### রোমাঞ্চকর রানতাড়া ও লাহোরে ট্রাই-সিরিজের ট্রফি
লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে এক নাটকীয় ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে ৩ উইকেটে হারিয়ে ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজের ট্রফি জিতে নিয়েছে পাকিস্তান। ৩২৬ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৯ বল বাকি থাকতেই জয় সুনিশ্চিত করে স্বাগতিকরা, যা ওয়ানডে ফাইনালের ইতিহাসে যৌথভাবে সর্বোচ্চ রানতাড়ার রেকর্ড। অধিনায়ক শাহীন আফ্রিদি মিডউইকেটের উপর দিয়ে দর্শনীয় ছক্কা মেরে দলের জয় নিশ্চিত করেন। তবে ঐতিহাসিক ট্রফি জয়ের উল্লাসের আবহেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) মন্থর ওভার রেটের কারণে পাকিস্তান দলকে ম্যাচ ফি-র ৫ শতাংশ জরিমানা করেছে।
পাকিস্তানের এই রূপকথার রানতাড়ার প্রধান কারিগর ছিলেন ওপেনার ফখর জামান। তিনি ৯৯ বলে ১২৭ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস উপহার দেন, যেখানে ছিল ১১টি চার ও ৬টি ছক্কার মার। ফখর মাত্র ৮৩ বলে তার ক্যারিয়ারের ১২তম ওয়ানডে শতক পূরণ করেন। শ্রীলঙ্কার অফস্পিনার মহেশ থিকশানা ব্যক্তিগত ৬৯ ও ১০৬ রানের মাথায় ফখরের ক্যাচ মিস না করলে ম্যাচের দৃশ্যপট অন্যরকমও হতে পারত। শেষ পর্যন্ত দিলশান মাদুশঙ্কার বলে বোল্ড হয়ে মাঠ ছাড়েন এই বাঁহাতি ওপেনার।
বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছিল পাকিস্তান। দলীয় ৮ রানে ওপেনার মাজ সাদাকাত ৫ রান করে মাদুশঙ্কার শিকার হন। এরপর নিজের ঘরের মাঠে কোনো রান না করেই সাজঘরে ফেরেন বাবর আজম। মাদুশঙ্কার বলে ওয়াইড স্লিপে পবন রথনায়েকে বাবর আজমের সহজ ক্যাচ লুফে নেন। এটি ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাবরের টানা নবম ইনিংস, যেখানে তিনি কোনো ফিফটি স্পর্শ করতে ব্যর্থ হলেন।
১৪ রানে ২ উইকেট হারানোর পর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তরুণ উইকেটরক্ষক-ব্যাটার সাদ বেগ। নিজের ২০তম জন্মদিনের ঠিক আগের রাতে মাঠে নামা এই বাঁহাতি তরুণ ৫২ বলে ৭৪ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন। ফখর জামানের সঙ্গে তার দায়িত্বশীল জুটি পাকিস্তানকে খেলায় ফিরিয়ে আনে। প্রথম আন্তর্জাতিক ফিফটি হাঁকানো সাদ বেগ শেষ পর্যন্ত থিকশানার ফিরতি ক্যাচে পরিণত হন।
এরপর সালমান আগা দুনিত ওয়েলালাগের বলে ১৭ রানে বোল্ড হলে কিছুটা চাপে পড়ে পাকিস্তান। কিন্তু সেখান থেকে দলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন দুই তরুণ ব্যাটার—২১ বছর বয়সী আরাফাত মিনহাস ও ২৪ বছর বয়সী হাসান নওয়াজ। এই দুজন ষষ্ঠ উইকেটে ৯৪ রানের অসাধারণ জুটি গড়েন। এর আগে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৬ উইকেট নেওয়া মিনহাস ব্যাট হাতে ৩১ বলে ৬১ রানের ধ্বংসাত্মক ইনিংস খেলেন, যার মধ্যে ছিল ৪টি দৃষ্টিনন্দন ছক্কা। বিশেষ করে দাসুন শানাকার ৪৬তম ওভারে ১৫ রান তুলে নিয়ে ম্যাচের পাল্লা পাকিস্তানের দিকে ভারী করেন মিনহাস।
