নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে পাঁচ ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ ওডিআই সিরিজ শুরুর আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় অধিনায়ক শুভমান গিল তারকা অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়ার জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তনের স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেছেন। ভারতীয় ক্রীড়া গণমাধ্যম ক্রিকট্রেকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩ নভেম্বর মঙ্গলবারের এই সংবাদ সম্মেলনে গিল পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, চোট কাটিয়ে জাতীয় দলে ফিরতে হলে পান্ডিয়াকে আগে ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় মাঠে নেমে পূর্ণাঙ্গ ম্যাচ ফিটনেস প্রমাণ করতে হবে।
বর্তমানে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যস্ত সূচির মুখোমুখি ভারত। ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এই পাঁচ ম্যাচের ওডিআই সিরিজ। এরপর ১৯ নভেম্বর থেকে শুরু হবে কিউইদের বিরুদ্ধে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ। সাম্প্রতিক সময়ে টি-টোয়েন্টি সিরিজে ভারতের জয় এসেছে। গত ১ নভেম্বর সেডন পার্কে সিরিজের পঞ্চম ম্যাচে সাত উইকেটের পরাজয় সত্ত্বেও নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩-২ ব্যবধানে টি-টোয়েন্টি সিরিজ নিশ্চিত করেছিল ভারত। তবে ওডিআই সিরিজের আগে ড্রেসিংরুমের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হার্দিক পান্ডিয়ার শারীরিক অবস্থা এবং দল থেকে তাঁর অনুপস্থিতি। আইপিএলের পর থেকে পিঠের স্পাজমসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগে বর্তমানে তিনি বিসিসিআই সেন্টার অফ এক্সিলেন্সে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন।
শুভমান গিল সংবাদ সম্মেলনে পান্ডিয়ার অসাধারণ ক্রিকেট দক্ষতা এবং ভারতীয় দলে তাঁর প্রভাবের কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন। গিল বলেন, "প্রথমত, হার্দিক পান্ডিয়া একজন দুর্দান্ত অলরাউন্ডার। বিশ্ব ক্রিকেটে তাঁর মতো স্কিলসেট খুব বেশি ক্রিকেটারের নেই। বোলার হিসেবে খেলার বিভিন্ন ধাপে তাঁকে ব্যবহার করা যায়। তিনি নতুন বল এবং পুরনো বল—উভয় দিয়েই বোলিং করতে সক্ষম। তাঁর সঙ্গে আমাদের একাধিকবার কথা হয়েছে।"
ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক এরপর পান্ডিয়ার ইনজুরি দুর্ভাগ্য এবং পুনর্বাসন নিয়ে কথা বলেন। গিল যোগ করেন, "ইনজুরির দিক থেকে তিনি কিছুটা দুর্ভাগা। আইপিএলের পর থেকে তিনি আর কোনো ম্যাচ খেলেননি। আশা করছি, তিনি দ্রুতই ফিরে আসবেন। তিনি কিছু ঘরোয়া ক্রিকেট খেলবেন এবং আমরা তাঁকে আবার দ্রুতই ভারতীয় দলে দেখতে পাব।"
ভারতীয় সীমিত ওভারের দলে পান্ডিয়ার ভূমিকা অপরিহার্য। তিনি ওডিআই ব্যাটিং অর্ডারে সাধারণত ৭ বা ৮ নম্বরে ব্যাট করতে নামেন, যেখানে ইনিংসের শেষ মুহূর্তে ঝোড়ো গতিতে রান তোলার দায়িত্ব থাকে তাঁর কাঁধে। পাশাপাশি নতুন বলে সুইং করানো কিংবা ডেথ ওভারে কার্যকর বোলিং করার দক্ষতা তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। ২০২৭ সালের ওডিআই বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ভারত যে দূরদর্শী পরিকল্পনা সাজাচ্ছে, সেখানে হার্দিক পান্ডিয়ার উপস্থিতি অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়।
