### শেষ উইকেটের অলৌকিক প্রতিরোধ ও পাকিস্তানের জয়
একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সেরা রোমাঞ্চকর প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে ইংল্যান্ডকে ১ উইকেটে হারিয়ে ট্রাই-সিরিজের ফাইনালে প্রবেশ করেছে স্বাগতিক পাকিস্তান। লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ২৪২ রানের জয়ের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ১৫৪ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে পড়েছিল পাকিস্তান। জয়ের জন্য শেষ উইকেটে প্রয়োজন ছিল আরও ৮৮ রান। তবে আট নম্বরে নামা শাদাব খানের অনবদ্য অপরাজিত ১১৩ রান এবং ১১ নম্বর ব্যাটার হ্যারিস রউফের দৃঢ় মনোবলের ওপর ভর করে অসম্ভবকে সম্ভব করে পাকিস্তান।
সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে একাদশের বাইরে থাকা শাদাব খান এই ম্যাচে সুযোগ পেয়েই দলের জয়ের নায়ক বনে যান। ১০৩ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর ক্রিজে আসা শাদাব ৯৬ বলে ১৩টি চার ও ৫টি ছক্কায় ১১৩ রানের ঝোড়ো অথচ নিয়ন্ত্রিত ইনিংস খেলেন। অন্যদিকে হ্যারিস রউফ ৭০ মিনিট ক্রিজে টিকে থেকে ১৯ বলে মাত্র ৭ রান করলেও শাদাবকে যোগ্য সঙ্গ দেন। ৪৮তম ওভারে অভিষেকি পেসার হেনরি ক্রোকোম্বকে সোজা বাউন্ডারি মেরে জয় নিশ্চিত করেন রউফ, যার পর উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম।
ম্যাচের ৪৫তম ওভারে চরম নাটకీయতার সৃষ্টি হয়। ব্যক্তিগত ৯৭ রানে থাকা অবস্থায় গাস অ্যাটকিনসনের বলে এলবিডব্লিউ আউট হন শাদাব। পাকিস্তান তখন জয়ের থেকে ২১ রান দূরে। আম্পায়ার আউট দেওয়ার পর হতাশ শাদাব ব্যাটে আঘাত করে মাঠ ছাড়তে শুরু করেন এবং দুই দলের খেলোয়াড়রা হাত মেলানো শুরু করেন। তবে মাঠ ছাড়ার মুহূর্তে শেষ সুযোগ হিসেবে রিভিউ নেন শাদাব। ডিআরএসে দেখা যায় বল ব্যাটের ভেতরের কানা ছুঁয়ে প্যাডে লেগেছিল। সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হলে খেলায় ফিরে আসেন তিনি। পরবর্তীতে ৪৭তম ওভারে অ্যাটকিনসনের ইয়র্কার থেকে চার মেরে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম শতক পূরণ করেন শাদাব এবং এরপর একই ওভারে আরও একটি চার ও ছক্কা হাঁকান।
ম্যাচের শেষ দিকে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। স্যাম কারানের একটি বাউন্সার আম্পায়ার ওয়াইড না দেওয়ায় ফিল্ডার উইল জ্যাকস ও আম্পায়ারের সঙ্গে তর্কে জড়ান রউফ। পরবর্তীতে জো রুট এগিয়ে এসে পরিস্থিতি সামাল দেন। এছাড়া ১৮ রান দূরে থাকতে টম ব্যান্টনের ফিল্ডিংয়ের পর রান আউটের হাত থেকেও বেঁচে যান রউফ। জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বাকি রান তুলে নেন শাদাব ও রউফ জুটি, যেখানে শেষ ৮৯ রানের জুটিতে ৮০ বলের মধ্যে ৬১ বলই খেলেন শাদাব।
### ম্যাচের বিশ্লেষণ, পরিসংখ্যান ও টুর্নামেন্টের সমীকরণ
এর আগে টসে জিতে পাকিস্তান প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। স্তন ক্যান্সার সচেতনতা সমর্থনের অংশ হিসেবে স্বাগতিক ক্রিকেটাররা বিশেষ গোলাপী জার্সি পরে মাঠে নামেন। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই চাপে পড়ে ইংল্যান্ড। শাহীন শাহ আফ্রিদি নিজের ১৫০তম ওয়ানডে উইকেট হিসেবে টম ব্যান্টন (৪) এবং পরে জো রুটকে (৫) আউট করেন। এরপর ওয়ানডে অভিষেক হওয়া রেজাউল্লাহর চমৎকার থ্রোতে হ্যারি ব্রুক (১) রান আউট হন এবং জর্ডান কক্স (৬) রউফের শিকার হলে ৫২ রানে ৪ উইকেট হারায় ইংল্যান্ড।