জয়ের জন্য যখন মাত্র ২ রান প্রয়োজন, তখন অসিত ফার্নান্দোর ওভারে টানা দুই বলে আউট হন মিনহাস ও ফাহিম আশরাফ (০)। এতে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হলেও অধিনায়ক শাহীন আফ্রিদি মাঠে নেমে প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকিয়ে ৯ বল হাতে রেখে জয় নিশ্চিত করেন।
### শ্রীলঙ্কার প্রতিরোধ ও আইসিসির ওভার রেটের শাস্তি
এর আগে টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে নির্ধারিত ওভারে শক্ত পুঁজি গড়ে তোলে শ্রীলঙ্কা। লঙ্কানদের হয়ে বাঁহাতি ব্যাটার কামিন্দু মেন্ডিস নিজের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম শতক হাঁকান। অভিষেক হওয়ার সাত বছর পর ১৩১ রানের দারুণ ইনিংস খেলেন তিনি। উদ্বোধনী জুটিতে অভিষ্কা ফার্নান্দো ৩৮ রান যোগ করার পর, কামিন্দু তৃতীয় উইকেটে পবন রথনায়েকের সঙ্গে ১৪৬ রানের বিশাল জুটি গড়েন।
ট্রাই-সিরিজ জুড়েই অসাধারণ ফরমে থাকা পবন রথনায়েকে এই ম্যাচেও ৭৭ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টানা দুই শতকসহ পুরো সিরিজে ১০৬.৭৫ গড়ে মোট ৪২৭ রান সংগ্রহ করেন এই ব্যাটার। কামিন্দু ও রথনায়েকের ব্যাটিংয়ে শ্রীলঙ্কা ৪১ ওভার শেষে ২৫৫ রানে পৌঁছে যায় এবং বড় সংগ্রহের ভিত তৈরি করে।
তবে শেষ ৯ ওভারে শাহীন আফ্রিদি ও হারিস রউফের দারুণ বোলিংয়ে শ্রীলঙ্কাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে পাকিস্তান। শাহীন ফুল-লেংথ বলে কামিন্দু ও শানাকাকে (১৭) আউট করেন। অন্যদিকে রউফ শর্ট বলে রথনায়েকে ও ওয়েলালাগেকে (৩) ফিরিয়ে দেন। শেষ ৯ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে শ্রীলঙ্কার রানের গতি থমকে যায়। এর আগে পাকিস্তানের পার্ট-টাইম অফস্পিনার সালমান আগা লঙ্কানদের প্রথম দুটি উইকেট তুলে নিয়েছিলেন।
ম্যাচ শেষে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক কুশল মেন্ডিস আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের আরও ৩০ রান করা দরকার ছিল।"
ম্যাচ জয়ের আনন্দের মাঝেই ওভার রেটের শাস্তির মুখে পড়তে হয় স্বাগতিকদের। আইসিসির ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১ ওভার কম বল করার কারণে পাকিস্তানকে দোষী সাব্যস্ত করেন। অন-ফিল্ড আম্পায়ার আহসান রাজা ও ওয়েন নাইটস এবং থার্ড আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ ও ফোর্থ আম্পায়ার রশিদ রিয়াজ অভিযোগটি গঠন করেন। আইসিসি আচরণবিধির ধারা ২.২২ অনুযায়ী অধিনায়ক শাহীন আফ্রিদি শাস্তি মেনে নেওয়ায় কোনো আনুষ্ঠানিক শুনানির প্রয়োজন হয়নি।
উল্লেখ্য, এই ট্রাই-সিরিজে পাকিস্তান একমাত্র ম্যাচে হেরেছিল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় সাক্ষাতে, যেখানে ১১০ রানে অলআউট হওয়ার পর শ্রীলঙ্কা ১৮.১ ওভারে ৮ উইকেটে জয় পেয়েছিল। তবে ফাইনালে রোমাঞ্চকর জয় দিয়ে সেই হারের প্রতিশোধ নেওয়ার পাশাপাশি গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের পূর্ণ গ্যালারির সামনে ট্রফি উঁচিয়ে ধরল শাহীন আফ্রিদির দল।
### সূত্র
এই প্রতিবেদনের সব তথ্য নেওয়া হয়েছে: The Guardian Cricket, Hindustan Times Cricket। এআই-সহায়তায় লেখা ও সম্পাদিত।