/
হোম › ক্রীড়া সংবাদ › প্রতিবেদন
ভাষা / Language:

কেপটাউনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসে ক্ষুব্ধ ওয়ার্নার: লড়াইহীন আত্মসমর্পণকে বললেন 'আন-অস্ট্রেলিয়ান'

সূত্র: বিবিসি স্পোর্টস (মূল প্রতিবেদন →) • এআই-সহায়তায় বাংলায় প্রস্তুত, সম্পাদকীয় নীতি

কেপটাউনে টেস্টের শেষ দিনে ২৮৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে মাত্র ১১১ রানে গুটিয়ে ১৭৬ রানে ম্যাচ ও ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হেরেছে অস্ট্রেলিয়া। দলের এমন লড়াইহীন ব্যাটিং আত্মসমর্পণকে চূড়ান্ত অসম্মানজনক ও আন-অস্ট্রেলিয়ান আখ্যা দিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন সাবেক ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার।
কেপটাউনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসে ক্ষুব্ধ ওয়ার্নার: লড়াইহীন আত্মসমর্পণকে বললেন 'আন-অস্ট্রেলিয়ান'
এআই-নির্মিত প্রতীকী ছবি
সারসংক্ষেপ: মূল ৩ তথ্য
•
কী ঘটেছে: কেপটাউনে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ১৭৬ রানে হেরে ২-১ ব্যবধানে টেস্ট সিরিজ হেরেছে অস্ট্রেলিয়া, শেষ ইনিংসে গুটিয়ে গেছে ১১১ রানে।
•
ম্যাচের প্রভাব: এই ঐতিহাসিক জয়ে বিশ্ব টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ফিরেছে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে।
•
সামনে কী: ডিসেম্বরে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চার টেস্টের সিরিজ এবং পরে ভারতের মাটিতে পাঁচ টেস্টের সফরে নামবে অস্ট্রেলিয়া।

দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্টের পঞ্চম দিনে চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে ১৭৬ রানের বড় ব্যবধানে হেরেছে প্যাট কামিন্সের অস্ট্রেলিয়া। কেপটাউনের নিউল্যান্ডসে জয়ের জন্য ২৮৮ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে কাগিসো রাবাদা ও সাইমন হারমারের বিধ্বংসী বোলিংয়ের মুখে সফরকারীরা গুটিয়ে যায় মাত্র ১১১ রানে। এই জয়ে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজটি ২-১ ব্যবধানে জিতে নিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি স্পোর্টসের প্রতিবেদনে জানানো হয়, দলের এমন বিবর্ণ ও লড়াইহীন পরাজয়ের পর সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার নিজের সাবেক সতীর্থদের তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া ওয়ার্নার ফক্স স্পোর্টসে ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় বর্তমান দলের ব্যাটিং ব্যর্থতাকে চরম লজ্জাজনক ও 'আন-অস্ট্রেলিয়ান' বলে অভিহিত করেছেন।

সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচের শেষ দিনের শুরুতেই ক্যাঙ্গারুদের ব্যাটিং লাইনআপকে গুঁড়িয়ে দেন কাগিসো রাবাদা। নিজের করা প্রথম ওভারের দ্বিতীয় বলেই ওপেনার ম্যাট রেনশকে লেগ সাইডে উইকেটের পেছনে ক্যাচ বানিয়ে ফেরান তিনি। একই ওভারের শেষ বলে কোনো শট না খেলে বল ছেড়ে দিতে গিয়ে বোল্ড হয়ে ফেরেন মার্নাস লাবুশেন। এর মাধ্যমে লাবুশেনের টানা সেঞ্চুরিহীন টেস্ট ইনিংসের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল ৪৯-এ, যা ৩২ বছর বয়সী এই ব্যাটারের টেস্ট ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এরপর রাবাদা স্লিপে ক্যাচ বানিয়ে সাজঘরে ফেরান বিপজ্জনক ট্রাভিস হেডকে। এই উইকেটের মধ্য দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্রুততম বোলার হিসেবে ৩৫০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন প্রোটিয়া পেসার রাবাদা। তাঁর প্রথম পাঁচ ওভারের বিধ্বংসী স্পেলে মাত্র ১৪ রান খরচায় ৩ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকেই ছিটকে যায় সফরকারীরা।

অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ শুধু প্রতিপক্ষের দারুণ বোলিংয়ের কারণেই বিপর্যয়ে পড়েনি, তাদের নিজেদের দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্তও পতনের পথ ত্বরান্বিত করেছে। চোটগ্রস্ত সাবেক অধিনায়ক স্টিভ স্মিথের অনুপস্থিতিতে ভঙ্গুর হয়ে পড়া টপ অর্ডারের পর জশ ইংলিস ও ক্যামেরন গ্রিনের মধ্যে বোঝাপড়ার মারাত্মক অভাব দেখা দেয়। মাঠের খবর-এর পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল, ম্যাচের দ্বিতীয় দিনে স্মিথের জায়গায় সুযোগ পেয়ে প্রথম ইনিংসে অপরাজিত ৮৫ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেছিলেন ইংলিস। কিন্তু চতুর্থ ইনিংসে গ্রিনের অবিবেচক ডাকে রান নিতে গিয়ে মাত্র ৪ রানে রানআউট হন তিনি। এরপর স্পিনার সাইমন হারমারের ঘূর্ণিজাদুতে বোকা বনে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে ক্যাচ দেন অ্যালেক্স কেরি, তাঁর ব্যাট থেকে আসে মাত্র ২ রান। কুপার কনোলি হারমারের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ডাক মেরে ফিরে গেলে মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগেই অস্ট্রেলিয়ার স্কোর দাঁড়ায় ৬০ রানে ৭ উইকেট।

### ওয়ার্নারের ক্ষোভ ও মধ্যাহ্নভোজের পর চরম মন্থরতা

দলের এই শোচনীয় পরিস্থিতি দেখে ফক্স স্পোর্টসের পর্যালোচনায় নিজের ক্ষোভ আর চেপে রাখতে পারেননি ডেভিড ওয়ার্নার। তিনি সোজাসাপটা ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, এটি খুবই বাজে এবং একেবারেই আন-অস্ট্রেলিয়ান একটি পারফরম্যান্স, যেখানে লড়াইয়ের কোনো মানসিকতাই ছিল না। ওয়ার্নার স্পষ্ট জানিয়ে দেন, পুরো সিরিজজুড়েই বোলারদের চরম হতাশ করেছে ব্যাটাররা। প্রথম টেস্টে রেনশ কিছুটা লড়াই দেখালেও এই ইনিংসে দলের সামগ্রিক ব্যাটিং ছিল অমার্জনীয়। তিনি আরও যোগ করেন, রেনশর আউট দুর্ভাগ্যজনক হলেও দলের সামগ্রিক খেলার ধরন ছিল সম্পূর্ণ হতাশাজনক। টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহ্যবাহী লড়াকু মানসিকতার কোনো ছাপই কেপটাউনের ২২ গজে দেখা যায়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর অস্ট্রেলিয়া একদম ভিন্ন কৌশলে যাওয়ার চেষ্টা করে, যেখানে জয়ের কোনো তাড়নাই দেখা যায়নি। উইকেটে এসে প্যাট কামিন্স নিজের রানের খাতা খোলার আগেই ৪০টি বল মোকাবিলা করেন। পরিস্থিতি এতটাই অদ্ভুত রূপ নেয় যে একপর্যায়ে ৫০ মিনিটে অস্ট্রেলিয়া মাত্র একটি রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। অপর প্রান্তে থাকা গ্রিন ১০ রানে জীবন পেলেও স্পিনার হারমারের একটি ভেতরে ঢোকা ডেলিভারিতে সরাসরি বোল্ড হয়ে ফিরে যান। গ্রিনকে হারমারের হাত থেকে বাঁচাতে আট নম্বরে নামা মিচেল স্টার্ক একপর্যায়ে স্ট্রাইক নিজের কাছে রাখার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ইনিংসের একমাত্র প্রতিরোধ আসে দশ নম্বর ব্যাটার নাথান লায়নের ব্যাট থেকে। কামিন্স যখন শুধুই বল ঠেকিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন লায়ন সুযোগ বুঝে রান তুলে শেষ পর্যন্ত ৩৩ রানে অপরাজিত থেকে ইনিংসের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক হন।