ইংল্যান্ডের হয়ে একপ্রান্ত আগলে রাখেন ওপেনার বেন ডাকেট। ১১১ বলে ১০৫ রানের দুর্দান্ত শতক হাঁকান তিনি, যা তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের পঞ্চম এবং লাহোরের মাটিতে দ্বিতীয় শতক। স্যাম কারানের (৪২) সঙ্গে পঞ্চম উইকেটে ৯৩ রান যোগ করেন তিনি। তবে শাহীন আফ্রিদি পুনরায় বোলিংয়ে এসে এই জুটি ভাঙলে ইংল্যান্ডের শেষ ৫ উইকেট পড়ে মাত্র ৯৬ রানে। ৪৬.৪ ওভারে ২৪১ রানে অলআউট হয় তারা। পাকিস্তানের পক্ষে শাহীন আফ্রিদি ৪৬ রানে ৪টি এবং অভিষিক্ত রেজাউল্লাহ ও আরাফাত মিনহাস ২টি করে উইকেট নেন।
২৪২ রানের জবাবে পাকিস্তানের শুরুটাও ভালো হয়নি। গাস অ্যাটকিনসনের বলে ফখর জামান (১০) এবং ঘরের মাঠের প্রিয় তারকা বাবর আজম (১০) আউট হন। অভিষিক্ত ক্রোকোম্ব পান সাইম আইয়ুবের (৬) উইকেট। অন্যদিকে জেমি ওভারটন একটানা ১০ ওভারের স্পেলে ৪৩ রানে ৩ উইকেট নিয়ে সাদ বেগসহ (৩২) পাকিস্তানের মিডল অর্ডারে আঘাত হানেন। এরপর হাসান নওয়াজ (১৫) ও সালমান আলী আগা (২৬) লিয়াম ডসনের শিকার হন এবং উইল জ্যাকসের বলে রেজাউল্লাহ বোল্ড হলে ১৫৪ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে বসে পাকিস্তান।
এই পরাজয়টি ইংল্যান্ডের জন্য চার দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় বড় ধাক্কা। গত বৃহস্পতিবার শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ৪৩০ রান তুললেও তা রক্ষা করতে পারেনি ইংল্যান্ড, যা ওয়ানডে ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ড ছিল। পরপর দুই ম্যাচে জয়ের সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করল তারা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওয়ানডে ইতিহাসে আট নম্বরে ব্যাট করতে নেমে শাদাব খানের অপরাজিত ১১৩ রানটি সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড এবং আট বা তার নিচে নেমে শতক হাঁকানো মাত্র তৃতীয় ব্যাটার তিনি। পাশাপাশি শাদাব ও রউফের ৮৯ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিটি সফল ওয়ানডে রান তাড়ায় দশম উইকেটের সর্বোচ্চ রানের নতুন রেকর্ড গড়েছে। তারা ভেঙে দিয়েছেন ১৯৭৫ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ডেরিক মারে ও অ্যান্ডি রবার্টসের গড়া ৬৪ রানের রেকর্ড।
এই জয়ের ফলে ট্রাই-সিরিজের ফাইনালে স্থান নিশ্চিত করেছে পাকিস্তান। অন্যদিকে টানা তিন ম্যাচে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার মুখে ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডের ফাইনালে ওঠার গাণিতিক আশা টিকে রয়েছে মঙ্গলবার শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের জয়ের ওপর। এরপর বৃহস্পতিবার নিজেদের শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে বিশাল ব্যবধানে হারাতে পারলে তবেই ফাইনালের সমীকরণ মিলতে পারে ইংল্যান্ডের।
### সূত্র
এই প্রতিবেদনের সব তথ্য নেওয়া হয়েছে: The Guardian Cricket, BBC Sport Cricket। এআই-সহায়তায় লেখা ও সম্পাদিত।