অকল্যান্ড – নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের ওডিআই সিরিজের প্রথম লড়াইয়ে দুর্দান্ত ও একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখে সহজ জয় তুলে নিয়েছে ভারত। অকল্যান্ডে বৃষ্টিবিঘ্নিত সিরিজের প্রথম ওডিআই ম্যাচে স্বাগতিকদের ৫ উইকেটে হারিয়ে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল সফরকারীরা। ভারতীয় ক্রীড়া মাধ্যম স্পোর্টস্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারকা ব্যাটার বিরাট কোহলির দুর্দান্ত ফিফটি এবং তরুণ পেসার আরশদীপ সিং ও গুরনুর ব্রারের বিধ্বংসী বোলিং স্পেলের উপর ভর করেই এই অনায়াস জয় অর্জন করে শুভমান গিলের দল।
বৃষ্টির কারণে ম্যাচের দৈর্ঘ্য কমে দাঁড়ালে ভারতের সামনে নতুন লক্ষ্য নির্ধারিত হয় ৪০ ওভারে ১৪৩ রান। ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারতের ব্যাটারদের কোনো বেগই পেতে হয়নি। মাত্র ২২.৪ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যায় সফরকারী দল। ব্যাট হাতে এই রান তাড়ায় মূল ভূমিকা পালন করেন সাবেক অধিনায়ক বিরাট কোহলি, যিনি মূলত নিজের ৩৮তম জন্মদিনের আগের দিনটিকেই ব্যাট হাতে উদযাপনের মঞ্চ বানিয়ে নেন।
রান তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছিল ভারত। ওপেনার রোহিত শর্মা মাত্র ৬ বল খেলে শূন্য রানে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান। তবে সেই শুরুর ধাক্কাকে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে দেননি কোহলি। অধিনায়ক শুভমান গিলের সঙ্গে জুটি বেঁধে ইনিংসের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন তিনি। অসাধারণ কভার ড্রাইভ, অনবদ্য মিড-উইকেট ফ্লিক এবং নিখুঁত পুল শটে মাঠের চারপাশে রানের ফুলঝুরি ফোটান কোহলি। ৫১ বলে ১৩টি চার ও ১টি দৃষ্টিনন্দন ছক্কার সাহায্যে তিনি খেলেন ৭৪ রানের ঝলমলে ইনিংস।
অধিনায়ক শুভমান গিল একপ্রান্তে অ্যাঙ্কর ভূমিকা পালন করে সংগ্রাহকের ভূমিকা রাখেন, যেখানে অন্যপ্রান্তে তাণ্ডব চালান কোহলি। দ্বিতীয় উইকেটে এই দুজন ১১৩ রানের ম্যাচজয়ী জুটি গড়েন। কিউই পেসার ব্লেয়ার টিকনারকে উইকেটের চারপাশে যেভাবে শট খেলেছেন কোহলি, তা ছিল দেখার মতো। এই ইনিংসের পথ ধরেই ওয়ানডে ক্যারিয়ারে নিজের ৮০তম হাফ-সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। তার এই আগ্রাসী ও শৈল্পিক ব্যাটিং অকল্যান্ডের সমর্থকদের দারুণ বিনোদন উপহার দেয়।
তবে এই জয়ের নেপথ্যে কোহলির ঝলকের চেয়েও বড় গল্প ছিল ভারতের অনভিজ্ঞ পেস বোলিং আক্রমণ। নিয়মিত পেসার জাসপ্রিত বুমরাহ, মোহাম্মদ সিরাজ এবং প্রসিধ কৃষ্ণ চোট ও কাজের চাপ ব্যবস্থাপনার কারণে এই ম্যাচে অনুপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে চার পেসার মিলিয়ে মাত্র ২৯টি ওডিআই খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে মাঠে নেমেছিল ভারতের পেস ইউনিট। কিন্তু অকল্যান্ডের ছোট ও সোজা বাউন্ডারির কন্ডিশন সত্ত্বেও কিউই ব্যাটারদের জন্য জীবন কঠিন করে তোলেন এই তরুণ তুর্কিরা।
