ক্রিকেট বিশ্বে এক অনন্য ইতিহাস রচনা করলেন অস্ট্রেলিয়ার উইকেটকিপার-ব্যাটার জশ ইংলিস। ক্রিকট্র্যাকার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেপ টাউনের নিউল্যান্ডস মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তৃতীয় টেস্টের তৃতীয় দিনে ১০২ রানের একটি দুর্দান্ত ও দৃষ্টিনন্দন ইনিংস খেলেছেন তিনি। ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ সালের এই দিনটি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে, কারণ এর আগে কোনো অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটার ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক তিন ফরম্যাটেই একাধিক সেঞ্চুরি করার কীর্তি গড়তে পারেননি। সাইমন হারমারের বলে একটি রিভার্স সুইপ শট খেলে তিনি তার কাঙ্ক্ষিত তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছান। অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও দায়িত্বপূর্ণ এই ইনিংসটি সাজাতে তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন ১৩২টি বলের। তার এই ইনিংসে ছিল ১১টি চার এবং দুটি ছক্কার মার। পুরো ইনিংসজুড়ে তার ব্যাটিং শৈলী ক্রিকেটপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে এবং অস্ট্রেলিয়ান ড্রেসিংরুমে এনে দিয়েছে স্বস্তির নিঃশ্বাস।
ম্যাচের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জশ ইংলিস যখন ক্রিজে এসেছিলেন তখন অস্ট্রেলিয়ার দলীয় সংগ্রহ ছিল ১৮৪ রানে ৩ উইকেট। এর কিছুক্ষণ আগেই ক্যামেরন গ্রিন ৬৫ রান করে সাজঘরে ফিরে গেছেন। এমন একটি কঠিন ও চাপের মুহূর্তে উইকেটে এসে দলের হাল ধরেন ইংলিস। অপরপ্রান্তে থাকা উইকেটকিপার-ব্যাটার অ্যালেক্স কেয়ারির সঙ্গে তিনি পঞ্চম উইকেটে গড়েন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১৮৫ রানের এক বিশাল জুটি। দলীয় রান যখন ১৮৫-তে ৪ উইকেট থেকে অনেক দূর এগিয়ে যায়, তখন এই জুটি অস্ট্রেলিয়াকে কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ইনিংসের ৩২৯ রানের সংগ্রহ টপকেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং দলকে এনে দেয় মূল্যবান এক লিড। শেষ পর্যন্ত সাইমন হারমারের বলেই ক্যাচ দিয়ে ১০২ রান করে আউট হন জশ ইংলিস। তার এই অনবদ্য আউটের আগেই অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করে ফেলেছিল এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তাদের নিজেদের হাতে।
এই টেস্ট ম্যাচের জন্য অস্ট্রেলিয়ান একাদশে মোট চারটি পরিবর্তন আনা হয়েছিল। দলে ফেরানো হয়েছিল জশ ইনজিল, কুপার কনলি, নাথান লায়ন এবং ক্যামেরন গ্রিনকে। এর আগে জশ ইংলিস তার সর্বশেষ টেস্ট ম্যাচটি খেলেছিলেন ২০২৫ সালের অ্যাশেজ সিরিজে, যার অর্থ প্রায় এক বছরের একটি দীর্ঘ বিরতির পর তিনি টেস্ট দলে কামব্যাক করলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ খেলার সময় আঙুলে চোট পেয়েছিলেন তিনি, যার ফলে একটি ফ্র্যাকচার বা ভাঙা আঙুলের কারণে বর্তমান সিরিজের প্রথম দুটি টেস্ট ম্যাচ খেলতে পারেননি। মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। এমন একটি কঠিন ইনজুরি কাটিয়ে দীর্ঘ বিরতির পর দলে ফিরেই টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নেওয়া তার এই ইনিংসটিকে আরও অনেক বেশি অর্থবহ ও মহিমান্বিত করে তুলেছে।
ক্রিকট্র্যাকার-এর তথ্য অনুযায়ী, জশ ইংলিস এখন টেস্ট ক্রিকেট, ওয়ানডে ক্রিকেট এবং টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট—তিন ফরম্যাটেই একাধিক সেঞ্চুরির মালিক। তার ঝুলিতে রয়েছে দুটি টেস্ট সেঞ্চুরি, দুটি ওয়ানডে সেঞ্চুরি এবং দুটি টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরি। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার কোনো ব্যাটার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এই ফরম্যাটগুলোর সবকটিতেই জোড়া সেঞ্চুরির এই পূর্ণাঙ্গ সেটটি সম্পন্ন করতে পারেননি। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ইতিহাসে অ্যারন ফিঞ্চ দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ১৭টি ওয়ানডে সেঞ্চুরি এবং দুটি টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরি করেছেন, কিন্তু তিনি কখনোই টেস্ট ক্রিকেটে তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে পারেননি। ফিঞ্চ ছাড়াও গ্লেন ম্যাক্সওয়েল হলেন অন্য এক নামী তারকা যিনি এই রেকর্ডের খুব কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত তা ছুঁতে ব্যর্থ হয়েছেন। গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ঝুলিতে রয়েছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে পাঁচটি এবং ওয়ানডে ক্রিকেটে চারটি সেঞ্চুরি, কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে তিনি মাত্র একটি সেঞ্চুরি করতে পেরেছেন।
