নিউজিল্যান্ড সফরের শুরুতেই অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে এক দুর্দান্ত জয় দিয়ে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ শুরু করেছে ভারত। গত বুধবার, ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বৃষ্টিবিঘ্নিত প্রথম ওয়ানডেতে টস জিতে প্রথমে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নেন ভারতীয় অধিনায়ক। দফায় দফায় বৃষ্টির কারণে খেলা স্থগিত থাকলে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের সামনে ৩২ ওভারে ১৪৩ রানের সংশোধিত লক্ষ্য স্থির করা হয়। ভারতের সামনে এই লক্ষ্য অর্জনে মূল ভূমিকা পালন করেন অভিজ্ঞ ব্যাটার বিরাট কোহলি। মাত্র ৫১ বলে ৭৪ রানের এক বিধ্বংসী ও ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেন তিনি। এর আগে বল হাতে ভারতের পেসার আরশদীপ সিং চার উইকেট শিকার করে কিউই ব্যাটারদের কোণঠাসা করে দেন। এই দুই পারফর্ম্যান্সের ওপর ভর করে ভারত ২২.৪ ওভারেই ৫ উইকেটের বড় জয় নিশ্চিত করে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
প্রথম ওয়ানডেতে ভারতের এই দাপুটে জয়ের পর সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার অজয় জাদেজা কোহলির পরিবর্তিত ব্যাটিং মানসিকতা নিয়ে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এক পর্যবেক্ষণ পেশ করেছেন। স্পোর্টস পোর্টাল ক্রিকট্যাকার-এর বরাতে জানা গেছে, জনপ্রিয় সম্প্রচার মাধ্যম সনি লিভ-এর আলোচনা অনুষ্ঠানে জাদেজা জানান যে, কোহলির ব্যাটিংয়ে এখন যে ভয়ডরহীন ভঙ্গি দেখা যাচ্ছে, তা মূলত দলের অন্যান্য সতীর্থদের ওপর তাঁর তৈরি হওয়া গভীর আস্থারই বহিঃপ্রকাশ। ক্যারিয়ারের শুরুর বা মাঝামাঝি সময়ে কোহলি যেভাবে একাই পুরো দলের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন, এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।
### কোহলির মানসিকতার পরিবর্তন ও জাদেজার জোরালো পর্যবেক্ষণ
অকল্যান্ডের মাঠে কোহলির ব্যাটিং নৈপুণ্যের প্রশংসা করে জাদেজা উল্লেখ করেন যে, বছরের পর বছর ধরে রান করা কোহলির জন্য কোনো নতুন ঘটনা নয়, তবে তাঁর বর্তমান ভঙ্গিটি অনেক বেশি আনন্দদায়ক। সনি লিভে জাদেজা বলেন, "অসাধারণ ইনিংস। গত কয়েক বছর ধরে আমরা বিরাট কোহলিকে নিয়মিত রান করতে দেখছি এবং প্রথমবার তিনি রান করছেন এমনটি নয়। তবে আগে সবসময় মনে হতো তিনি যেন পুরো দলকে একাই নিজের কাঁধে বহন করছেন। কিন্তু এখন তিনি অনুধাবন করতে পারছেন যে তাঁকে ছাড়াও সতীর্থরা ঠিকভাবে দল সামলে নিতে সক্ষম। আর তাই তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত মনে ও নিজের মতো করে খেলতে পারছেন।"
ভারতের সাবেক এই অলরাউন্ডার আরও ব্যাখ্যা করে বলেন যে, কঠিন সময়ে কেবল পরিস্থিতি সামলে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার এই ভঙ্গিটি একটি বিশেষ বার্তা বহন করে। জাদেজা মন্তব্য করেন, "তিনি নিজের স্বাভাবিক ক্রিকেট প্রকাশ করেছেন। অনেক সময় একজন জ্যেষ্ঠ খেলোয়াড় দলের চাহিদা মেনে শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে ম্যাচ শেষ করার চেষ্টা করেন। তবে এখন অন্য খেলোয়াড়দের প্রতিও তাঁর গভীর আস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে এটি একটি স্পেশাল ইনিংস ছিল। ম্যাচের পরিস্থিতি এমন কোনো অসম্ভব বা জটিল ছিল না, তবে অকল্যান্ডে খেলা দেখতে আসা সমর্থকদের তিনি পুরোপুরি বিনোদিত করেছেন।"
