কেপটাউনের নিউল্যান্ডসে সিরিজের তৃতীয় ও অলিখিত ফাইনাল টেস্টের দ্বিতীয় দিনে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। হিন্দুস্তান টাইমস ক্রিকেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম ইনিংসে স্বাগতিকদের করা ৩২৯ রানের জবাবে দ্বিতীয় দিন শেষে নিজেদের প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া তুলেছে ৪ উইকেটে ৩৩০ রান। হাতে ছয় উইকেট অক্ষত রেখেই ইতিমধ্যে এক রানের লিড গড়ে তুলেছে সফরকারীরা। ব্যাটিংবান্ধব ও নিষ্প্রাণ উইকেটে স্বাগতিকদের কোনো সুযোগ না দিয়ে অনবদ্য ব্যাটিং প্রদর্শনী উপহার দিয়েছেন অজি মিডল অর্ডারের দুই ব্যাটার জশ ইংলিস ও উইকেটরক্ষক অ্যালেক্স ক্যারি।
দিনের শেষভাগে পঞ্চম উইকেট জুটিতে অবিচ্ছিন্ন ১৪৫ রান যোগ করে ম্যাচের পাল্লা অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঝুঁকিয়ে দেন ইংলিস ও ক্যারি। প্রথম দুই টেস্টে আঙুলের চোটের কারণে একাদশের বাইরে থাকা ইংলিস এই ম্যাচে সুযোগ পেয়েই চমৎকার আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলেন। মাঠের চারদিকে অসাধারণ সব শট খেলে মাত্র ১১১ বলে ৮৫ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। অপর প্রান্তে তাকে দারুণ সঙ্গ দেওয়া ক্যারি তুলে নেন সংযমী এক অর্ধশতক। দিন শেষে তিনি অপরাজিত আছেন ৫১ রানে। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের হতাশা বাড়িয়ে পুরো বিকেল সেশনটি অনায়াসেই পার করে দেন এই দুই অপরাজিত ব্যাটার।
দিনের শুরুর ভাগে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের ভিত গড়ে উঠেছিল ম্যাট রেনশ ও ট্রাভিস হেডের উদ্বোধনী জুটির ওপর ভর করে। দুই ব্যাটার সতর্কভাবে শুরু করে দলকে ৫৮ রানের সূচনা এনে দেন, যা চলতি সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ উদ্বোধনী রানের রেকর্ড। তবে এই জমাট জুটি ভাঙতে বেশি সময় নেননি অফ স্পিনার সাইমন হারমার। নিজের প্রথম ওভারের প্রথম বলেই ৪১ রান করা ট্রাভিস হেডকে বোল্ড করে সাজঘরের পথ দেখান তিনি, বলটি হেডের ব্যাটের কানায় লেগে সরাসরি স্টাম্পে আঘাত হানে।
হেডের বিদায়ের ঠিক পাঁচ বল পরেই আবারও অজি শিবিরে আঘাত হানেন হারমার। অভিজ্ঞ ব্যাটার মারনাস লাবুশানেকে কোনো রান না তোলার সুযোগ দিয়েই স্লিপে ক্যাচ বানিয়ে ফিরিয়ে দেন এই স্পিনার। মাত্র শূন্য রানে লাবুশানের বিদায়ের পর দ্রুত জোড়া ধাক্কা খেয়ে অস্ট্রেলিয়া কিছুটা চাপে পড়েছিল। তবে সেই বিপদ সামাল দিতে ক্রিজে এসে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ম্যাট রেনশ ও মারকুটে অলরাউন্ডার ক্যামেরন গ্রিন।
