হংকং সিক্সেস ২০২৬-এর গ্রুপ 'সি'-এর হাইভোল্টেজ ম্যাচে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে ৪ উইকেটে পরাজিত করেছে পাকিস্তান। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত এই রোমাঞ্চকর ম্যাচে ভারতের দেয়া ৮৯ রানের লক্ষ্যমাত্রায় ৪ ওভারের মধ্যেই পৌঁছে যায় পাকিস্তানি ব্যাটাররা। ভারতীয় ক্রীড়াভিত্তিক গণমাধ্যম 'স্পোর্টস্টার'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শশাঙ্ক সিংয়ের অলরাউন্ড নৈপুণ্য সত্ত্বেও পাকিস্তানের বিধ্বংসী পাওয়ার হিটিংয়ের সামনে পরাস্ত হতে হয় মেন ইন ব্লু-দের।
টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন পাকিস্তান অধিনায়ক আব্বাস আফ্রিদি। ছয় ওভারের এই দ্রুতগতির ফরম্যাটে ব্যাটিংয়ে নেমে ভারতের সূচনাটা ছিল মিশ্র। আহমেদ ড্যানিয়ালের করা প্রথম ওভারে সাত রান তোলে ভারত। ওপেনার রাহুল ত্রিপাঠী কাভার অঞ্চল দিয়ে একটি দৃষ্টিনন্দন চার মারলেও ড্যানিয়ালের স্লোয়ার ডেলিভারিগুলোতে কিছুটা অস্বস্তিতে ছিলেন।
দ্বিতীয় ওভারে পাকিস্তান শিবিরে প্রথম সাফল্য এনে দেন মোহাম্মদ শাহজাদ। নিতীশ রানার ব্যাটের বাইরের কানায় লেগে বাউন্ডারি পাওয়ার পর ত্রিপাঠী পুল শট খেলার চেষ্টা করেন। ডিপ স্কয়ার লেগে আব্দুল সামাদের দুর্দান্ত ক্যাচে বিদায় নেন ৯ রান করা ত্রিপাঠী (৫ বল, ২ চার)। এরপর চার নম্বরে নেমে প্রথম তিন বলেই চার, ছয় ও ছয় হাঁকিয়ে ভারতের রান রেট বাড়িয়ে নেন শশাঙ্ক সিং। দুই ওভার শেষে ভারতের সংগ্রহ দাঁড়ায় ১ উইকেটে ৩৩ রান।
তৃতীয় ওভারে বোলিংয়ে আসেন পাকিস্তান অধিনায়ক আব্বাস আফ্রিদি। নিতীশ রানা আপার কাট খেলে প্রথম বলেই ছয় আদায় করে নেন। তবে এরপর লেগ সাইডে পর পর দুটি হাই ফুলটস ও ফ্রি-হিট পেলেও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি রানা। অফ কাটারে দারুণভাবে গতি কমিয়ে ওভারে ভারতকে আর রান তুলতে দেননি আফ্রিদি।
চতুর্থ ওভারে মোহাম্মদ ইরফান খানের ওপর চড়াও হন শশাঙ্ক সিং। পাঞ্জাব কিংসের এই তারকা স্ট্রেট ডাউন দ্য গ্রাউন্ডে পর পর দুটি দর্শনীয় ছক্কা হাঁকান। এরপর দুই রান নিয়ে ৫০ মিটারের বাউন্ডারি পার করে হাঁকান তৃতীয় ছক্কা। ওভারের শেষ বলে উইকেটরক্ষকের ওপর দিয়ে চোখধাঁধানো চারে ওভারটি শেষ করেন শশাঙ্ক।
পঞ্চম ওভারে আব্দুল সামাদের বোলিংয়ে নাটকীয় মোড় নেয় ম্যাচ। নিতীশ রানা লং অন দিয়ে ছয় মেরে অবসর (রিটায়ার্ড আউট) নেন, যাতে শেষ দিকে দ্রুত রান তোলা যায়। কিন্তু ড্রেসিংরুম থেকে নামা রাহুল তেওতিয়া (০) ও ভারতীয় অধিনায়ক ক্রুনাল পান্ডিয়াকে (০) পর পর দুই বলে আউট করে হ্যাটট্রিকের সুযোগ তৈরি করেন সামাদ। তেওতিয়া ক্যাচ দেন খাজা নাফেকে এবং ক্রুনাল আউট হন ইরফানের হাতে। শেষ ব্যাটার টি নটরাজন স্কয়ার লেগের পেছনে চার মেরে হ্যাটট্রিক বল সামাল দেন।
