ইতালীয় ক্রীড়া দৈনিক তুত্তোস্পোর্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রিমিয়ার লিগের হাইভোল্টেজ ম্যাচে অ্যানফিল্ডের দীর্ঘদিনের খরা কাটিয়ে জয় তুলে নিয়েছে আর্সেনাল। প্রতিপক্ষের মাঠে ১-০ গোলের এই অমূল্য জয়ে পূর্ণ তিন পয়েন্ট অর্জন করার পাশাপাশি লিগ টেবিলের শীর্ষস্থান এককভাবে নিজেদের দখলে নিয়েছে মিকেল আর্তেতার দল। নয় ম্যাচে গানার্সদের সংগ্রহ এখন ২৪ পয়েন্ট, যা তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার সিটির চেয়ে তিন পয়েন্ট এগিয়ে রেখেছে। গত ম্যাচে ব্রাইটনের কাছে পরাজিত হওয়া পেপ গার্দিওলার শিষ্যদের পেছনে ফেলে এই ব্যবধান বাড়াল উত্তর লন্ডনের ক্লাবটি। ঘরের মাঠে হেরে যাওয়ায় লিভারপুলের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে, পাঁচ নম্বরে থাকা রেডসদের পয়েন্ট ১৫ এবং তারা শীর্ষস্থান থেকে নয় পয়েন্ট পিছিয়ে পড়েছে।
### অ্যানফিল্ডে দীর্ঘ তেরো বছরের অভিশাপ মোচন
এই জয়টি আর্সেনালের জন্য কেবল সাধারণ তিন পয়েন্টের চেয়েও ঢের বেশি কিছু, কারণ এটি ছিল অ্যানফিল্ডের মাঠে এক দীর্ঘ ও কঠিন অধ্যায়ের সমাপ্তি। তুত্তোস্পোর্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এর আগে অ্যানফিল্ডে টানা তেরোটি প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচে জয়হীন ছিল আর্সেনাল। এই দীর্ঘ খরায় তাদের ঝুলিতে জমা হয়েছিল পাঁচটি ড্র এবং আটটি হার। এই স্টেডিয়ামে গানার্সদের সর্বশেষ জয়ের স্মৃতিটি ছিল সুদূর ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের। দীর্ঘ তেরো বছর পর অবশেষে সেই কঠিন অচলায়তন ভাঙতে সক্ষম হলেন মিকেল আর্তেতা ও তার শিষ্যরা। এই ঐতিহাসিক সাফল্য প্রিমিয়ার লিগের চলতি মৌসুমে দলটির শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে অত্যন্ত জোরালো এক বার্তা দিল।
ম্যাচের প্রথমার্ধের ষোড়শ মিনিটে নির্ধারিত হয়ে যায় এই হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের ভাগ্য। লিভারপুলের গোলরক্ষক অ্যালিসনের একটি মারাত্মক পাসিং ভুলের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগায় আর্সেনাল। ডিউক্লান রাইসের নিখুঁত অ্যাসিস্ট থেকে বল পেয়ে দারুণ ফিনিশিংয়ে লক্ষ্যভেদ করেন কাই হাভার্টস। জার্মান এই ফরোয়ার্ডের করা এই একমাত্র গোলটিই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ব্যবধান গড়ে দেয় এবং আর্সেনালের জন্য সোনালী জয় নিশ্চিত করে। পিছিয়ে পড়ার পর অবশ্য লিভারপুল ম্যাচে ফেরার চেষ্টা চালায় এবং একের পর এক আক্রমণ শানিয়ে গোলের সুযোগ তৈরি করতে থাকে। তবে সফরকারী দলের জমাট রক্ষণভাগ ভাঙতে ব্যর্থ হয় অ্যানফিল্ডের স্বাগতিকরা।
ম্যাচের প্রথমার্ধে কিংবা দ্বিতীয়ার্ধে লিভারপুলের ফরোয়ার্ডরা গোল করার একাধিক সুযোগ পেলেও ভাগ্য তাদের সহায় হয়নি। বিশেষ করে ফ্লোরিডিয়ান উইর্টজের নেওয়া একটি চমৎকার ফ্রি-কিক সরাসরি ক্রসবারে লেগে প্রতিহত হলে সমতা ফেরানোর দারুণ এক সুযোগ হাতছাড়া হয় স্বাগতিকদের। ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে অন্দোনি ইরাোলার দল সমতা সূচক গোলের জন্য সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা চালায় এবং গোলের নানা উৎস খোঁজার ব্যর্থ প্রয়াস চালায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিকেল আর্তেতার শিষ্যরা অত্যন্ত সতর্ক ও সুসংহত রক্ষণাত্মক কৌশলে লিভারপুলের আক্রমণগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে রাখতে সক্ষম হয়। ফলে নির্ধারিত সময় শেষে ১-০ গোলের অবিস্মরণীয় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্সেনাল।
