মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সিরিজের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশকে ৮ উইকেটের বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। স্পোর্টস্টার (দ্য হিন্দু)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চতুর্থ দিনে দ্বিতীয় ইনিংসে স্বাগতিক বাংলাদেশ মাত্র ১৪২ রানে গুটিয়ে গেলে ক্যারিবীয়দের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৭০ রান। ওপেনার ব্র্যান্ডন কিংয়ের অনবদ্য অপরাজিত ৮১ রানের উপর ভর করে অনায়াসেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় সফরকারীরা। এই জয়ের ফলে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
চতুর্থ দিনের শুরুতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস স্পিন বিষে পুরোপুরি নীল হয়ে যায়। স্পিনসহায়ক ও ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে ওঠা উইকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই স্পিনার রোস্টন চেইস ও জোমেল ওয়ারিকান স্বাগতিক ব্যাটারদের ওপর তাণ্ডব চালান। অফস্পিনার চেইস ৩৬ রানে ৫টি উইকেট শিকার করেন, আর প্রথম ইনিংসে ৫৩ রানে ৫ উইকেট নেওয়া বাঁহাতি স্পিনার ওয়ারিকান দ্বিতীয় ইনিংসে ৬৩ রানে ৪টি উইকেট ঝুলিতে পুরেন। বাংলাদেশের ইনিংসের ৯টি উইকেটই ভাগাভাগি করে নেন এই দুই স্পিনার।
১৭০ রানের জয়ের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই ওপেনার জন ক্যাম্পবেল ও ব্র্যান্ডন কিং শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করেন। স্পিন সামলাতে ডিফেন্সের বদলে সুইপ শটের নিখুঁত ব্যবহারে বাংলাদেশের বোলারদের বিভ্রান্ত করে তোলেন তারা। এই দুই ব্যাটার উদ্বোধনী জুটিতে ১১২ রান যোগ করে ম্যাচের জয় নিশ্চিত করে ফেলেন। ৬৮ বলে নিজের ষষ্ঠ টেস্ট ফিফটি তুলে নেন কিং। ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টের দিকে লেট কাট করে বাউন্ডারি হাঁকানোর মাধ্যমে তিনি ফিফটির পাশাপাশি ওপেনিং জুটির ১০০ রান পূরণ করেন।
বাংলাদেশের হয়ে একমাত্র আলোর ঝলক দেখান পেসার শরিফুল ইসলাম। দারুণ এক ইন-সুইঙ্গারে জন ক্যাম্পবেলের স্টাম্প উপড়ে ফেলেন তিনি। প্রথম ইনিংসে ৫৪ রান করা ক্যাম্পবেল এবার আউট হন ৪৯ রানে। এরপর অপর পেসার হাসান মাহমুদ আরেক ব্যাটার ত্যাগনারায়ণ চন্দরপলকে মাত্র ১ রানে সাজঘরে ফিরিয়ে স্বাগতিক শিবিরে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছিলেন। তবে সেই আশা স্থায়ী হতে দেননি ব্র্যান্ডন কিং ও কাভেম হজ।
তৃতীয় উইকেটে কিং ও হজ মাত্র ৫৮ বলে অবিচ্ছিন্ন ৫০ রানের জুটি গড়ে সফরকারীদের জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন। ১১৫ বলে ১০টি চার ও ১টি ছক্কার সাহায্যে ৮১ রানে অপরাজিত থাকেন কিং, অন্যদিকে কাভেম হজ ৩১ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন। বৃষ্টি, বাজে আলো ও বজ্রপাতের কারণে চতুর্থ দিনের খেলা বিঘ্নিত হলেও ক্যারিবীয়দের জয়ের গতি থামানো যায়নি।
এর আগে ৩ উইকেটে ৭৯ রান নিয়ে চতুর্থ দিন শুরু করা বাংলাদেশ দিনের শুরুতে দ্রুত উইকেট হারিয়ে তীব্র বিপদে পড়ে। তবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে একাকী লড়াই চালিয়ে যান তরুণ অলরাউন্ডার নাঈম হাসান। তিনি ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট ফিফটি হাঁকিয়ে দলকে দেড় শতাধিক রানের লিড এনে দেন। ৮৭ বলে ওয়ারিকানের বল মিড-উইকেটে ঠেলে দিয়ে নিজের maiden ফিফটি স্পর্শ করেন নাঈম। শেষ ব্যাটার হিসেবে আউট হওয়ার আগে তিনি দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৫২ রান করেন। চেইসের বলে লং-অনে ক্যাচ দেওয়ার আগে শেষ ব্যাটার হিসেবে তিনি আউট হলে ১৪২ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ২৭২ রান তোলার পর সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ২৪৫ রানে অলআউট করে ২৭ রানের সামান্য লিড পেয়েছিল।
### স্পিন চ্যালেঞ্জ ও সিরিজ সমীকরণ
চলতি সিরিজের আগে 'মাঠের খবর'-এর বিগত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, বাংলাদেশ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ (ডব্লিউটিসি) পয়েন্ট তালিকায় চতুর্থ স্থানে থেকে এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ অষ্টম স্থানে থেকে এই সিরিজ শুরু করেছিল। সিরিজে মাঠে নামার আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক রোস্টন চেইস তাঁর তরুণ খেলোয়াড়দের মিরপুরের উইকেট নিয়ে পূর্বধারণা না রেখে নিজেদের মেধা দিয়ে খেলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। চেইসের সেই পরামর্শ মাঠে শতভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে, যেখানে নিজে বল হাতে ৫ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে জয় এনে দিয়েছেন।
মাঠের খবরের আগের দিনের প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রথম ইনিংসে সাদমান ইসলামের শতকের ওপর ভর করে বাংলাদেশ ২৭২ রান সংগ্রহ করেছিল। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হন টাইগার ব্যাটাররা। ব্যাটারদের ব্যর্থতা এবং চেইস-ওয়ারিকান জুটির মোট ৯ উইকেট শিকারের ফলে মিরপুরের টার্নিং ট্র্যাকে ম্যাচ হাতছাড়া হয় স্বাগতিকদের। এই জয়ে টেস্ট সিরিজে লিড নেওয়ার পাশাপাশি ডব্লিউটিসির পয়েন্ট টেবিলেও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরির ইঙ্গিত দিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট আগামী সপ্তাহে সিলেটে অনুষ্ঠিত হবে।