কেপ টাউনে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে চলমান টেস্ট ম্যাচটি এক রোমাঞ্চকর সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিবিসি স্পোর্ট ক্রিকেট সূত্রে জানা গেছে, চতুর্থ দিনে পুরো সময় ব্যাট করে প্রোটিয়ারা ম্যাচের চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। চতুর্থ দিনের খেলা শুরুর সময় দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর ছিল ৪ উইকেটে ৪০ রান, যেখান থেকে পরাজয় প্রায় নিশ্চিত মনে হচ্ছিল। তবে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে স্বাগতিক দল এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে সিরিজ জয় এখন বাস্তব সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। শেষ ওভারে ৩২৪ রানে অলআউট হওয়ার আগে দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে মোট ৩৮৭ রান সংগ্রহ করে। ফলে সফরকারী অস্ট্রেলিয়ার সামনে জয়ের জন্য ২৮৮ রানের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে।
এই ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে রিয়ান রিকেলটন ১০১ রান করেন এবং উইয়ান মুল্ডার দুর্দান্ত একটি সেঞ্চুরি উপহার দিয়ে ১১৫ রান করে শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হন। উইয়ান মুল্ডার তার ক্যারিয়ারের এই সেঞ্চুরিটি পূর্ণ করেন কাগিসো রাবাদার সাথে শেষ উইকেটে একটি গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ার পথে। এই জুটির দৃঢ়তায় অস্ট্রেলীয় বোলাররা ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং কেপ টাউনের পিচটি ব্যাটিংয়ের জন্য বেশ সহায়ক মনে হতে থাকে। রিয়ান রিকেলটন এবং উইয়ান মুল্ডার যখন নিজেদের মেলে ধরেছিলেন, তখন অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের জন্য সুযোগ তৈরি করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল। এর ফলে দুজনই যথাক্রমে তাদের টেস্ট ক্যারিয়ারের তৃতীয় এবং চতুর্থ সেঞ্চুরি তুলে নিতে সক্ষম হন।
### ম্যাচের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত এবং বিপর্যয়
রিয়ান রিকেলটনের অনবদ্য ইনিংসটির ইতি ঘটে একটি রান আউটের মাধ্যমে। এরপর মার্কো ইয়ানসেন ডিপ স্কয়ার লেগে ক্যাচ তুলে দেন এবং জেরাল্ড কোয়েটজি ও রান আউটের শিকার হন। মূলত ব্যাটসম্যানদের ভুল বোঝাবুঝির কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা মাত্র ৬১ রান তুলতে গিয়ে ৪ উইকেটের পতনের মুখে পড়ে। এই ধসের ফলে স্বাগতিক দল ৯ উইকেটে হারিয়ে ২৫১ রানের লিড নিয়েছিল। তবে উইয়ান মুল্ডার এবং দলের ১১ নম্বর ব্যাটসম্যান কাগিসো রাবাদা দিনের খেলা শেষ হওয়ার আগে আরও ৩৬ রান যোগ করেন। এই শেষ মুহূর্তের রানগুলো প্রমাণ করে যে এই উইকেটে রান তোলা অসম্ভব কিছু নয়, যদিও তা কোনো রান তাড়ার মানসিক চাপ ছাড়াই অর্জিত হয়েছিল।
দিনের শেষ সেশনে নাথান লায়নের একটি দুর্দান্ত ডেলিভারিতে ব্যাট না বাড়িয়ে বোল্ড হন সাইমন হারমার। এই উইকেটটি বুঝিয়ে দেয় যে পঞ্চম দিনে রান তাড়া করা কতটা কঠিন হতে পারে। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ট্রাভিস হেড, মারনাস লাবুশেন, জশ ইংলিশ এবং অ্যালেক্স কেরির মতো স্বীকৃত ব্যাটসম্যানদের শিকার করেছিলেন সাইমন হারমার। ৩৭ বছর বয়সী এই এসেক্সের কিংবদন্তি স্পিনার, যিনি এক সময় ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার কথাও ভেবেছিলেন, পঞ্চম দিনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