এই ম্যাচের আগে উভয় দলের সাম্প্রতিক ফর্ম নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। মালের খবর-এর আর্কাইভ অনুযায়ী, রবিবারের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের আগে দুটি দলই বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিল। ব্রাইটনের বিপক্ষে দুই গোলে জয় পাওয়ার পর লিভারপুল এবং এভারটনের বিপক্ষে জয় তুলে নিয়ে আর্সেনাল এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অংশ নেয়। তবে মাঠে বল গড়ানোর পর আর্সেনাল তাদের ট্যাকটিক্যাল ডিসিপ্লিন এবং সুযোগের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। বিশেষ করে মাঝমাঠে বলের দখল রাখা এবং লিভারপুলের আক্রমণাত্মক লাইনআপকে থিতু হতে না দেওয়ার ক্ষেত্রে গানার্সদের কৌশল ছিল প্রশংসনীয়।
এই পরাজয়ের ফলে লিভারপুলের পয়েন্ট টেবিলের অবস্থান আরও পেছনের দিকে চলে গেছে। নয় ম্যাচ শেষে ১৫ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের পাঁচ নম্বরে অবস্থান করছে অ্যানফিল্ডের ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি। পয়েন্ট তালিকার শীর্ষস্থান থেকে এখন তারা নয় পয়েন্ট দূরে সরে গেছে, যা কোচ এবং দলের জন্য বেশ বড় এক উদ্বেগের বিষয়। মৌসুমের এই পর্যায়ে এসে পয়েন্ট ব্যবধান এত বেশি হয়ে যাওয়া প্রিমিয়ার লিগের মতো প্রতিযোগিতামূলক লিগে পুনরুদ্ধার করা বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে লিভারপুল ম্যানেজমেন্ট এবং খেলোয়াড়রা আগামী ম্যাচগুলোতে এই ধাক্কা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাবে বলে আশা করা যায়।
অন্যদিকে, ম্যানচেস্টার সিটির পয়েন্ট হারানোর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছে আর্সেনাল। ইতিহাদ স্টেডিয়ামের দলটির আগের দিন ব্রাইটনের কাছে পয়েন্ট হারানোর বিষয়টি আর্সেনালের সামনে সুযোগ এনে দিয়েছিল টেবিলের চূড়ায় একক আধিপত্য বিস্তারের। মিকেল আর্তেতা সেই সুযোগ দারুণভাবে লুফে নেন এবং অ্যানফিল্ডের দুর্গে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে ২৪ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের মগডালে বসেন। দুই পয়েন্টের ব্যবধান বাড়িয়ে এখন তিন পয়েন্টের লিড নেওয়া গানার্সদের মানসিকভাবে অনেকদূর এগিয়ে রাখবে।
ম্যাচের সার্বিক পরিসংখ্যান ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আর্সেনাল তাদের ডিফেন্সিভ ব্লক এবং কাউন্টার-অ্যাটাকিং ফুটবলের চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়েছে। প্রথমার্ধের শুরুর দিকে প্রতিপক্ষের রক্ষণভুলের সুযোগ নিয়ে গোল করার পর বাকি সময়টা কেবল লিভারপুলের আক্রমণ সামলানোর লড়াই ছিল। আর্তেতার দল সেই পরীক্ষায় শতভাগ সফল হয়েছে। ক্লেন শিট বজায় রেখে অ্যানফিল্ড থেকে জয় তুলে আনা যেকোনো দলের জন্যই এক প্রকার রূপকথার মতো, যা আর্সেনাল করে দেখাল।
আগামী দিনগুলোতে এই জয় আর্সেনাল শিবিরের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। প্রিমিয়ার লিগের দীর্ঘ ও কঠিন এই মৌসুমে প্রতিটি ম্যাচই একেকটি ফাইনাল, আর অ্যানফিল্ডের মতো কঠিন ভেন্যু থেকে জয় নিয়ে ফেরা মানে হলো শিরোপার দৌড়ে নিজেদের সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে প্রমাণ করা। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনেও এই ম্যাচের ফলাফল বেশ বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে দীর্ঘ তেরো বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটার কারণে।
পরিশেষে, এই ম্যাচের ফলাফল কেবল টেবিলের সমীকরণই বদলায়নি, বরং প্রিমিয়ার লিগের চলতি মৌসুমের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে এগোচ্ছে তার একটি পরিষ্কার ইঙ্গিত দিয়েছে। আর্সেনাল তাদের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে যেভাবে এগিয়ে চলেছে, তাতে করে প্রতিপক্ষ দলগুলোকে এখন নতুন করে ছক কষতে হবে। অ্যানফিল্ডের এই রোমাঞ্চকর রাত ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘকাল মনে রাখবে, আর মিকেল আর্তেতার দল এই জয়ের আনন্দ সঙ্গী করেই তাদের পরবর্তী চ্যালেঞ্জের প্রস্তুতি শুরু করবে।