অকল্যান্ডের এই ম্যাচে ৫১ বলে ৭৪ রানের ইনিংসটির মাধ্যমে কোহলি আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্যারিয়ারে তাঁর ৮০তম অর্ধশতক স্পর্শ করেন। বিশ্ব ক্রিকেটের সবকটি ফরম্যাটে এবং আন্তর্জাতিক মানের যেকোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও ধারাবাহিক পারফর্ম্যান্সের আরও একটি প্রমাণ হলো এই অর্জিত মাইলফলক। ভারতের রান তাড়ায় তাঁর এমন আক্রমণাত্মক ব্যাটিং দলের রান তোলার গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং অতি দ্রুত দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেয়।
### সাম্প্রতিক ফর্ম, কাইফের পূর্বাভাস ও সিরিজের পরবর্তী সমীকরণ
নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই কোহলির এমন প্রভাব বিস্তার করা পারফর্ম্যান্স অবশ্য প্রত্যাশিতই ছিল। মাঠের খবর-এর গত ৩ নভেম্বরের এক আর্কাইভ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছিল যে, ভারতের সাবেক ব্যাটার মোহাম্মদ কাইফ এই সিরিজে কোহলিকে নিয়ে একটি বড় পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। কাইফ দাবি করেছিলেন যে, নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে বিরাট কোহলি অন্তত দুটি সেঞ্চুরি হাঁকাবেন। কিউইদের বিরুদ্ধে কোহলির ঐতিহাসিক রেকর্ড এবং সম্প্রতি তাঁর দুর্দান্ত ফর্মকে ভিত্তি করেই কাইফ এমন মন্তব্য করেছিলেন। অকল্যান্ডে কোহলি শতক পর্যন্ত না পৌঁছালেও তাঁর ৫১ বলে ৭৪ রানের ইনিংসটি কাইফের আস্থার যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছে।
ম্যাচের সামগ্রিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অকল্যান্ডে ভারতের জয় নিশ্চিত হয়েছে বোলিং ও ব্যাটিংয়ের নিখুঁত সমন্বয়ে। পেসার আরশদীপ সিং চার উইকেট নিয়ে নিউজিল্যান্ডকে চাপ মুক্ত হতে দেননি, আর জবাবে ব্যাট হাতে কোহলি প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর চড়াও হয়ে ৯.২ ওভার বাকি থাকতেই দলের জয় নিশ্চিত করেন। এটি প্রমাণ করে যে জাদেজা ভারতীয় ব্যাটিং গভীরতা ও দলের খেলোয়াড়দের ওপর কোহলির আস্থার যে বিষয়টি সামনে এনেছেন, তা মাঠের বাস্তবতার সাথেই হুবহু মিলে যায়।
পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের পরবর্তী রোমাঞ্চকর লড়াইটি অনুষ্ঠিত হবে আগামী শনিবার, ৭ নভেম্বর ওয়েলিংটনের স্কাই স্টেডিয়ামে। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে মাঠে নামার আগে ভারত ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। স্কাই স্টেডিয়ামে সফরকারী ভারত চাবে জয় ধরে রেখে নিজেদের আধিপত্য বাড়াতে এবং সিরিজের ব্যবধান ২-০ করতে। অন্যদিকে কিউই দল চেষ্টা করবে নিজেদের ঘরের মাঠে ঘুরে দাঁড়িয়ে সিরিজে সমতা ফেরাতে। কোহলির এমন মানসিক পরিবর্তন ও মুক্ত ব্যাটিং ভঙ্গি আগামী ম্যাচগুলোতে প্রতিপক্ষ বোলারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।