ক্রিকেট বিষয়ক ওয়েবসাইট ক্রিকইনফো ও ক্রিকট্র্যাকার সূত্রে জানা গেছে, ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল ম্যাচের আগে পাকিস্তান দলের প্রধান কোচ মাইক হেসন আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন যে তার দল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে তাদের সেরা ক্রিকেট উপহার দেবে। আগামী ৩১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে এই ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। টুর্নামেন্টের লিগ পর্বে টানা তিন জয়ে ইতোমধ্যে ফাইনাল নিশ্চিত করার পরও কোচ হেসন স্বীকার করেছেন যে দলটি দারুণ খেললেও এখনো তাদের পূর্ণ সামর্থ্য বা সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। শাহিন শাহ আফ্রিদি ও তার দল এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত মোট চার ম্যাচ খেলে তিনটিতে জয় এবং একটিতে পরাজিত হয়েছে।
পিসিবি ডিজিটালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কোচ মাইক হেসন দলের সার্বিক পারফরম্যান্স নিয়ে মূল্যায়ন করতে গিয়ে জানান যে গত কয়েকটি সপ্তাহ দলের জন্য বেশ ভালো কেটেছে। তিনি বলেন যে দলের মূল খেলোয়াড়দের কয়েকজনের পরিপূর্ণ অবদান ছাড়াই টানা তিনটি জয় তুলে নেওয়া একটি অত্যন্ত ইতিবাচক লক্ষণ। কোচের মতে দলটি পারফেক্ট না হলেও যথেষ্ট ভালো ক্রিকেট খেলেছে। তা সত্ত্বেও তিনি মনে করেন দলটি এখনো তাদের সেরা ম্যাচটি খেলেনি এবং তিনি আশা প্রকাশ করেন যে তারা সেই সেরা পারফরম্যান্সটি ফাইনাল ম্যাচের জন্যই জমিয়ে রেখেছে।
পাকিস্তানের এই লিগ-পর্বের পথচলা ছিল বেশ ঘটনাবহুল ও রোমাঞ্চকর। রাওয়ালপিন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গত ১৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ম্যাচে পাকিস্তান দল ৩৭ রানের ব্যবধানে শ্রীলঙ্কাকে পরাজিত করেছিল। এর ঠিক দুই দিন পর, অর্থাৎ ২০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে একই ভেন্যুতে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়ে পাকিস্তান দল ৮৭ রানের একটি বড় ব্যবধানে জয় তুলে নেয়। এরপর তাদের তৃতীয় জয়টি আসে গত ২৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে লাহোরের ঐতিহাসিক গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে। সেই ম্যাচে শাদাব খানের অসাধারণ ও ক্যারিয়ারের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরির ওপর ভর করে পাকিস্তান দল রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের পর এক উইকেটের ব্যবধানে ইংল্যান্ডকে পরাস্ত করে।
অবশ্য এর পরপরই ২৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে একই ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আট উইকেটে পরাজিত হতে হয় পাকিস্তানকে। তবে আগের জয়গুলোর সুবাদে তারা ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে কোনো বড় সমস্যায় পড়েনি। ফাইনাল ম্যাচের আগের বিশ্রাম দিনে পাকিস্তান স্কোয়াড লাহোরের এলসিসিএ গ্রাউন্ডে তাদের অনুশীলন পুনরায় শুরু করে। কোচ মাইক হেসনের অধীনে পাকিস্তান দল গত প্রায় এক বছর ধরে ওয়ানডে ক্রিকেটে দারুণ সময় কাটাচ্ছে এবং এই সময়ের মধ্যে তারা ১৯টি ওয়ানডে ম্যাচের মধ্যে ১২টিতে জয় তুলে নিয়েছে। তার কোচিংয়ে পাকিস্তান দল দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সব ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বাদ পেয়েছে।
### বোলিং আক্রমণ ও তরুণদের বিকাশ
দলের বোলিং লাইনআপ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধান কোচ মাইক হেসন দলের পেস আক্রমণ ও তরুণ খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে শাহিন শাহ আফ্রিদি নিয়মিতভাবে পাওয়ারপ্লে বা ইনিংসের শুরুতেই প্রতিপক্ষের শীর্ষসারির উইকেট তুলে নিচ্ছেন, যা দলের সাফল্যের জন্য অত্যন্ত সমালোচনামূলক ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া নাসিম শাহ এবং হারিস রউফ টুর্নামেন্টের বিভিন্ন পর্যায়ে বেশ ভালো বোলিং করেছেন বলে কোচ মত প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে তরুণ লেগ স্পিনার ও অলরাউণ্ডার আরাফাত মিনহাসের কথা উল্লেখ করে হেসন জানান যে একজন তরুণ খেলোয়াড় হিসেবে সে ক্রমাগত উন্নতি করছে এবং দলের জন্য এটি বেশ ভালো একটি দিক।
বোলিংয়ের পাশাপাশি দলের ব্যাটিং গভীরতা, বিশেষ করে মিডল অর্ডারে হাসান নওয়াজের পারফরম্যান্স নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন কোচ। ত্রিদেশীয় সিরিজে হাসান নওয়াজ এখন পর্যন্ত চার ইনিংসে ব্যাট করে সর্বমোট ১৪৮ রান সংগ্রহ করেছেন এবং তার ব্যাটিং গড় রয়েছে ৩৭। কোচের মতে হাসান নওয়াজ খেলায় সত্যিই দারুণ অগ্রগতি প্রদর্শন করছেন এবং তার এই ধারাবাহিক বিকাশ কোচকে ভীষণভাবে আনন্দিত করেছে। যখন কোনো তরুণ খেলোয়াড় দলের মিডল অর্ডারে ব্যাটিং করতে নামে, তখন তাকে রান তাড়ার সমীকরণ নিয়ন্ত্রণ করা, ঝুঁকির মাত্রা বোঝা এবং তা যথাযথভাবে পরিচালনা করা শিখতে হয়। কোচ হেসন জানিয়েছেন যে হাসান নওয়াজ এই সমস্ত গুণাবলীগুলোতে দিন দিন আরও বেশি দক্ষ হয়ে উঠছেন।
ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার আগে পাকিস্তান দলের এই প্রস্তুতি ও আত্মবিশ্বাস দলটিকে মানসিকভাবে বেশ শক্ত অবস্থানে রেখেছে। লিগ পর্বে শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বেশ কিছু দারুণ জয় যেমন তাদের ড্রেসিংরুমের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার কাছে আট উইকেটের হার দলটিকে নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। কোচ হেসনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং তরুণ ক্রিকেটারদের ওপর তার ভরসা দলটিকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াডে রূপান্তর করেছে।
আগামী ৩১ অক্টোবর গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য এই ফাইনাল ম্যাচটি কেবল একটি ট্রফি জয়ের লড়াই নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে পাকিস্তানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখারও একটি বড় পরীক্ষা। কোচ হেসনের প্রত্যাশা অনুযায়ী শাহিন আফ্রিদি, শাদাব খান, হাসান নওয়াজ ও অন্যান্যরা যদি তাদের সেরা খেলাটা ফাইনালে মেলে ধরতে পারে, তবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে লড়াইটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর হবে। দলের কোচিং স্টাফ এবং খেলোয়াড়েরা এখন কেবল ফাইনালের দিন নিজেদের সেরাটা দেওয়ার জন্য পুরোপুরি মুখিয়ে আছেন।