তৃতীয় উইকেট জুটিতে রেনশ ও গ্রিন যোগ করেন মূল্যবান ১২৬ রান। সতর্ক ব্যাটিংয়ের পরিচয় দিয়ে রেনশ ১৩৯ বলে ৭৪ রানের দারুণ এক ইনিংস উপহার দেন। অন্য প্রান্তে গ্রিন ছিলেন অনেকটাই সাবলীল ও আক্রমণাত্মক। কাগিসো রাবাদার টানা দুই বলে দুটি বিশাল ছক্কা হাঁকিয়ে নিজের আত্মবিশ্বাসের প্রমাণ দেন তিনি। ১১০ বলের ইনিংসে আটটি চার ও দুটি ছক্কার সাহায্যে ৬৫ রান করেন গ্রিন। এই দুজনের দৃঢ়তাপূর্ণ ব্যাটিং দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করে।
### জানসেনের জোড়া আঘাত ও ম্যাচের সমীকরণ
চা বিরতির ঠিক আগমুহূর্তে ম্যাচে নাটকীয় মোড় আনেন প্রোটিয়া বাঁহাতি পেসার মার্কো জানসেন। টানা তিন বলের ব্যবধানে এই অলরাউন্ডার তুলে নেন সেট হয়ে যাওয়া দুই ব্যাটার রেনশ ও গ্রিনকে। রেনশ একটি বাউন্স হওয়া ডেলিভারিতে ব্যাট চালিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। আম্পায়ার প্রথমে আউট না দিলেও সফল রিভিউ নিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। ঠিক পরের ওভারেই দ্বিতীয় স্লিপে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন উইকেটে জমে যাওয়া গ্রিন। এক লহমায় জোড়া উইকেট হারিয়ে কিছুটা ধাক্কা খায় সফরকারীরা।
তবে এই সংক্ষিপ্ত বিপর্যয়ের পর ম্যাচের রাশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে মোটেও দেরি করেননি ইংলিস ও ক্যারি। এর আগে মাঠের খবরের আর্কাইভ প্রতিবেদনে জানা গিয়েছিল, ঘাড়ের চোটের কারণে দ্বিতীয় টেস্ট খেলা অভিজ্ঞ স্টিভ স্মিথের জায়গায় একাদশে সুযোগ পেয়েছেন জশ ইংলিস। সেই সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে উইকেটে নেমেই ইতিবাচক ব্যাটিং শুরু করেন তিনি। প্রোটিয়া বোলারদের কোনো ছন্দ খুঁজে পেতে দেননি ইংলিস, আর অন্য প্রান্তে অভিজ্ঞ ক্যারির দায়িত্বশীল সংগ্রাহী ব্যাটিং দলকে স্বস্তিদায়ক লিডের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য এই দিনটি ছিল তীব্র অনুশোচনার। প্রথম দিনে ২০৩ রানে এক উইকেট হারিয়ে তারা যেখানে বিশাল স্কোরের স্বপ্ন দেখছিল, সেখান থেকে শেষ নয় উইকেটে মাত্র ১২৬ রান যোগ করে ৩২৯ রানে গুটিয়ে যাওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে তাদের। দ্বিতীয় দিনে নিউল্যান্ডসের উষ্ণ ও মেঘহীন আবহাওয়ায় ফ্ল্যাট ট্র্যাকে বল হাতে চরম সংগ্রাম করতে হয়েছে রাবাদা ও জানসেনদের। হারমার ও জানসেনের জোড়া শিকার ছাড়া স্বাগতিকদের বোলিং লাইনআপ ছিল পুরোপুরি ধারহীন।
সাম্প্রতিক সময়ে আইসিসি টেস্ট অলরাউন্ডার র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ওঠা মার্কো জানসেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়ে সাময়িক আশা জাগালেও বাকি বোলারদের ব্যর্থতায় তা স্থায়ী হয়নি। দিনের খেলা শেষে ক্যাঙ্গারু বাহিনী এখন পুরোপুরি চালকের আসনে। তৃতীয় দিনে অস্ট্রেলিয়া তাদের লিড কতটা বড় করতে পারে এবং প্রথম ইনিংসের রানের পাহাড় দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে কতটা চাপে ফেলতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই সিরিজ নির্ধারণী টেস্টের ভাগ্য।