মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর শেষ হওয়া প্রথম টেস্টে বাংলাদেশকে ৮ উইকেটে পরাজিত করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এই জয়ের ফলে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল সফরকারীরা। চতুর্থ দিনে জয়ের জন্য ১৭০ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে লাঞ্চ বিরতির আগেই ৩৫.১ ওভারে ২ উইকেটে ১৭০ রান তুলে ফেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। উদ্বোধনী জুটিতে জন ক্যাম্পবেল ও ব্র্যান্ডন কিং ২০.৫ ওভারে ১১২ রান যোগ করে জয়ের মূল ভিত্তি গড়ে দেন।
২৮ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই ম্যাচটি বিভিন্ন সময়ে আলো স্বল্পতা, বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে একাধিকবার বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। টস জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া বাংলাদেশ তাদের প্রথম ইনিংসে ২৭২ রান সংগ্রহ করে। জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের প্রথম ইনিংসে তোলে ২৪৫ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ ১৪২ রানে অলআউট হয়ে যায়। এই জয়ের পর ২০২৫-২৭ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ (ডব্লিউটিসি) পয়েন্ট তালিকায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ অষ্টম স্থানে বহাল থাকলেও তাদের জয়ের শতকরা হার বেড়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এক ধাপ নিচে নেমে গেছে এবং ভারত চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে।
### ঢাকা টেস্টে শীর্ষ ৫টি ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স
১. জোমেল ওয়ারিকান (৯ উইকেট, প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ): বাহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিকান চার দিন জুড়ে বল হাতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ৫৩ রানে ৫ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের মিডল অর্ডারে ধস নামান, যার ফলে ২২২/৩ থেকে ২৭২ রানে গুটিয়ে যায় আয়োজকরা। দ্বিতীয় ইনিংসে ৬৩ রানে ৪ উইকেট নিয়ে অধিনায়ককে চমৎকার সঙ্গ দেন ওয়ারিকান, যা তাকে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার এনে দেয়।
২. রোস্টন চেজ (৫/৩৬ ও অপরাজিত ৪৩ রান): ২০২৫ সালের মে মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়া রোস্টন চেজ ব্যাট ও বল হাতে এক দারুণ অলরাউন্ড পারফরম্যান্স উপহার দেন। প্রথম ইনিংসে অপরাজিত ৪৩ রান করে দলের রান ২৪৫-এ নিয়ে যান এবং বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের লিড ২৭ রানে সীমিত রাখেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬ রানে ৫ উইকেট তুলে নিয়ে তিনি বাংলাদেশের ইনিংস ১৪২ রানে গুটিয়ে দেন এবং ক্যারিয়ারের ১০০তম টেস্ট উইকেটের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করেন।
৩. নাঈম হাসান (৪/৩৩ ও ৫২ রান): অফস্পিনার নাঈম হাসান উভয় বিভাগেই বাংলাদেশের সেরা পারফর্মার ছিলেন। সফরকারীদের প্রথম ইনিংসে ৩৩ রানে ৪ উইকেট শিকার করে প্রতিপক্ষকে ২৪৫ রানে আটকে রাখতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ের মাঝে লড়াই চালিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট ফিফটি (৫২ রান) অর্জন করেন এবং অলআউট হওয়ার আগে দলকে ১৪২ রান পর্যন্ত নিয়ে যান।
৪. ব্র্যান্ডন কিং (অপরাজিত ৮১ রান): চতুর্থ দিনে ১৭০ রানের টার্গেট তাড়া করতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে জয়ের বন্দরে পৌঁছান ব্র্যান্ডন কিং। দ্বিতীয় স্লিপে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে ক্যাচ দিয়েও জীবন পান তিনি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অপরাজিত ৮১ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস খেলেন কিং। জন ক্যাম্পবেলের (৪৯ রান) সাথে ১১২ রানের উদ্বোধনী জুটির পর কাভেম হজকে (অপরাজিত ৩১) সঙ্গে নিয়ে জয় নিশ্চিত করেন তিনি।
৫. শাদমান ইসলাম (১০০ রান): টেস্টের শুরুর দিকে প্রথম ইনিংসে একটি দুর্দান্ত শতক হাঁকিয়ে দলকে মজবুত ভিত এনে দিয়েছিলেন ওপেনার শাদমান ইসলাম। তার সেঞ্চুরির উপর ভর করে এক পর্যায়ে ৩ উইকেটে ২২২ রান তুলেছিল বাংলাদেশ। যদিও পরবর্তী ব্যাটাররা ব্যর্থ হওয়ায় ২৭২ রানে থামে আয়োজকদের প্রথম ইনিংস।
### আর্থিক চ্যালেঞ্জ, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সিলেট টেস্ট
ম্যাচ শেষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্যারিবীয় দলের খেলোয়াড়দের পেশাদারিত্ব ও প্রতিশ্রুতির ভূয়সী প্রশংসা করেন সাবেক ক্যারিবিয়ান ফাস্ট বোলার ইয়ান বিশপ। তিনি মন্তব্য করেন, এটি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের জন্য একটি বড় জয়। ওই অঞ্চলের ক্রিকেটের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে খেলোয়াড়দের নিষ্ঠার প্রশংসা করার পাশাপাশি তিনি বলেন, ঘরের মাঠে বাংলাদেশ এখন আর সহজ কোনো প্রতিপক্ষ নয়।
রোস্টন চেজের নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাম্প্রতিক ফর্ম বেশ ইতিবাচক। ২০২৬ সালের জুন-জুলাইয়ে ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ২৩ বছর পর প্রথম টেস্ট সিরিজ জিতেছিল তারা। অন্যদিকে বাংলাদেশ ২০২৪ সালে এক পঞ্জিকাবর্ষে দেশের বাইরে তিনটি টেস্ট জয়ের রেকর্ড গড়েছিল, যার মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে জয়ও ছিল। তবে এই ম্যাচে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং ধসের কারণেই শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে পড়ে আয়োজকরা। শেষ ইনিংসে বাংলাদেশের পক্ষে হাসান মাহমুদ ১৪ রানে ১টি এবং শরিফুল ইসলাম ২০ রানে ১টি উইকেট নেন, তবে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ কোনো সাফল্য পাননি।
সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট ম্যাচটি শুরু হবে আগামী ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে সিলেটে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সেখানে সিরিজ জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামবে, আর স্বাগতিক বাংলাদেশ চাইবে সিরিজ সমতায় শেষ করতে।
### সূত্র
এই প্রতিবেদনের সব তথ্য নেওয়া হয়েছে: CricTracker, Wisden, Sportstar (The Hindu) Cricket। এআই-সহায়তায় লেখা ও সম্পাদিত।