দ্য গার্ডিয়ানের ক্রিকেট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের বিপক্ষে এক নিশ্চিত জয়ের সুযোগ হাতছাড়া করেছে ইংল্যান্ড। গদ্দাফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে শাদাব খান এমন এক ইনিংস খেলেছেন যা ক্রিকেট বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। দল যখন ১৫৪ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে পরাজয়ের প্রহর গুনছিল, তখন শাদাবের অপরাজিত ১১৩ রানের সুবাদে পাকিস্তান এক উইকেটের রোমাঞ্চকর এক জয় তুলে নেয়। এই জয়ের ফলে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে খেলা নিশ্চিত হয়ে গেছে পাকিস্তানের। গত চার দিনের মধ্যে এটি দ্বিতীয় ম্যাচ, যেখানে ইংল্যান্ড হাতের মুঠো থেকে জয় ফসকে যেতে দেখল।
### লাহোরের রাতে নাটকীয় রান তাড়ায় অবিশ্বাস্য জয়
পাকিস্তান যখন রান তাড়ায় ১৫৪ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল এবং জয়ের জন্য তখনও ৮৮ রান প্রয়োজন ছিল, তখন গদ্দাফি স্টেডিয়ামের গেইটগুলোর সামনে দর্শকদের দীর্ঘ সারি তৈরি হতে শুরু করেছিল। কিন্তু শাদাবের অন্য পরিকল্পনা ছিল। একরত্তি শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্রিজে নামা হারিস রউফকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ইংল্যান্ডের বোলারদের ওপর চড়াও হন। বল মাঠের এদিক-সেদিক আছড়ে পড়তে থাকে আর ইংলিশ ক্রিকেটাররা নার্ভাস হাসিতে তা অবলোকন করতে থাকেন।
নাটকীয়তার পারদ আরও চড়ে যখন শাদাব ৯৭ রানে এলবিডব্লিউর শিকার হন। হতাশায় তিনি উইকেটে ব্যাট দিয়ে আঘাত করেন এবং ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলান। তবে রিভিউতে দেখা যায় বল তার ব্যাটের ভেতরে কানায় লেগেছিল, যার ফলে জীবন পান তিনি। সেখান থেকে জয়ের জন্য যে ২১ রান প্রয়োজন ছিল, তা তারা সফলভাবে তুলে নেন।
এই রান তাড়ায় রউফ ও স্যাম কারেনের ওয়াইড বল নিয়ে বিতর্ক এবং জো রুটের হস্তক্ষেপে উইল জ্যাকসকে শান্ত করার মতো নানা নাটকীয় মুহূর্ত দেখা যায়। এটি ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শাদাবের প্রথম সেঞ্চুরি। শেষ পর্যন্ত হারিস রউফ হেনরি ক্রকম্বকে চার মেরে পাকিস্তানকে এক উইকেটের অবিস্মরণীয় জয় এনে দেন। দশম উইকেটে তাদের ৮৯ রানের এই জুটি সফল ওয়ানডে রান তাড়ায় সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়েছে।
### খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো ও ইনিংসের গতিপ্রকৃতি
বৃহস্পতিবারের ৮৫৯ রানের রান উৎসবের পর এটি ছিল বেশ ভিন্নধর্মী একটি ম্যাচ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিশ্ব সিরিজ স্যামন পিংক জার্সিতে স্তন ক্যানসারের সচেতনতায় মাঠে নামা পাকিস্তান ইনিংসের মাঝপথে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। ইংল্যান্ড তাদের ইনিংসের ২০ বল বাকি থাকতেই মাত্র ২৪১ রানে অলআউট হয়ে যায়। তবে ইংল্যান্ডের বোলাররা ঠান্ডা মাথায় বল করে পাকিস্তানের ব্যাটারদের একের পর এক প্যাভিলিয়নে ফেরান, যতক্ষণ না শাদাব ও রউফ শেষ জুটি গড়ে তোলেন।