৬ ফুট ৫ ইঞ্চি লম্বা তরুণ পেসার গুরনুর ব্রার গতি ও বাউন্স দিয়ে স্বাগতিক ব্যাটারদের শুরু থেকেই চাপে রাখেন। তার পেস বোলিং পার্টনার আরশদীপ সিং দুর্দান্ত লাইন ও লেংথ বজায় রেখে কিউইদের একের পর এক আঘাত হানেন। আরশদীপ ১০ ওভারে ৭০ রান দিয়ে ৪টি উইকেট শিকার করেন, আর গুরনুর ৯.২ ওভারে ৪৪ রান খরচায় নেন ৩টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। এই দুজনের তোপে পড়ে ৪০.২ ওভারে মাত্র ১৮৫ রানেই গুটিয়ে যায় নিউজিল্যান্ডের প্রথম ইনিংস।
ইনিংসে অর্থনৈতিক বোলিংয়ের দুর্দান্ত উদাহরণ সৃষ্টি করেন আরেক তরুণ পেসার আনশুল কম্বোজ। হরিয়ানার এই পেসার ১০ ওভারের কোটায় মাত্র ২২ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন। তিনি নিজের স্পেলে রেকর্ড ৪৬টি ডট বল করেন, যা মাঝের ওভারগুলোতে নিউজিল্যান্ডের রানের চাকা সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেয়। প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীরের তিনজন অনভিজ্ঞ পেসার নিয়ে মাঠে নামার বাজি শতভাগ সফল প্রমাণিত হয়।
### সিরিজের প্রেক্ষাপট ও সাম্প্রতিক ফর্ম
ওডিআই সিরিজের এই শুভসূচনা ভারতের সাম্প্রতিক দুর্দান্ত ফর্মেরই ধারাবাহিকতা। গত ১ নভেম্বর 'মাঠের খবর'-এর এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছিল যে, এর আগে টি-টোয়েন্টি সিরিজে নিউজিল্যান্ডকে ৩-২ ব্যবধানে পরাজিত করেছিল ভারত। সেডন পার্কে পঞ্চম টি-টোয়েন্টিতে ৭ উইকেটে হারলেও সিরিজ জয়ের পর কোচ গৌতম গম্ভীর দলগত প্রচেষ্টার প্রশংসা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'দল হিসেবে গড়ে উঠেছি, দল হিসেবেই জিতেছি' বার্তা প্রকাশ করেছিলেন। টি-টোয়েন্টি সিরিজের সেই জয়ের মানসিকতাই এবার ৫০ ওভারের ফরম্যাতেও বজায় রাখল ভারতীয় দল।
পাশাপাশি, অকল্যান্ডে বিরাট কোহলির এই বিধ্বংসী ইনিংসের সাথে গত ৩ নভেম্বর প্রকাশিত আমাদের পূর্ববর্তী প্রতিবেদনের বিশেষ মিল রয়েছে। সাবেক ভারতীয় ব্যাটার মোহাম্মদ কাইফ পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চলতি পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে দুটি সেঞ্চুরি হাঁকাবেন কোহলি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে কোহলির অতীতের অসাধারণ পরিসংখ্যান ও বর্তমান ফর্ম বিবেচনা করেই এই মন্তব্য করেছিলেন কাইফ। প্রথম ম্যাচেই ৭৪ রানের ইনিংস খেলে কোহলি যেন সেই পূর্বাভাস পূরণের পথেই হাঁটতে শুরু করেছেন। একই দিনে অধিনায়ক গিল নিশ্চিত করেছিলেন যে, জাতীয় দলে ফেরার আগে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের ফিটনেস প্রমাণ করতে হবে তারকা অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়াকে।
প্রথম ম্যাচে এই দাপুটে জয়ের ফলে পাঁচ ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল ভারত। অকল্যান্ডের ছোট বাউন্ডারিতে তরুণ পেসারদের এই পরিপক্ক বোলিং এবং কোহলির স্বচ্ছন্দ ব্যাটিং ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টকে পরবর্তী ম্যাচগুলোর জন্য বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে। অন্যদিকে প্রথম ম্যাচেই বিধ্বস্ত হওয়া স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডকে সিরিজের দ্বিতীয় ওডিআইতে ঘুরে দাঁড়াতে হলে তাদের ব্যাটিং ও বোলিং কৌশলে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস করতে হবে।