### পিচের আচরণ এবং ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান
ক্রিকভিজের পিচভিচ রেটিং অনুযায়ী, চতুর্থ দিনের শেষ সেশনে পিচের কাঠিন্যের রেটিং বেড়ে ৬ দশমিক ৬ এ পৌঁছায়। এটি ছিল এই টেস্ট ম্যাচের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং সবচেয়ে কঠিন রেটিং। সকালের দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও টেস্ট গড়ার সাথে সাথে পঞ্চম দিনে বল আগের চার দিনের তুলনায় অনেক বেশি টার্ন করতে শুরু করেছে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চতুর্থ দিনে দক্ষিণ আফ্রিকার ভুল শট খেলার হার ছিল মাত্র ১১ শতাংশ, যা তৃতীয় দিনে ছিল ১৮ শতাংশ। অনিয়মিত বাউন্স এখনো বড় কোনো ফ্যাক্টর হয়ে ওঠেনি, যদিও চা বিরতির ঠিক পর রিয়ান রিকেলটনকে করা একটি বল নিচু হয়ে গিয়েছিল।
ক্রিকভিজের অ্যানালিস্টদের টুল উইনভিজ অনুযায়ী, এই ম্যাচে স্বাগতিক দলটির জয়ের সম্ভাবনা ৫৪ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ার সামনে যে লক্ষ্য রয়েছে, তা যদি তারা সফলভাবে চতুর্থ ইনিংসে সফল করে, তবে সেটি হবে এই বিখ্যাত মাঠে খেলা আগের ৬২টি টেস্টের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চতুর্থ ইনিংসের সফল রান তাড়া। এই মাঠের সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ডটি অস্ট্রেলিয়ার পক্ষেই রয়েছে। ২০০২ সালে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে একটি মহাকাব্যিক টেস্টে তারা ৩৩১ রান তাড়া করে চার উইকেটে জয় তুলে নিয়েছিল, যেখানে রিকি পন্টিং অপরাজিত একশ রানের দারুণ একটি ইনিংস খেলেছিলেন। এছাড়া নিউল্যান্ডসে চতুর্থ ইনিংসে ২৮৮ রানের বেশি স্কোর হয়েছে আরও পাঁচবার, যার সবগুলোই হয়েছিল পরাজয় অথবা ড্রয়ের ম্যাচে।
### সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স ও ট্রাভিস হেডের ভূমিকা
অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান দলটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চাপের মুখে দারুণ পারফর্ম করার রেকর্ড গড়েছে। প্রায় এক বছর আগে প্রথম অ্যাশেজ টেস্টে ২০৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার ট্রাভিস হেড ৮৩ বলে বিস্ফোরক ১২৩ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। ২০০৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এই ধরনের পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়ার রেকর্ড খুব একটা ভালো ছিল না। ওই নির্দিষ্ট সময়ে ২০০ থেকে ৩৫০ রানের লক্ষ্য পেয়ে চতুর্থ ইনিংসে ১৭টি চেজের মধ্যে ১৪টিতেই তারা ব্যর্থ হয়েছিল। তবে প্যাট কামিন্সের নেতৃত্বাধীন বর্তমান দল ২০২৩ সাল থেকে শুরু করে ২৮২ এবং ২৭৯ রানের সফল রান তাড়া সম্পন্ন করেছে, যার সাথে যোগ হয়েছে গত বছরের পার্থ টেস্টের জয়।
আধুনিক যুগে চাপের মুখে নিজেদের মেলে ধরার ক্ষেত্রে বর্তমান অস্ট্রেলীয় দলের চেয়ে ভালো খুব কম দলই রয়েছে। শনিবারের এই টেস্টের পঞ্চম দিনটিতে অস্ট্রেলিয়ার জন্য আরেকটি সুযোগ নিয়ে আসবে নিজেদের প্রমাণ করার। এই টেস্টের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে কোন দল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থেকে সিরিজ শেষ করবে। কেপ টাউনের এই কঠিন উইকেটে শেষ দিন অস্ট্রেলিয়া তাদের লক্ষ্য অর্জনে কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।