### রেকর্ড গড়ার পথ এবং আগের সেঞ্চুরি
জশ ইংলিসের ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিটি এসেছিল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০২৫ সালে, গলে অনুষ্ঠিত সেই টেস্টে। নিউল্যান্ডসের এই ইনিংসটি টেস্ট ফরম্যাটে তার ক্যারিয়ারে ব্যক্তিগত দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এটি ছিল তার মাত্র তৃতীয় টেস্ট ম্যাচ। অর্থাৎ ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুর দিকেই প্রোটিয়াদের বিপক্ষে এই রেকর্ড গড়ার কৃতিত্ব দেখালেন তিনি। ইনজুরি থেকে সুস্থ হয়ে দলে ফিরে নিউল্যান্ডস টেস্টের এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ইংলিস এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন যা গ্লেন ম্যাক্সওয়েল কিংবা অ্যারন ফিঞ্চের মতো অভিজ্ঞ তারকারাও তাদের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অর্জন করতে পারেননি।
মাঠের খবরের পাঠকদের জন্য এই কৃতিত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দলে উইকেটকিপার-ব্যাটারদের ভূমিকা বরাবরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অতীতে অ্যাডাম গিলক্রিস্টের মতো তারকারা টেস্ট ক্রিকেটে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। জশ ইংলিস সেই ঐতিহ্যকেই যেন নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন। তিন ফরম্যাটে সেঞ্চুরির এই অনন্য রেকর্ড আধুনিক ক্রিকেটে বহুমুখী প্রতিভার এক জীবন্ত দলিল। এক বছর টেস্ট দলের বাইরে থাকার পর এবং আঙুলের ইনজুরি থেকে সুস্থ হয়ে সরাসরি এমন একটি পারফরম্যান্স উপহার দেওয়া মানসিক শক্তিরও পরিচায়ক। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট সিরিজের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তার ব্যাট থেকে আসা ১০২ রানের এই ইনিংসটি কেবল ব্যক্তিগত মাইলফলকই নয়, বরং পুরো দলের জন্য একটি বড় মানসিক শক্তি।
ম্যাচটির সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিচার করলে বোঝা যায়, কেপ টাউনের নিউল্যান্ডস টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে জশ ইংলিস ও অ্যালেক্স কেয়ারির জুটিই সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। প্রথম ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকার ৩২৯ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া যখন বিপদে পড়েছিল, তখন এই দুই ব্যাটারের প্রতিরোধই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। ক্রিকট্র্যাকার-এর প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে যে, সিরিজের প্রথম দুই টেস্টে ইনজুরির কারণে দলের বাইরে থাকা ইংলিস যখন দলে ফেরেন, তখন অনেকেই তার ফর্ম নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। কিন্তু সমস্ত সংশয় দূর করে তিনি ব্যাট হাতে উপযুক্ত জবাব দিয়েছেন। সাইমন হারমারের স্পিন ঘূর্ণির বিরুদ্ধে তার টেকনিক এবং শট নির্বাচন ছিল দেখার মতো। রিভার্স সুইপ খেলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করার সাহস প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের ওপর তার পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করলে, জশ ইংলিস এখন অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট স্কোয়াডে নিজের জায়গাটি আরও অনেক বেশি পোক্ত করে নিলেন। ইনজুরি ও দীর্ঘ বিরতির পর টেস্ট ক্রিকেটে তার এই প্রত্যাবর্তন নির্বাচকদের আস্থার শতভাগ প্রতিদান দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের ইতিহাসে তার নাম আজ স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেল। তিন ফরম্যাটে জোড়া সেঞ্চুরির এই বিরল রেকর্ডটি ভবিষ্যতে যেকোনো অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারকে অনুপ্রাণিত করবে। নিউল্যান্ডসের এই ঐতিহাসিক সেঞ্চুরিটি কেবল জশ ইংলিসের ব্যক্তিগত অর্জনই নয়, বরং এটি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের বর্তমান ও ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন। মাঠে তার এই প্রত্যাবর্তন এবং রেকর্ড গড়ার গল্পটি আগামী দিনে বিশ্ব ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় আলোচনায় থাকবে বলে আশা করা যায়।