আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ওডিআই দলগুলোর সাম্প্রতিক শক্তিমত্তা ও অবস্থান পুনর্নির্ধারণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে সদ্য সমাপ্ত ত্রিদেশীয় ওডিআই সিরিজ। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ডের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) পুরুষদের সর্বশেষ ওডিআই টিম র্যাঙ্কিং প্রকাশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিষয়ক শীর্ষস্থানীয় পোর্টাল উইজডেন তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শ্রীলঙ্কাকে ৩ উইকেটে হারিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল জয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানের ঝুলিতে অতিরিক্ত রেটিং পয়েন্ট যুক্ত হলেও পয়েন্ট তালিকার অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। অন্যদিকে, ফাইনাল লড়াইয়ে হেরে যাওয়া শ্রীলঙ্কা এবং ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়া ইংল্যান্ড র্যাঙ্কিংয়ের পয়েন্ট তালিকায় অবমূল্যায়নের শিকার হয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে।
উইজডেনের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান তথ্যমতে, পাকিস্তান এই ত্রিদেশীয় ওডিআই সিরিজের শিরোপা জয়ের ফলস্বরূপ ১টি মূল্যবান রেটিং পয়েন্ট অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। মোট ১০৪ রেটিং পয়েন্ট সংগ্রহ করে ওডিআই দলগত র্যাঙ্কিং তালিকায় পাকিস্তান বর্তমানে চতুর্থ স্থানে অবস্থান করছে। একই সাথে ১০৪ পয়েন্ট নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাও যৌথভাবে চতুর্থ স্থানটি দখল করে রেখেছে। অপরদিকে, লাহোরের ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হেরে শ্রীলঙ্কা ১টি রেটিং পয়েন্ট হারিয়েছে। এই পয়েন্ট ক্ষতির কারণে লঙ্কানরা আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ের টেবিলের সপ্তম স্থানে অবনমিত হয়েছে। এর আগে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়া ইংল্যান্ডের পয়েন্ট কমে তারা অষ্টম স্থানে নেমে যায়।
### ফাইনাল ম্যাচের রোমাঞ্চকর লড়াই ও রেকর্ড জয়
গত ৩১ অক্টোবর লাহোরে অনুষ্ঠিত সিরিজের ফাইনাল ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য এক রান তাড়ার মহাকাব্য রচনা করে স্বাগতিক পাকিস্তান। ম্যাচটিতে শ্রীলঙ্কার ছুড়ে দেওয়া ৩২৬ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানের শুরুটা ছিল চরম বিপর্যয়ের। ইনিংসের প্রথম চার ওভারের মধ্যেই সাজঘরে ফিরে যান তরুণ ওপেনার মাজ সাদাকাত এবং অভিজ্ঞ ব্যাটার বাবর আজম। মাত্র চার ওভারে দুই গুরুত্বপূর্ণ উইকেট হারিয়ে চরম চাপে পড়েছিল স্বাগতিকরা।
এমন কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের হয়ে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন অভিজ্ঞ বাঁহাতি ওপেনার ফখর জামান। তিনি মাত্র ৯৯ বলে ১২৭ রানের একটি অবিস্মরণীয় ইনিংস খেলেন। তার বিধ্বংসী এই ইনিংসে ছিল ১১টি চার ও ৬টি সুবিশাল ছক্কার মার। ইনিংসের শুরু থেকে ধীরগতিতে এগোলেও ফিফটি পূরণের পর ফখর জামানের ব্যাটিংয়ের রূপ পুরোপুরি বদলে যায়। প্রথম ৫০ রান করতে ফখর খরচ করেছিলেন ৫৯টি বল, কিন্তু পরের ৫০ রান তিনি তুলে নেন মাত্র ২৫ বলের বিধ্বংসী ঝড়ে। এটি ছিল আন্তর্জাতিক ওডিআই ক্রিকেটে ফখর জামানের ১২তম শতক।
