দ্য গার্ডিয়ান ফুটবলের প্রতিবেদন অনুসারে, গ্রেট ম্যান থিওরি বা মহান পুরুষ তত্ত্বের সাথে যদি কোনো ফুটবল ক্লাব পুরোপুরি মিলে যায়, তবে সেটি অবশ্যই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। বিগত এক শতাব্দীতে কেবল স্যার ম্যাট বাসবি এবং স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনই এই ক্লাবটিকে সঠিক ছাঁচে গড়ে তুলতে পেরেছেন। বিশ শতকের এই দুই স্কটিশ কোচ, যারা যথাক্রমে বেলশিল এবং গোভানে মাত্র ১৫ মাইল দূরত্বের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, ওল্ড ট্রাফোর্ডের সাফল্যের চাবিকাঠি খুঁজে পেয়েছিলেন। অন্যথায়, ইউনাইটেডের ড্রেসিংরুম এবং হটসিট এক প্রকার ম্যানেজারি ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে, যেখানে মাইকেল কারিক হতে চলেছেন সর্বশেষ বলি।
বাসবি এবং ফার্গুসন ক্লাবটিকে নিজেদের চারপাশে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন যে তাদের অসাধারণ ক্যারিশমা অন্যদের বিশ্বাস করাতে বাধ্য করেছিল যে তাদের পথটিই অনুসরণযোগ্য। কিন্তু কারিক, যিনি একজন ইনসাইডার এবং ক্লাব ম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তিনিও তার ব্যর্থ পূর্বসূরিদের মতোই চরম বিচ্ছিন্নতার শিকার হচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ব্রুনো ফার্নান্দেস এবং লিসান্দ্রো মার্তিনেজের মতো তারকারা টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে কারিকের কৌশল বা দলের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যা মূলত দীর্ঘদিনের ক্লাব ঐতিহ্যকেই সামনে নিয়ে আসে। গ্ল্যামারের সাথেই ওল্ড ট্রাফোর্ডে চলে আসে ডেসডেন্স বা পতনমুখী আভিজাত্য, যে বিবর্ণ ঐতিহ্য অতীতে বহু সফল বা ব্যর্থ ম্যানেজারকে ক্লাব থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
### ঐতিহ্যগত সংকট ও অতীতের ব্যর্থতা
বাসবি এবং ফার্গুসনের সময়কাল বাদে, ইউনাইটেডের দায়িত্ব পালনকারী প্রতিটি ম্যানেজারই এই পতনমুখী জায়ান্টের মরিয়া দরূপের শিকার হয়েছেন। তাদের বিদায়ের প্রতিটি ঘটনাতেই এমন অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা গেছে যা প্রাচীন রোমের রাজনীতির কথা মনে করিয়ে দেয়। মাইকেল ক্রিক এবং ডেভিড স্মিথের ১৯৮৯ সালের বিখ্যাত বইয়ের শিরোনামের মতো, প্রিয়তোষণ, স্বজনপ্রীতি, আত্মস্বার্থ, অহংকার, আত্মতুষ্টি এবং সেন্টিমেন্টালিটি বা আবেগতাড়িত সিদ্ধান্তগুলোই ক্লাবের কোনো না কোনো লিজেন্ডকে শেষ পর্যন্ত প্রতারিত করেছে। সেই দুই কিংবদন্তি ম্যানেজারের দীর্ঘ ছায়া ও প্রভাবের সাথে বেঁচে থাকাটাই ইউনাইটেডের ম্যানেজারদের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে উইলফ ম্যাকগিনেসকে যখন বরখাস্ত করা হয়, তখন ব্রায়ান কিড তার সতীর্থদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন যে তারা তাকে ডুবিয়ে দিয়েছে। অথচ এই বরখাস্তের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল খোদ ম্যাট বাসবির নিজের। এরপর ফ্রাঙ্ক ও'ফ্যারেলকেও বিদায় নিতে হয়েছিল যখন ক্রিস্টাল প্যালেসের কাছে দল ৫-০ গোলে হেরেছিল। টমি ডকের্টির আমলেও একই রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ দেখা যায়, যিনি ফিজিওথেরাপিস্টের স্ত্রীর সাথে সম্পর্কে জড়ানোর পর ক্লাবের সেক্রেটারি লেস অলিভের মাধ্যমে চাকরি হারানোর খবর পান। ডেভ সেক্সটন ১৯৮১ সালে তার শেষ সাতটি ম্যাচ জেতার পরও বরখাস্ত হয়েছিলেন। রন অ্যাটকিনসন ১৯৮৬ সালের নভেম্বর মাসে তার বরখাস্তের মুহূর্তটিকে অফিসে পার্টিতে পরিণত করেছিলেন, আর তার রেখে যাওয়া হ্যাংওভারই ফার্গুসনের প্রথম দিনটিকে স্বাগত জানিয়েছিল।
