### নাথান লায়নের অভিজাত রেকর্ড ক্লাবে হাসান মাহমুদ
২০২৬ সালের ৬ নভেম্বর সিলেটের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে দুর্দান্ত এক বোলিং স্পেল উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশের ২৬ বছর বয়সী ডানহাতি পেসার হাসান মাহমুদ। ৯০ রান খরচায় ৬ উইকেট নিয়ে সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজকে প্রথম ইনিংসে ৩৫৬ রানে গুটিয়ে দিতে মূল ভূমিকা পালন করেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিষয়ক গণমাধ্যম ক্রিকট্যাকার-এর তথ্য অনুযায়ী, এই ৬ উইকেটের অর্জনের মাধ্যমে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ান অফস্পিনার নাথান লায়নের পর দ্বিতীয় বোলার হিসেবে পাঁচটি ভিন্ন দেশে পাঁচ উইকেট নেওয়ার এক অনন্য ও অভিজাত রেকর্ডে নাম লেখালেন হাসান মাহমুদ।
টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি হাসানের পঞ্চমবার ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার ঘটনা এবং দ্বিতীয়বার ইনিংসে ছয় উইকেট পাওয়ার নজির। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এটি দেশের মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে হাসানের প্রথম ফাইফার, যা সিলেটের মাটিতে তার এই অর্জনকে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসে হাসানের বোলিংয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মোড় দেখা যায়। ইনিংস জুড়ে দুর্দান্ত ব্যাটিং করে ১৩৩ রান করা আমির জাঙ্গুকে ফিরিয়ে বড় ব্রেকথ্রু দেন হাসান। এছাড়া রোস্টন চেইসকে গোল্ডেন ডাকের স্বাদ পাইয়ে দেন তিনি। ম্যাচের এক পর্যায়ে জশুয়া বিশপের বিরুদ্ধে একটি এলবিডব্লিউর আবেদন আম্পায়ার আউট দিলে রিভিউতে দেখা যায় বল প্যাডে লাগার আগে ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগেছে, যার ফলে সিদ্ধান্তটি বাতিল হয়। তবে পরবর্তীতে বিশপকেই অদ্ভুত এক রেকর্ড গড়ে সাজঘরে পাঠান হাসান। উইকেটরক্ষক লিটন দাসের হাতে বিশপ স্টাম্পড হলে বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে স্টাম্পিংয়ের মাধ্যমে উইকেট নেওয়ার রেকর্ড গড়ে ফেলেন এই তরুণ তুর্কি।
সিলেট টেস্টের প্রেক্ষাপটে হাসানের এই পারফরম্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর আগে গত ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে মাঠের খবর-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, টেস্টের প্রথম দিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৭ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ার পর আমির জাঙ্গুর অপরাজিত ১১১ এবং অভিষিক্ত কেভিন উইকহামের ৬১ রানের সুবাদে ৪ উইকেটে ২৩৫ রান তুলে ঘুরে দাঁড়ায়। প্রথম দিনে তাসকিন আহমেদ ও হাসান মাহমুদ দুটি করে উইকেট পেলেও বাংলাদেশের তিন স্পিনার ৪২ ওভার বল করে কোনো উইকেটের দেখা পাননি। দ্বিতীয় দিনে হাসানের মারমুখী ও নিয়ন্ত্রিত স্পেলের কারণেই শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস ৩৫৬ রানে থামিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
### পাঁচ দেশে ফাইফারের মাইলফলক ও ঐতিহাসিক তুলনা
বিশ্বের পাঁচটি ভিন্ন দেশে পাঁচ উইকেট শিকারের এই বিরল মাইলফলক হাসিল করার যাত্রাটি হাসানের জন্য ছিল অত্যন্ত ধারাবাহিক। ২০২৪ সালে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৪৩ রানে ৫ উইকেট নিয়ে তার এই অসাধারণ অভিযাত্রার সূচনা ঘটেছিল। সেই বছরই ভারতের চেন্নাইয়ে ভারতের বিপক্ষে ৮৩ রানে ৫ উইকেট শিকার করেন তিনি। এরপর ২০২৬ সালে তিনটি ভিন্ন দেশে তিনটি ফাইফার নিজের ঝুলিতে পুরেন এই স্পিডস্টার। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পথে ৫৫ রানে ৬ উইকেট পান হাসান। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ৫৫ রানে ৫ উইকেট শিকার করেন তিনি। সর্বশেষে সিলেটের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৯০ রানে ৬ উইকেট নিয়ে নিজের পঞ্চম দেশে পাঁচ উইকেটের কোটা পূরণ করেন। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে একম্যাচের টেস্ট সিরিজে হ্যাটট্রিক করে বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে টেস্ট হ্যাটট্রিকের কীর্তিও গড়েছিলেন তিনি।
হাসান মাহমুদের এই কীর্তির আগে টেস্ট ইতিহাসে একমাত্র বোলার হিসেবে এই রেকর্ডটি এককভাবে ধরে রেখেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান অফস্পিনার নাথান লায়ন। ২০১১ সালে শ্রীলঙ্কার মাটিতে ৩৪ রানে ৫ উইকেট নিয়ে লায়নের এই যাত্রার শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে ৬৮ রানে ৫ উইকেট, ২০১৩ সালে ভারতে ৯৪ রানে ৭ উইকেট এবং মেলবোর্নে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৫০ রানে ৫ উইকেট শিকার করেন তিনি। সবশেষে ২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ১৩০ রানে ৫ উইকেট নিয়ে প্রথম বোলার হিসেবে পাঁচটি ভিন্ন দেশে ফাইফারের মাইলফলক অর্জন করেন লায়ন।
নাথান লায়নের রেকর্ডটি শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা—এই পাঁচ দেশের মাটিতে গঠিত হলেও হাসান মাহমুদ তার নামের পাশে যুক্ত করেছেন পাকিস্তান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাংলাদেশকে। ২০২৬ সালের ৬ নভেম্বর সিলেটে নাথান লায়নের পাশে নিজের নাম খোদাই করে হাসান মাহমুদ কেবল নিজেকে বাংলাদেশের পেস আক্রমণের নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ হিসেবেই প্রমাণ করেননি, বরং টেস্ট ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক ইতিহাসে নিজের স্থান স্থায়ী করে নিয়েছেন।