তবে শেষ পর্যন্ত হারমারের স্পিনের ফাঁদ এড়িয়ে বেশি দূর যেতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। ১৬ রানে ৬ উইকেট নিয়ে নিজের ক্যারিয়ারসেরা বোলিং পরিসংখ্যান গড়ে পুরো ইনিংসে একাই ধস নামান হারমার। ম্যাচের দুই ইনিংস মিলিয়ে ১২০ রান খরচায় তাঁর ঝুলিতে জমা পড়ে ১০টি উইকেট। অস্ট্রেলিয়া তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ১১১ রানে অলআউট হলে দক্ষিণ আফ্রিকা পায় ১৭৬ রানের রাজকীয় জয়। প্রথম ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকার করা ৩২৯ রানের জবাবে অস্ট্রেলিয়া ৪২৯ রান তুলে ১০০ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড নিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে উইয়ান মুল্ডারের ১১৫ এবং রায়ান রিকেলটনের ১০১ রানের শতকে ভর করে ৩৮৭ রান তুলে অস্ট্রেলিয়াকে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল প্রোটিয়ারা, যার জবাবে দাঁড়াতেই পারেনি সফরকারীরা।

### দক্ষিণ আফ্রিকার প্রত্যাবর্তন ও সামনের সমীকরণ

অস্ট্রেলিয়ার ব্যর্থতার পাশাপাশি এই টেস্ট এবং সিরিজ জয়ের পূর্ণ কৃতিত্ব দিতে হবে দক্ষিণ আফ্রিকাকে। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় দিনে যখন দক্ষিণ আফ্রিকা ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে মাত্র ৪০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়েছিল, সেখান থেকে অধিনায়ক তেম্বা বাভুমার স্মরণীয় শতকে ঘুরে দাঁড়ায় তারা। সেই নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের ধারাবাহিকতাতেই কেপটাউনে ইতিহাস গড়ল প্রোটিয়া দল। যদিও ২০২৫ সালের টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে তারা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, তবুও অনেকেই তাদের শক্তিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। তবে এই ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ের মধ্য দিয়ে প্রোটিয়ারা আবারও আইসিসি টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করেছে। একই সঙ্গে চলমান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসে ব্যাক-টু-ব্যাক ফাইনাল খেলার সম্ভাবনাকে অনেকটাই উজ্জ্বল করেছে বাভুমার দল।

অন্যদিকে এমন শোচনীয় পরাজয়ের পর প্যাট কামিন্সের নেতৃত্বাধীন অস্ট্রেলিয়া দলের সামনে অপেক্ষা করছে ভীষণ কঠিন এক সূচি। ডিসেম্বরে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চার টেস্টের সিরিজ দিয়ে শুরু হবে তাদের ব্যস্ত আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডার। এরপর ভারতে গিয়ে পাঁচ টেস্টের হাইভোল্টেজ সিরিজ, মার্চে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ১৫০তম বর্ষপূর্তি টেস্ট এবং আগামী গ্রীষ্মে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী অ্যাশেজ সিরিজ খেলবে অজিরা। টপ অর্ডারের ধারাবাহিক ব্যর্থতা, চোট জর্জর দল এবং সাবেক তারকাদের এমন তীব্র সমালোচনার মুখে আসন্ন কঠিন টেস্ট মিশনগুলোতে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়াটাই এখন অস্ট্রেলিয়া দলের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

প্রতিবেদনটি শেয়ার করুন:
WhatsApp Facebook X (Twitter)