ষষ্ঠ ও শেষ ওভারে শশাঙ্ক সিং আউট হলেও হংকং সিক্সেসের বিশেষ নিয়ম অনুযায়ী নটরাজন 'লাস্ট ম্যান স্ট্যান্ডিং' হিসেবে ব্যাটিং চালিয়ে যান এবং শশাঙ্ক নন-স্ট্রাইকার রানার হিসেবে থাকেন। নটরাজন একটি চার ও এক রান নিয়ে ভারতের ইনিংস শেষ করেন। নির্ধারিত ৬ ওভারে ৫ উইকেটে ৮৮ রানের চ্যালেঞ্জিং সংগ্রহ দাঁড়ায় ভারত।
৮৯ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ওভারেই তাণ্ডব চালায় পাকিস্তান। ভারতের অধিনায়ক ক্রুনাল পান্ডিয়া প্রথম ওভার করতে এসে পরপর চার বলে চারটি বিশাল ছক্কা হজম করেন। পরের বলেও পাকিস্তানি ওপেনার ছক্কা হাঁকালে টানা পাঁচ ছক্কায় প্রথম ওভারেই উঠে আসে ৩০-এর বেশি রান, যা ভারতকে ম্যাচ থেকে একপ্রকার ছিটকে দেয়।
দ্বিতীয় ওভারে টি নটরাজন বোলিংয়ে এসে একটি 'নো-লুক' ছক্কা হজম করেন। খাজা নাফেকে আউট ভাবা হলেও নটরাজনের ওভারস্টেপিংয়ের কারণে আম্পায়ার নো-বল ডাকেন। ফ্রি-হিটে আরও চার রান যোগ করে পাকিস্তান নিজেদের সহজ জয়ের ভিত আরও মজবুত করে নেয়।
তৃতীয় ওভারে বল হাতে নিয়ে ভারতকে খানিকটা স্বস্তি এনে দেন শশাঙ্ক সিং। প্রথম বলেই বোলিংয়ে এসে তিনি বিপজ্জনক হয়ে ওঠা পাকিস্তান অধিনায়ক আব্বাস আফ্রিদিকে (৮ বলে ৩৫ রান, ১ চার, ৫ ছয়) নটরাজনের ক্যাচ বানিয়ে সাজঘরে ফেরান। তবে ওভারের শেষ বলে নতুন ব্যাটার আব্দুল সামাদ ছক্কা মেরে পাকিস্তানের জয় প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেন।
চতুর্থ ওভারে রাহুল তেওতিয়ার হাতে বল তুলে দেন ক্রুনাল। খাজা নাফে ম্যাচ শেষ করার তাড়াহুড়োয় আউট হলেও পরের বলেই চার মেরে দলকে ৪ উইকেটের মহাজয় এনে দেন মোহাম্মদ ইরফান খান।
### টুর্নামেন্টের প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান হংকং সিক্সেস টুর্নামেন্টটি ক্রিকেটের ঐতিহ্যবাহী ফরম্যাটগুলোর চেয়ে একদমই আলাদা। প্রতি দলে সাতজন খেলোয়াড় থাকেন এবং নির্ধারিত উইকেটরক্ষক ছাড়া বাকি ছয়জনকেই ১ ওভার করে বোলিং করতে হয়। স্পোর্টস্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৪ সালে ভারতের সাবেক অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি ২৩ বছর বয়সে এই টুর্নামেন্টে খেলেছিলেন, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ১০ বলে ২০ রান করেছিলেন তিনি।
চলতি ২০২৬ আসরে এর আগেই বড় স্কোরের রেকর্ড দেখা গেছে, যেখানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ১২৯ রান তাড়া করে জেতে শ্রীলঙ্কা, যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তাড়া। মাঠের খবরের ২৫ অক্টোবরের আর্কাইভ অনুযায়ী, সম্প্রতি টেস্ট দল ঘোষণা করা পাকিস্তানের এই জয়টি টুর্নামেন্টের গ্রুপ 'সি'-তে তাদের শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেল। অন্যদিকে প্রথম ম্যাচে হেরে যাওয়া ভারতকে টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে পরের ম্যাচগুলোতে ঘুরে দাঁড়াতে হবে।