পাকিস্তানের রান তাড়া শুরু হয়েছিল লাহোরের এক বেগুনি রাতের আকাশে, যেখানে দর্শকরা দেরিতে হলেও স্টেডিয়ামে ভিড় জমান। ইংল্যান্ডের মতো পাকিস্তানের পাওয়ারপ্লেও বেশ কঠিন ছিল। ফখর জামান পঞ্চম ওভারে গাস এটকিনসনের বলে স্লিপে জেমস ওভারটনের হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হন।
ডেব্যুট্যান্ট হেনরি ক্রকম্ব নতুন বল হাতে নেন এবং নিজের প্রথম ওভারেই দারুণ বোলিং করেন। নয় বলের একটি এলোমেলো ওভারের শেষ বলে তিনি সাইম আইয়ুবকে আউট করেন, যিনি ওভারটনের হাতে ক্যাচ দেন। গদ্দাফি স্টেডিয়ামে বাবর আজমের নাম ধরে দর্শকরা গলা ফাটাতে শুরু করেন এবং বাবরও চমৎকার কিছু শট খেলেন। কিন্তু এটকিনসনের একটি দুর্দান্ত ডেলিভারি তার অফ স্টাম্প ছিটকে দেয়।
### মিডল অর্ডারের পতন এবং শেষ জুটির লড়াই
সাদ বেগ ৩২ রানের কার্যকরী ইনিংস খেললেও ওভারটনের বলে জ্যাকসের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। এরপর ম্যাচটি যেন বিড়াল-ইঁদুর খেলায় রূপ নেয়। লিয়াম ডসন এবং ওভারটন আঁটসাঁট বোলিং করে পাকিস্তানকে চাপে ফেলেন। হাসান নওয়াজ ডসনের বলে বড় শট খেলতে গিয়ে হ্যারি ব্রুকের হাতে ধরা পড়েন। আরাফাত মিনহাজ তিন বল স্থায়ী হয়ে ওভারটনের বলে রুটকে ক্যাচ দেন।
সালমান আলী আঘা ডসনের বলে বড় শট খেলতে গিয়ে আউট হন এবং ওয়ানডে অভিষেক হওয়া রাজাউল্লাহ জ্যাকসের ঘূর্ণিতে বোল্ড হন। এর ফলে পাকিস্তানের নবম উইকেটের পতন ঘটে এবং ম্যাচটি ইংল্যান্ডের মুঠোয় চলে গিয়েছিল বলে মনে হচ্ছিল।
### ইংল্যান্ডের ইনিংস এবং বেন ডাকেটের সেঞ্চুরি
এর আগে, বেন ডাকেটের পঞ্চম ওয়ানডে সেঞ্চুরির ওপর ভর করে ইংল্যান্ড একটি লড়াই করার মতো পুঁজি গড়েছিল। তবে তাদের ইনিংসে মাঝে মাঝে দারুণ ঝলক দেখা গেলেও ঘন ঘন উইকেট হারানোর কারণে বড় রান তুলতে ব্যর্থ হয়। লাহোরে এটি ছিল তার দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। টসে জিতে পাকিস্তান ফিল্ডিং বেছে নেওয়ার পর ইংল্যান্ডের প্রথম চার ব্যাটসম্যান মাত্র ৪, ৫, ১ এবং ৬ রানে আউট হন।
টম ব্যান্টন শাহিন শাহ আফ্রিদির বলে কভারে ক্যাচ দিয়ে তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ১৫০তম উইকেট উপহার দেন। জো রুট কিছু সময় ক্রিজে টিকে থাকলেও শাহিনের বলে আউট হন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০০ রান করে ফর্মে থাকা ব্রুক রান নিতে গিয়ে রাজাউল্লাহর দারুণ ফিল্ডিংয়ের শিকার হয়ে রান আউট হন। এরপর জর্ডান কক্স রউফের বলে স্লিপে বাবরের হাতে ক্যাচ দেন।
স্যাম কারেনের সঙ্গে জুটি বেঁধে ডাকেট ৯৩ রান যোগ করেন। শাহিন শাহ আফ্রিদি বোলিংয়ে ফিরে শর্ট বলে কারেনকে আউট করেন। ইংল্যান্ডের শেষ ৫ উইকেট মাত্র ৯৬ রান যোগ করতে সক্ষম হয়। ডাকেট পাকিস্তানের বিপক্ষে তার প্রথম সেঞ্চুরি উদযাপনে ব্যাট উঁচিয়ে ধরেন, তবে তাদের সংগ্রহ পর্যাপ্ত ছিল না। ফাইনালে পৌঁছানোর জন্য ইংল্যান্ডকে এখন প্রার্থনা করতে হবে যেন পাকিস্তান মঙ্গলবার শ্রীলঙ্কাকে হারায় এবং এরপর বৃহস্পতিবার ইংল্যান্ড যেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বড় ব্যবধানে জয় পায়।