুরো ইউনাইটেড দলকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলে। মধ্যমাঠে কার্লোস বালেবা চেলসির হাই প্রেসিংয়ের মুখে একের পর এক ভুল পাস দিয়ে দলগত আক্রমণের গতি নষ্ট করেন।
ইউনাইটেডের এই আত্মঘাতী পারফরম্যান্সের সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিলেন রক্ষণের নির্ভরযোগ্য তারকা লিসান্দ্রো মার্তিনেস। 'দ্য বুচার' খ্যাত এই আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার মাত্র ২১০ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। প্রথমে রজার্সকে রাগবি স্টাইলে ফাউল করার পর, চেলসির কর্নার কিকের সময় বক্সে ওয়েসলি ফোফানাকে অবৈধভাবে বাধা দেন মার্তিনেস। প্রাপ্ত পেনাল্টি থেকে কোল পামার সহজেই গোল করে চেলসির ২-০ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন।
ম্যাচের শুরুতেই অবশ্য সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল ইউনাইটেড। আক্রমণভাগে ব্রায়ান এমবিউমো চেলসির সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের ডানদিকে টেনে নিয়ে জায়গা তৈরি করেছিলেন। ফলে ২৪ বছর বয়সী উইঙ্গার আমাদ দিয়ালো—যিনি ইউনাইটেডের হয়ে ১০০টিরও বেশি ম্যাচ খেলেছেন—এবং অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেস প্রথমার্ধে যথেষ্ট জায়গা পান। কিন্তু এই সুযোগগুলো কাজে লাগাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন তারা। প্রথমার্ধে আমাদের শেষ শটটি ছাড়া ইউনাইটেডের আক্রমণভাগ প্রতিপক্ষের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
রজার্সের প্রথম গোলটি নিয়ে ম্যাচ শেষে নিজের হতাশা ব্যক্ত করেন মাইকেল ক্যারিক। তিনি বলেন, "যেকোনো গোল হজম করাই খারাপ। মরগান আমাদের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে গেল। ম্যাচটি সমতায় ছিল, আর ওই মুহূর্তে গোল হজম করাটা বড় এক ধাক্কা ছিল। এখন আমার কাজ মঙ্গলবার রাতের ম্যাচের জন্য ছেলেদের প্রস্তুত করা।"
### ড্রেসিংরুমের অসন্তোষ ও নেতৃত্বের দায়
চেলসির বিপক্ষে এই পারফরম্যান্স ইউনাইটেড খেলোয়াড়দের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পুরোপুরি বিপরীত। দুই সপ্তাহ আগে লিসান্দ্রো মার্তিনেস প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে স্পোর্টিং ডিরেক্টর জেসন উইলকক্স গ্রীষ্মকালীন দলবদলে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাকে সমর্থন করেছিলেন আমাদ দিয়ালো। এছাড়া কোমো ম্যাচের পর কোচের কৌশল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন ব্রুনো ফার্নান্দেস। সিবিএস স্পোর্টস সকার উল্লেখ করেছে, ক্লাবের বোর্ডের কাছে পেশাদারিত্বের উচ্চ মান দাবি করার আগে খেলোয়াড়দের নিজেদেরও মাঠে সেই মানের পারফরম্যান্স নিশ্চিত করা উচিত।
এই পরাজয়ে ইউনাইটেডের সাম্প্রতিক ফর্ম আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। গত ৩০ অক্টোবর ও ১ নভেম্বরের 'মাঠের খবর'-এর পূর্ববর্তী প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ম্যাচের আগে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৮ ম্যাচে জয়হীন ছিল ক্যারিকের দল। চেলসির কাছে হেরে এই জয়হীন যাত্রার স্থায়িত্ব দাঁড়াল ৯ ম্যাচে—যা ১৯৮৮ সালের পর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দীর্ঘতম জয়হীন রেকর্ড। ক্যারিক যখন সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছিলেন, তখন ব্রেন্টফোর্ডের সাথে নটিংহ্যাম ফরেস্টের ড্রয়ের কারণে পয়েন্ট টেবিলের তলানির তিন দলের মধ্যে অবস্থান করছিল ইউনাইটেড।
স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে আসা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ভ্রমণকারী সমর্থকরা ক্লাব মালিক গ্লেজার পরিবার, স্যার জিম র্যাটক্লিফ, স্পোর্টিং ডিরেক্টর জেসন উইলকক্স এবং প্রস্তাবিত নতুন স্টেডিয়াম প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। তবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যা-ই হোক না কেন, চেলসির বিরুদ্ধে মাঠের এই বাজে হারের দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না চোট কাটিয়ে ফেরা ও চড়া বেতনের সিনিয়র ফুটবলাররা।
### ক্যারিকের ভবিষ্যৎ ও সামনের চ্যালেঞ্জ
রেলিগেশন অঞ্চলে নেমে যাওয়ার শঙ্কা ও ক্লাবের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্যারিক বলেন, "আমাদের কাজ একটাই—সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং ম্যাচ জেতা, বিষয়টা একেবারেই সহজ। অন্য কোনো কথা বলে এটি বদলানো যাবে না। আপনাকে সামনে এগোতে হবে এবং ফুটবল ম্যাচ জিততে হবে।"
পরাজয় সত্ত্বেও ক্যারিক নিশ্চিত করেছেন যে আগামী মঙ্গলবার রাতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রোমার বিরুদ্ধে ম্যাচে তিনিই ডাগআউটে থাকছেন। এরপরই আগামী উইকেন্ডে প্রিমিয়ার লিগে অ্যাস্টন ভিলার মুখোমুখি হবে ইউনাইটেড। নভেম্বরের দুই সপ্তাহের আন্তর্জাতিক বিরতির আগে এই ম্যাচগুলোই নির্ধারণ করবে ক্যারিকের ভবিষ্যৎ। বোর্ডের সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের এই স্থায়ী সংকট কাটাতে সিনিয়র খেলোয়াড়দের নিজেদের পারফরম্যান্সে দ্রুত পরিবর্তন আনা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।