### ফার্গুসনের দীর্ঘ ছায়া এবং বর্তমান বাস্তবতা
ফার্গুসনের উত্তরসূরিদের সবসময়ই তার অব্যাহত উপস্থিতির সাথে লড়াই করতে হয়েছে, যেখানে ক্যামেরার লেন্স এবং সমর্থকরা গ্যালারিতে বারবার সেই পরিচিত মুখটিকে খুঁজে ফেরে। ২০০৫ সালে ম্যালকম গ্লেজারের টেকওভার বা ক্লাব অধিগ্রহণে ফার্গুসনের পৃষ্ঠপোষকতা এক দ্ব্যর্থক উত্তরাধিকার হিসেবে রয়ে গেছে, যা তার পরবর্তী ম্যানেজারদের টেনে ধরেছে। ফার্গুসন সাধারণত নিজের মতো থাকেন এবং ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি ক্লাব অ্যাম্বাসেডর হিসেবে মোটা অংকের বার্ষিক সম্মানী পেতেন, যা ২০২৪ সালে স্যার জিম র্যাটক্লিফ বাতিল করেন। ২০২১ সালে ওলে গানার সোলশায়ের যখন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে বেঞ্চে বসিয়েছিলেন, তখন মিক্সড মার্শাল আর্টস ফাইটার খাবিব নুরমাগোমেডভের সাথে আলাপে ফার্গুসন মন্তব্য করেছিলেন যে সেরা খেলোয়াড়দের দিয়েই সবসময় শুরু করা উচিত, যা পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
রোনালদোর সেই বিপর্যয়কর ওল্ড ট্রাফোর্ড প্রত্যাবর্তনেও ফার্গুসনের ব্যাক-চ্যানেল প্রভাব স্পষ্ট ছিল, যা ঠিক বাসবি এবং জর্জ বেস্টের সম্পর্কের কথাই মনে করিয়ে দেয়। গত শুক্রবারের প্রেস কনফারেন্সে মাইকেল কারিক নিজেও তার সাবেক বসের সাথে কথোপকথনের কথা উল্লেখ করেছেন। বোর্নমাউথ ম্যাচের আগে ব্রুনো ফার্নান্দেসকে স্কোয়াড বা একাদশ থেকে বাদ দেওয়া এবং তাকে ক্লাব ট্র্যাকস্যুট পরে বেঞ্চে বসিয়ে রাখাটা ছিল নিখাদ ফার্গুসিয়ান রাজনীতিরই প্রতিফলন। তবে ফার্গুসনের কোনো ফেসসিমাইল বা অবিকল অনুকরণ করার চেষ্টা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।
### বর্তমান ফর্ম ও মাঠের বাইরের বিশৃঙ্খলা
মাঠের বর্তমান ফর্মের দিকে তাকালে দেখা যায়, গত ২৫ অক্টোবর ২০২৪-এর আগের রিপোর্ট অনুযায়ী বোর্নমাউথের কাছে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ৩-০ গোলের লজ্জাজনক হারের পর মাইকেল কারিকের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। স্কাই স্পোর্টসের তথ্য অনুযায়ী, সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এটি ছিল তাদের টানা অষ্টম ম্যাচ জয়হীন থাকার রেকর্ড। রায়ান এবং ইভানিলসনের গোলে পাওয়া এই হারের ফলে রেড ডেভলপর্সরা রেলিগেশন জোনের একেবারে কাছাকাছি ১৬তম অবস্থানে নেমে গেছে। এই চরম দুর্দশার মধ্য দিয়ে ওল্ড ট্রাফোর্ডের অরাজকতা এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা আবারও প্রমাণ করে যে গ্লেজার পরিবার কিংবা ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ইনসিয়োস গ্রুপের র্যাটক্লিফ যতই করপোরেট ও পেশাদার করার চেষ্টা করুন না কেন, ক্লাবের অন্তর্নিহিত আস্ফালন বারবার যৌক্তিকতাকে ছাড়িয়ে যায়।
মোরিনো বা লুই ফন হালের আমল নিয়ে পরে ইতিবাচক আলোচনা হলেও, তারাও দলের আক্রমণাত্মক ফুটবলের প্রত্যাশা মেটাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। মোরিনো তার বরখাস্তের পর ফুটবল হেরিটেজ জাতীয় নানা বিস্ফোরক মন্তব্য করে ক্লাব ইতিহাসকে ম্লান করার চেষ্টা করেছিলেন। রুবেন আমোরিমও ঠিক একই ধরনের ধ্বংসাত্মক নীতি অনুসরণ করেছিলেন, অন্যদিকে এরিক টেন হাগের ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ক্লাবে টিকে থাকাটা সবার কাছেই বিভ্রান্তিকর ঠেকেছিল। বাসবি এবং ফার্গুসন দেখিয়েছিলেন যে এই ক্লাব পরিচালনা করা সম্ভব, তবে ক্লাবটির ভেতরের আত্মপ্রীতি, ষড়যন্ত্র এবং ব্যক্তিস্বার্থ যতদিন এভাবে চলতে থাকবে, ততদিন নতুন কোনো সাম্রাজ্য গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কেবল ক্ষয়ই হতে থাকবে।