### ইনজুরির দীর্ঘ তালিকা এবং ঘরোয়া ক্রিকেটের চ্যালেঞ্জ
হার্দিক পান্ডিয়ার সাম্প্রতিক ফিটনেস লড়াইয়ের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ২০২৬ সালের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) চলাকালীন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে খেলার সময় পিঠের স্পাজমের কারণে তিনি তিনটি ম্যাচ মিস করেন। গত ২৪ মে তিনি শেষবারের মতো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে মাঠে নেমেছিলেন। এরপর জুন মাসে পুনর্বাসন চলাকালে কুঁচকির (কোয়াড্রিসেপস) চোটে পড়ে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ওডিআই সিরিজ থেকে ছিটকে যান। এই চোটের ক্রমিক প্রভাবেই তিনি পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওডিআই সিরিজেও অংশ নিতে পারেননি।
পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষ করে মাঠে ফেরার প্রস্তুতির সময় আবারও ধাক্কা খান এই তারকা অলরাউন্ডার। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজের আগে ফিল্ডিং ড্রিল করার সময় তাঁর হাঁটুতে ব্যথা দেখা দেয়। সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়া এ দলের বিরুদ্ধে একদিনের সিরিজের জন্য ভারত এ দলে তাঁকে ফিটনেস সাপেক্ষে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং অক্টোবরে মাঠে ফেরার আশা করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে স্ক্যানে তাঁর ডান পায়ের শিন বোন বা নলাস্থিতে চোট ধরা পড়ে। চিকিৎসকরা তাঁকে অন্তত দুই সপ্তাহের পূর্ণ বিশ্রামের পরামর্শ দেওয়ায় তিনি সেই সফর হাতছাড়া করেন।
এরপর নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের টি-টোয়েন্টি সিরিজেও খেলা হয়নি তাঁর। এই ধারাবাহিক চোটের কারণে জাতীয় নির্বাচকরা এখন শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে তাঁকে জাতীয় দলে ফেরাতে চান না। ফলে ঘরোয়া টুর্নামেন্টেই নিজের পারফরম্যান্স ও ফিটনেস প্রমাণ করতে হবে বরোদার এই অলরাউন্ডারকে। আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফি এবং বিজয় হাজারে ট্রফি পান্ডিয়ার জন্য জাতীয় দলের দরজা পুনরায় খোলার একমাত্র কার্যকর মঞ্চ।
ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেকে নতুন করে প্রমাণের এই পথে ভারতীয় দলের অভিজ্ঞদেরও পাশে পাচ্ছেন পান্ডিয়া। গত ১ নভেম্বর পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিজ্ঞ ওপেনার রোহিত শর্মা শ্রীলঙ্কা সিরিজের পর ২০২৬-২৭ বিজয় হাজারে ট্রফিতে মুম্বাইয়ের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে, নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ৩-২ ব্যবধানে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়ের পর জাতীয় দলের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর দলীয় সমন্বয়ের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। রোহিত ও গম্ভীরের মতো অভিজ্ঞদের এই বার্তা হার্দিকের জন্যও প্রযোজ্য—জাতীয় দলে ফিরতে ম্যাচ অনুশীলনের বিকল্প নেই।
নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া ওডিআই সিরিজে পান্ডিয়াকে ছাড়াই মাঠে নামবে ভারত। পাঁচ ম্যাচের এই সিরিজ শেষ হওয়ার পর ১৯ নভেম্বর থেকে অনুষ্ঠিত হবে দুটি টেস্ট। এই সময়ে সৈয়দ মুশতাক আলী ও বিজয় হাজারে ট্রফিতে বরোদার হয়ে পান্ডিয়ার পারফরম্যান্স এবং বোলিং ফিটনেসের ওপরই নির্ভর করবে ২০২৭ বিশ্বকাপ যাত্রায় তাঁর জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তনের সময়সীমা।