দলকে জয়ের সরণিতে রাখতে ফখর জামান তৃতীয় উইকেটে তরুণ ব্যাটার সাদ বেগের সাথে ১৪৯ রানের এক চমৎকার পার্টনারশিপ গড়েন। সাদ বেগ দলকে শক্ত ভিত দিতে ৭৪ রানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ইনিংস খেলেন। পরবর্তীতে ফখর জামান চতুর্থ উইকেটে অলরাউন্ডার সালমান আলী আগার সাথে আরও ৫৭ রান যোগ করেন। এই দুই জুটির ওপর ভর করেই পাকিস্তান বড় লক্ষ্য তাড়া করার পথে সুদৃঢ় অবস্থানে পৌঁছায়।
ফখর জামান যখন আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন, তখনো পাকিস্তানের জয়ের জন্য দরকার ছিল ৮৬ বলে ১০৬ রান। সেই কঠিন মুহূর্তে দলের জয় নিশ্চিত করেন তরুণ ব্যাটার আরাফাত মিনহাস। তিনি মাত্র ৩১ বলে ৬১ রানের এক অনবদ্য ও বিধ্বংসী অপরাজিত ইনিংস খেলে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন। ফলে ৯ বল হাতে থাকতেই ৩ উইকেটের জয়ে শিরোপা নিজেদের করে নেয় পাকিস্তান। এর আগে ম্যাচের প্রথম ইনিংসে শ্রীলঙ্কার ব্যাটার কামিন্দু মেন্ডিস তার ক্যারিয়ারের প্রথম ওডিআই শতক হাঁকান। তিনি ১২৮ বলে ১৩১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেললেও দিনশেষে দলের পরাজয়ে সেই ইনিংসটি ম্লান হয়ে যায়।
### মাঠের খবরের পর্যালোচনা ও পরবর্তী সমীকরণ
মাঠের খবরের গত ১ নভেম্বরের আর্কাইভ রিপোর্ট অনুযায়ী, লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের এই ৩২৬ রান তাড়া করে জয় লাভ করাটি ছিল ওডিআই টুর্নামেন্টের ফাইনাল ইতিহাসে যৌথভাবে সর্বোচ্চ সফল রান তাড়ার রেকর্ড। এই স্মরণীয় জয়ের মধ্য দিয়ে ফখর জামান ও তার সতীর্থরা রঙিন পোশাকের ক্রিকেটে পাকিস্তানের ব্যাটিং গভীরতা ও আত্মবিশ্বাসের অনন্য প্রমাণ তুলে ধরেছেন।
এই ত্রিদেশীয় সিরিজের সাফল্য পাকিস্তানকে সাদা বলের ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাসী করলেও তাদের ড্রেসিংরুম ও স্কোয়াড সাজানোর প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন এসেছে। মাঠের খবরের গত ২৫ অক্টোবরের পূর্ববর্তী প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে আগামী ৯ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের জন্য পাকিস্তান দল ইতোমধ্যে দল ঘোষণা করেছে। সেই টেস্ট স্কোয়াডে সালমান আলী আগা এবং আলী ওসমানকে দলে ফিরিয়ে আনা হলেও প্রবীণ উইকেটকিপার-ব্যাটার মোহাম্মদ রিজওয়ানকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অনলাইন বেটিং ও ড্রেসিংরুমের তথ্য ফাঁসের মতো গুরুতর অভিযোগ তদন্তাধীন থাকায় রিজওয়ানকে স্কোয়াড থেকে বাইরে রাখা হয়েছে।
উইজডেনের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সমীকরণ টেনে বলা যায়, ওডিআই র্যাঙ্কিংয়ে পাকিস্তান ১০৪ পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ স্থানে নিজেদের অবস্থান শক্ত রেখেছে। শ্রীলঙ্কা সপ্তম স্থানে নেমে যাওয়া এবং ইংল্যান্ড অষ্টম স্থানে অবস্থান করায় আন্তর্জাতিক ওডিআই সার্কিটে দল দুটির সামনে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আপাতত পাকিস্তান ক্রিকেট দল ত্রিদেশীয় সিরিজের ট্রফি জয়ের সেই বিশাল আত্মবিশ্বাস সঙ্গে নিয়ে লাল বলের ক্রিকেটে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে আসন্ন টেস্ট সিরিজে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রমাণের লড়াইয়ে নামবে।