হিন্দুস্তান টাইমস ক্রিকেটের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার তৃতীয় টেস্টটি প্রমাণ করেছে কেন উচ্চ পর্যায়ের টেস্ট ক্রিকেট এই খেলার সবচেয়ে চরম ফরম্যাট। নিউল্যান্ডসে একটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই দিয়ে শুরু হওয়া এই ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত শেষ দিনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়। স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা সফরকারীদের মাত্র ১১১ রানে অলআউট করে ১৭৬ রানের বিশাল জয় তুলে নেয়। এই জয়ের ফলে প্রোটিয়ারা ২-১ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নেয় এবং টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে পৌঁছানোর গৌরব অর্জন করে। ম্যাচটি ছিল এমন এক লড়াই যেখানে সবকিছুই উপস্থিত ছিল—প্রথম দিকে দারুণ লড়াই করা সেঞ্চুরি, ম্যাচের মোড় ঘুরে যাওয়া, লোয়ার অর্ডারের দুর্দান্ত প্রতিরোধ এবং একটি বোলিং মাস্টারক্লাস যা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া ব্যাটিং লাইনআপকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়।
ম্যাচের প্রথমার্ধটি ছিল নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কঠিন লড়াই। টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের প্রথম ইনিংসে ৩২৯ রানের একটি সম্মানজনক সংগ্রহ গড়ে তোলে। এমন একটি পিচে এই রান আসে যেখানে পেসারদের জন্য শুরুর দিকে যথেষ্ট সুইং ও মুভমেন্ট ছিল। মারকুস অ্যাকারম্যান দুর্দান্ত ব্যাটিং করে ৯৫ রান করেন এবং অল্পের জন্য সেঞ্চুরি মিস করেন। এছাড়া এইডন মার্করাম ৭৮ রান, মার্কো ইয়ানসেন ৫২ রান এবং ডেভিড বেডিংহ্যাম ৫০ রানের গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশাতক হাঁকান।
তবে স্বাগতিক ব্যাটারদের মনে ভীতি ধরিয়ে দেন মিচেল স্টার্ক। অস্ট্রেলিয়ান এই পেসার তার চিরাচরিত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বল করে পিচ থেকে প্রচুর সাহায্য আদায় করে নেন এবং ৬/৭১ উইকেটের একটি দুর্দান্ত ও বিধ্বংসী স্পেল উপহার দেন। স্টার্কের এই বোলিং আক্রমণ সামলে প্রোটিয়াদের ইনিংসে বড় ধাক্কা লাগে।
এর জবাবে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসটি ছিল বেশ গোছানো ও শক্তিশালী। তারা দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিং আক্রমণ সফলভাবে মোকাবিলা করে ৪২৯ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড় করায়। এই ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার সেরা তারকা ছিলেন জশ ইংলাস। তিনি ক্যারিয়ারের সেরা ১০২ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে তার দ্বিতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। তাকে দারুণভাবে সঙ্গ দেন অ্যালেক্স ক্যারি, যিনি ৮০ রানের একটি অনবদ্য ইনিংস খেলে আউট হন। এছাড়া ম্যাট রেনশ ৭৪ রানের একটি ধৈর্যশীল ও লড়াকু ইনিংস খেলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে অফ স্পিনার সাইমন হার্মার ম্যারাথন বোলিং স্পেলে ৪/১০৪ উইকেট শিকার করেন এবং মার্কো ইয়ানসেন তিনটি উইকেট নেন। তবুও প্যাট কামিন্স ও তার দল প্রথম ইনিংসে মূল্যবান ১০০ রানের লিড অর্জন করতে সক্ষম হয়।
ম্যাচের প্রকৃত মোড় পরিবর্তনের মুহূর্তটি আসে চতুর্থ দিনে, যা ছিল ম্যাচের অত্যন্ত কৌতূহলোদ্ভূত তৃতীয় ইনিংস। দক্ষিণ আফ্রিকা ১৮৫ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে এবং তাদের মিডল অর্ডার দ্রুত সাজঘরে ফিরে যায়। এমন সংকটজনক পরিস্থিতিতে দলের ত্রাতা হয়ে আসেন উইয়ান মুল্ডার এবং রায়ান রিকেলটন। এই দুই ব্যাটার উইকেটে জাঁকিয়ে বসে ষষ্ঠ উইকেটে রেকর্ড ১৫৪ রানের জুটি গড়ে ম্যাচের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেন।
### দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিরোধ ও অস্ট্রেলিয়ার পতন
হিন্দুস্তান টাইমস ক্রিকেটের তথ্য অনুযায়ী, এই জুটির প্রতিরোধ নিছক টিকে থাকার লড়াই ছিল না। এটি ছিল অস্ট্রেলিয়ান বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে একটি দারুণ কাউন্টার-পাঞ্চ, যেখানে অসিরা এই জুটির ওপর সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিল। মরিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স কোনো ভুলের আশায় আটজন ভিন্ন বোলারকে ব্যবহার করেও কোনো সাফল্য পাননি।
