দ্য গার্ডিয়ান ক্রিকেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস এবং ৩১ রানের ব্যবধানে অস্ট্রেলিয়ার পরাজয় দলটির ব্যাটিং লাইনআপের পুরনো ফাটলগুলোকে আবারও উন্মোচন করেছে। সেন্ট জর্জেস পার্কের এই হারের পর কেপ টাউনে সিরিজের সিদ্ধান্তসূচক ম্যাচের আগে হাতে রয়েছে মাত্র এক সপ্তাহ। এই অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাটিং ত্রুটিগুলো দূর করার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে সফরকারী দল। অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচকরা বল হাতে বিজয়ী কম্বিনেশন পরিবর্তন করতে প্রস্তুত থাকলেও, দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাটিংয়ে পরীক্ষিত পারফর্মরদের বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় ভুগেছেন। তবে গেকেবেরহায় প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার মাত্র ৯৯ রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার ঘটনা নির্বাচকদের বাধ্য করতে পারে কেপ টাউনের ম্যাচের আগে এক বা একাধিক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে।
### ব্যাটিং সংকট এবং মারনাস লাবুশেনের ফর্ম
মারনাস লাবুশেনের বর্তমান ফর্ম অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও এটি হয়তো দলটির সবচেয়ে তাৎক্ষণিক নির্বাচন সংকট নাও হতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে চলতি সিরিজে চার ইনিংসে তিনটি ৩০-এর ঘরে ইনিংস খেলা সত্ত্বেও লাবুশেনের সামগ্রিক পরিসংখ্যান বেশ হতাশাজনক। সেন্ট জর্জেস পার্কের উইকেটে যখন ক্রিজে টিকে থাকাটাই অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র ভরসা ছিল, তখন অফ স্পিনার সাইমন হারমারের বলে লং অনের দিকে শট খেলে উইকেট বিলিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটিও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ৩২ বছর বয়সী এই ব্যাটারের টেস্ট সেঞ্চুরি না পাওয়ার খরা এখন তিন বছর ছাড়িয়ে গেছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওল্ড ট্রাফোর্ডে শেষবার ব্যাট তোলার পর থেকে খেলা ৪৭ ইনিংসে তার গড় মাত্র ২২.০৯। ২০২৩-২৪ মৌসুমে পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে তিন হাফ সেঞ্চুরিসহ ২০৭ রান করার পর থেকে কোনো টেস্ট সিরিজে তার গড় ৪০-এর বেশি ছিল না। ২০২২ সালের শেষের দিকে যে টেস্ট গড় ৬১-এর উপরে ছিল, তা এখন নেমে এসেছে ৪৩.৩৬-এ।
২০২৫ সালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন টেস্টের স্কোয়াড থেকে বাদ পড়ার অনেক আগে থেকেই লাবুশেন তার জায়গা ধরে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পরিসংখ্যান প্রতিকূলে থাকা সত্ত্বেও, ওপেনিং পজিশনে ট্রাভিস হেডের সঙ্গী খোঁজার প্রক্রিয়ায় লাবুশেনকে আরও একটি শেষ সুযোগ দেওয়া হতে পারে। গত বছর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে হারের মতো কেপ টাউনেও তাকে ইনিংসের শুরুতে ওপেন করার দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
