ভারতের ঐতিহ্যবাহী ঘরোয়া টুর্নামেন্ট রঞ্জি ট্রফির এলিট গ্রুপ-সি ম্যাচে বাংলার বিপক্ষে দারুণ এক লড়াই উপহার দিয়েছে মহারাষ্ট্র। স্পোর্টস্টার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে অনুষ্ঠিত ম্যাচের দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষ হওয়ার প্রাক্কালে প্রথম ইনিংসে গুরুত্বপূর্ণ লিড তুলে নিয়েছে সফরকারীরা। প্রথম দিনে বাংলার গড়া স্বল্প সংগ্রহকে টার্গেট করে ব্যাট করতে নেমে শুরুর দিকে রীতিমতো ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়েছিল মহারাষ্ট্র। তবে দলের তরুণ ও লড়াকু ব্যাটারদের দৃঢ়তায় সেই সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে দলটি।
দিনের শুরুতেই আগের দিনের স্কোরের সঙ্গে রান যোগ করতে নেমে বড় ধাক্কা খায় মহারাষ্ট্র। আগের দিন ২১ রানে ২ উইকেট হারানো দলটি তাদের অন্যতম ভরসা অংকিত বাওয়েকে দ্রুতই হারিয়ে বসে। বাংলার পেসার মোহাম্মদ কাইফের একটি ভেতরে ঢোকা বল বাওয়ের রক্ষণ ভেদ করে স্টাম্প ভেঙে দেয়। এর পরপরই বোলিং আক্রমণে ধার বাড়িয়ে সুরজ জয়সওয়াল এবং মোহাম্মদ কাইফ যথাক্রমে শচীন ধাস ও হর্ষাল কাটেক সাজঘরে ফিরিয়ে দেন।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ওপেনার সিদ্ধেশ বীর ব্যক্তিগত ইনিংস দীর্ঘ করার চেষ্টা করেও সফল হননি। বাঁহাতি এই ব্যাটার মোহাম্মদ শামির বলে ডিপ ফাইন লেগের দিকে শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন। ফলে মাত্র ৬৪ রান তুলতেই দলের ছয়টি উইকেট পতন ঘটে এবং মহারাষ্ট্রের ইনিংস একপ্রকার ধসে পড়ার উপক্রম হয়। চারপাশ থেকে যখন বাংলার বোলাররা চাপ সৃষ্টি করছিলেন, তখন দলের টেলএন্ডাররা প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তোলেন।
### মধ্যাহ্নভোজের পর প্রতিরোধ এবং সাংভির বীরত্বপূর্ণ ইনিংস
দলের ব্যাটিং বিপর্যয় যখন চরমে, তখন সৌরভ নাওয়ালে এবং তানয় সাংভি মিলে দলের রান বাড়ানোর কাজ শুরু করেন। এই জুটিতে ৩৮ রান যোগ হওয়ার পর লাঞ্চের ঠিক আগে শাহবাজ আহমেদের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন নাওয়ালে। সফরকারীরা তখন ১০২ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে চরম বিপদের মুখে ছিল। তবে উইকেটের আচরণ কিছুটা সহজ হয়ে আসায় অন্য প্রান্ত আগলে রাখেন দলের আট নম্বর ব্যাটার তানয় সাংভি।
চার ঘণ্টারও বেশি সময় ক্রিজে টিকে থেকে সাংভি অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা এবং ধৈর্যের পরিচয় দেন। তার এই লড়াকু ইনিংসে তিনি ১৬৭টি বল মোকাবিলা করে ৩টি চার এবং ১টি ছক্কার সাহায্যে অপরাজিত ৫টি রান সংগ্রহ করেন। প্রদীপ্ত প্রামাণিকের বোলিংয়ে সোজা ব্যাটে মারা তার একটি ছক্কা সবার নজর কাড়ে। উইকেটে থিতু হয়ে তিনি একে একে সঙ্গী করে নেন নিচের সারির ব্যাটারদের।
সংকটময় মুহূর্তে সাংভি তার সতীর্থদের নিয়ে দারুণ কিছু জুটি গড়েন। হ্যাঙ্গারেকরের সঙ্গে তিনি মূল্যবান ৪৪ রান যোগ করেন এবং হিতেশ ওয়ালুঞ্জের সঙ্গে যোগ করেন ১২ রান। এরপর ইনিংসের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জুটিটি গড়ে ওঠে শেষ উইকেটে। প্রদীপ দাদের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন ৪৯ রানের এক জুটি গড়ে দলকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান এই তরুণ বাঁহাতি ব্যাটার। প্রদীপ দাধে ৫৯ বল খেলে ৪টি চারের সাহায্যে ২২ রান করে অপরাজিত থাকেন।