রায়ান রিকেলটন ছিলেন ধৈর্যের প্রতিমূর্তি। তিনি ২১৯ বল মোকাবিলা করে অসাধারণ ১০১ রান করেন এবং দারুণভাবে সমস্ত চাপ হজম করে ব্যাট করেন। অন্যদিকে, অলরাউন্ডার উইয়ান মুল্ডার ব্যাটিংয়ে দারুণ মারমুখী রূপ ধারণ করেন এবং তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নেন। তিনি ২২১ বলে ১১৫ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন, যার মধ্যে চারটি বিশাল ছক্কা গ্যালারিতে গিয়ে আছড়ে পড়ে। যখন দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় ইনিংস ৩৮৭ রানে থামে, তখন তারা ১০০ রানের পিছিয়ে থাকা অবস্থাকে সফরকারীদের সামনে ২৮৮ রানের এক কঠিন এবং বিশাল লক্ষ্য হিসেবে দাঁড় করায়।
পঞ্চম দিনে নিউল্যান্ডসের উইকেটে ২৮৮ রান তাড়া করা এমনিতেই কঠিন কাজ, কিন্তু কেউই আশা করেনি অস্ট্রেলিয়া চতুর্থ ইনিংসে এতটা নাটকীয়ভাবে ভেঙে পড়বে। শেষ দিনে দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিং পারফরম্যান্স ছিল দেখার মতো, যার নেতৃত্বে ছিলেন কাগিসো রাবাদা এবং স্পিনার সাইমন হার্মার।
কাগিসো রাবাদা তার গতি দিয়ে প্রতিপক্ষের মনে ত্রাস সৃষ্টি করেন, আর সাইমন হার্মার তার কৌশলী স্পিনে অসিদের আটকে ফেলেন। অফ স্পিনার হার্মার নিউল্যান্ডসের পঞ্চম দিনের উইকেটের পায়ের ছাপ এবং স্বাভাবিক টার্নের পূর্ণ সুযোগ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মিডল ও লোয়ার অর্ডারকে নিজের ঘূর্ণিজালে আটকে ফেলেন। তিনি ম্যাচের সেরা বলটি করে সাজঘরে ফেরান ক্যামেরন গ্রিনকে। অফ স্টাম্পের বাইরে ফেলে করা সেই বলটি ডিফেন্স করতে গেলে ব্যাটে-বলে সংযোগ না হয়ে সোজা মিডল স্টাম্প ভেঙে দেয়। গ্রিন ছিলেন অষ্টম ব্যাটার যিনি আউট হন।
তারও অনেক আগে থেকেই অস্ট্রেলিয়া শিবিরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। যখন কুপার কনলি হার্মারের বলে ঢিলেঢাল খেলোয়াড়সুলভ শট খেলে আউট হন, তখন অস্ট্রেলিয়ার স্কোর দাঁড়ায় ৪১ রানে ৪ উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপের বিশৃঙ্খলার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে রান আউটের মাধ্যমে। গ্রিনের সঙ্গে একটি অপ্রয়োজনীয় সিঙ্গেলের কল করে জশ ইংলাস মাত্র ৪ রান করে রান আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন। হার্মার তার বোলিং বৈচিত্র্য অব্যাহত রেখে শেষ পর্যন্ত লোয়ার অর্ডার গুটিয়ে দেন এবং ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো টেস্ট ম্যাচে ১০ উইকেট শিকারের কীর্তি গড়েন।
অস্ট্রেলিয়ার রান তাড়ার প্রচেষ্টা মাত্র ১১১ রানে শেষ হয়ে যায়। এই সিরিজ জয়ের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম টেস্টে হারের পর দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস রচনা করে। একই সঙ্গে এটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৫-২৭ এর পয়েন্ট টেবিলে বড় ধরনের ও আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে।
এই জয়ের ফলে দক্ষিণ আফ্রিকা পয়েন্ট তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে এবং তাদের পয়েন্টের শতকরা হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১.৪৩ শতাংশে। যেহেতু পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ দুটি দল ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে, তাই প্রোটিয়ারা অস্ট্রেলিয়াকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া নেমে গেছে তৃতীয় স্থানে, যাদের পয়েন্ট শতকরা হার ৬9.২৩ শতাংশ। শীর্ষে থাকা নিউজিল্যান্ডের ঠিক পরেই অবস্থান করছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এই জয় তাদের ফাইনাল খেলার এবং তাদের অর্জিত ডিফেন্ডিং ক্রাউন বা শিরোপা রক্ষার সম্ভাবনাকে বহুলাংশে উজ্জ্বল করে তুলেছে। অন্যদিকে, টেবিলের চতুর্থ স্থানে রয়েছে ভারত।