### ইনজুরি থেকে ফেরা এবং স্কোয়াডের অন্যান্য বিকল্প
দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ওয়ানডে সিরিজে ইনজুরিতে পড়া ক্যামেরন গ্রিন এবং জশ ইংলিশ তৃতীয় টেস্টের আগে ফিট হয়ে উঠবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তৃতীয় ওয়ানডেতে পেটের পেশিতে টান লাগার পর গ্রিনের ফেরার প্রক্রিয়া প্রায় শেষের পথে এবং দ্বিতীয় টেস্ট চলাকালীন তিনি নেটে ব্যাটিং অনুশীলন করেছেন। একসময় লাবুশেনের মতোই চাপের মুখে থাকা ২৭ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডার বাংলাদেশের বিপক্ষে ড্র হওয়া সিরিজে পাঁচ নম্বর পজিশনে একটি লড়াকু সেঞ্চুরি ও হাফ সেঞ্চুরি করে নিজের অবস্থান কিছুটা শক্ত করেছিলেন। প্রধান কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড জানিয়েছেন যে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে গ্রিনের বোলিং করার সম্ভাবনা কম, তবে শুধু ব্যাটার হিসেবেই তিনি দলে জায়গা পাওয়ার যোগ্য, বিশেষ করে যখন অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ছয় ব্যাটারের দলে শক্তি বাড়ানো প্রয়োজন।
অন্যদিকে, জশ ইংলিশের একাদশে সরাসরি জায়গা পাওয়া নিশ্চিত নয়। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অভিষেকে সেঞ্চুরি পাওয়ার পর থেকে দীর্ঘ ফরম্যাটে নিজের সুযোগগুলোকে খুব একটা কাজে লাগাতে পারেননি এই কিপার-ব্যাটার। স্কোয়াডে ফিরেছেন কুপার কনোলিও। তবে স্পিন-অ্যালরাউন্ডার কনোলির দ্বিতীয় টেস্ট খেলার সম্ভাবনা নির্ভর করছে টিম ম্যানেজমেন্ট বহুমুখী কিন্তু ছন্দে না থাকা বিউ ওয়েবস্টারকে এবং নিউল্যান্ডসের পিচের অবস্থাকে কীভাবে মূল্যায়ন করে তার ওপর।
### ওপেনিংয়ে পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও ঐতিহ্যগত ধারাবাহিকতা
অস্ট্রেলিয়া যখন তাদের বিকল্পগুলো বিবেচনা করছে, তখন দলের লাইনআপে তিন ব্যাটার মিডল অর্ডারের জন্যই বেশি উপযুক্ত অথচ ফাঁক তৈরি হচ্ছে মূলত ইনিংসের শুরুতে। প্রায় এক দশক টেস্ট দলের বাইরে থাকা এবং দেড় বছরেরও বেশি সময় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট না খেলা নিক ম্যাডিসনকে দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে ফিরিয়ে আনার জুয়া খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। টেস্টে বর্ণিল ক্যারিয়ার না থাকলেও বাঁহাতি এই ব্যাটারকে নামানোর পর প্রথম ইনিংসে ৩৩ বল খেলে শূন্য রানে আউট হন। ডারবানে দ্বিতীয় ইনিংসে দ্রুতগতির ৪৮ রানের ইনিংস খেললেও কাগসো রাবাদার বিপক্ষে যেভাবে তিনি আউট হয়েছেন, তাতে এই আকস্মিক নির্বাচনের ইতি ঘটতে পারে কেপ টাউনে।
ম্যাট রেনশকে পুনরায় টপ অর্ডারে ফিরিয়ে আনা এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে যেখানে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন সেখানে তাকে থিতু হতে দেওয়া দলের সবচেয়ে স্পষ্ট সমস্যার সমাধান করতে পারে। এতে মিডল অর্ডারে ক্যামেরন গ্রিনের ফেরার পথ যেমন সুগম হবে, তেমনি তৃতীয় টেস্টের জন্য ইংলিশ বা কনোলিকে ডাকার সুযোগও উন্মুক্ত থাকবে।
অস্ট্রেলিয়া ২০২৩ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দ্বিপাক্ষিক টেস্ট সিরিজ হারে নি। ২০১৮ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে সিরিজ হারের পর ভারত ছাড়া অন্য কোনো দলের কাছে তারা সিরিজ হারে নি। অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের অধীনে দলটির স্বাভাবিক ধারা ছিল উত্থান-পতনকে সঙ্গী করে পথ চলা। তবে অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় সফর, দক্ষিণ আফ্রিকা সফর, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হোম সিরিজ এবং পরবর্তীতে ভারত ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিরিজগুলোর দীর্ঘ পথচলা এখন লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অস্ট্রেলীয় টেস্ট দলের জন্য পরিবর্তনের সেই বাতাস অবশেষে বইতে শুরু করেছে। আর এবার হয়তো কামিন্সের অটল শান্তভাবও এই ঝাপটা সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।