### বাংলার বোলারদের সংগ্রাম ও ইডেন গার্ডেন্সের পরিস্থিতি
ম্যাচের দ্বিতীয় সেশনে পিচ কিছুটা ব্যাটিং সহায়ক হয়ে ওঠায় বাংলার বোলারদের জন্য কাজটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ সময় ধরে ফিল্ড ছড়িয়ে রাখা হলেও ব্যাটারদের ব্যাটের কানায় লেগে বল ফিল্ডারদের নাগালের বাইরে পড়ে যায় এবং বাই রান থেকেও মূল্যবান রান সংগ্রহ করে সফরকারীরা। এই পরিস্থিতিতে বাংলার বোলারদের বেশ অসহায় দেখায়। দীর্ঘ সময় নিখুঁত বোলিং করা শাহবাজ আহমেদই সবচেয়ে সফল বোলার হিসেবে আবির্ভূত হন এবং ৩টি উইকেট শিকার করেন।
ম্যাচের দ্বিতীয় দিনের শেষভাগে হঠাৎ করেই আলো স্বল্পতা দেখা দেওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই আম্পায়াররা দিনের খেলার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এর ফলে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো নির্ধারিত সময়ের আগে খেলা শেষ করতে বাধ্য হন খেলোয়াড়রা। শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেটে ২০৭ রান সংগ্রহ করে মহারাষ্ট্র। বাংলার প্রথম ইনিংসের ১৪৩ রানের জবাবে তারা ৬৪ রানের স্পষ্ট প্রথম ইনিংস লিড অর্জন করে।
রঞ্জি ট্রফির এই ম্যাচে মহারাষ্ট্রের লোয়ার অর্ডার ব্যাটারদের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন দলকে চালকের আসনে বসিয়েছে। টুর্নামেন্টের এই ধাপে এমন একটি ইনিংস যেকোনো দলের মনোবল বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে কঠিন পরিস্থিতি থেকে দলের ৮ ও ১০ নম্বর ব্যাটার যেভাবে উইকেটে কামড়ে পড়ে থেকে রান বের করেছেন, তা ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘ পরিসরের ম্যাচের টেকনিক ও মেজাজের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।
### সামনের সমীকরণ ও টুর্নামেন্ট প্রেক্ষাপট
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, ইডেন গার্ডেন্সে চলমান এই ম্যাচটিতে এখন সম্পূর্ণভাবে মহারাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। প্রথম ইনিংসে অর্জিত ৬৪ রানের এই লিড তৃতীয় ও চতুর্থ দিনে ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করবে। বাংলার বোলাররা যদি তৃতীয় দিনের সকালে দ্রুত মহারাষ্ট্রের শেষ উইকেটটি তুলে নিতে না পারে, তবে লিডের ব্যবধান আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, ঘরের মাঠে পিছিয়ে থাকা বাংলাকে খেলায় ফিরতে হলে দ্রুত দ্বিতীয় ইনিংসে বড় সংগ্রহ দাঁড় করাতে হবে।
মাঠের খবরের পাঠকদের মনে থাকা ভালো যে, এই ঘরোয়া মৌসুমের ব্যস্ততার মাঝেই দেশের শীর্ষস্থানীয় তারকারাও বিভিন্ন টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রস্তুত করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে মাঠের খবরের আর্কাইভ রিপোর্ট অনুযায়ী, রোহিত শর্মা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের পর মুম্বাইয়ের হয়ে বিজয় হাজারে ট্রফিতে খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিরাট কোহলিকে নিয়েও চলছে নানামুখী আলোচনা ও সাবেক ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ বাণী। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটের এই মঞ্চে তরুণ খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সই ভবিষ্যতের তারকা তৈরির মূল ভিত্তি।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, রঞ্জি ট্রফির এলিট গ্রুপ-সি এর এই ম্যাচে তানয় সাংভির অনবদ্য ধৈর্য এবং প্রদীপ দাধের শেষ মুহূর্তের লড়াই মহারাষ্ট্রকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। তৃতীয় দিনে খেলা গড়ানোর আগে দুই দলের ড্রেসিংরুমের কৌশল এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতি খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখ এখন ইডেন গার্ডেন্সের পরবর্তী সেশনের দিকেই নিবদ্ধ রয়েছে।