ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ শেষ হয়েছে সফরকারী ভারতের ৩-২ ব্যবধানের জয়ের মধ্য দিয়ে। প্রথম তিন ম্যাচে টানা জয় অর্জন করে সিরিজ নিজেদের পকেটে পুরলেও শেষ দুটি ম্যাচে ভারতের বোলিং আক্রমণকে পুরোপুরি দিশেহারা করে ছেড়েছেন নিউজিল্যান্ডের ডানহাতি মিডল-অর্ডার ব্যাটার গ্লেন ফিলিপস। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দ্বিপাক্ষিক সিরিজে ভারত জয় পেলেও গ্লেন ফিলিপসের ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ও আগ্রাসী ব্যাটিং ভারত শিবিরের উদযাপনে কিছুটা হলেও উদ্বেগের ছায়া ফেলেছে।
পুরো সিরিজজুড়ে পাঁচ ম্যাচের চারটিতেই ম্যাচ-সংজ্ঞায়িত ভূমিকা পালন করেছেন ফিলিপস। তিনি ৫টি ইনিংসে অবিশ্বাস্য ১১৩.৬৭ গড় এবং ১৮৫.৩৩ স্ট্রাইক রেটে মোট ৩৪১ রান সংগ্রহ করেছেন। এর মাধ্যমে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে যেকোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে ইংল্যান্ডের ফিল সল্টের পূর্ববর্তী রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়েছেন ফিলিপস। এই সিরিজে একটি শতক এবং তিনটি অর্ধশতকের সাহায্যে তিনি ভারতীয় বোলারদের ওপর একক আধিপত্য বিস্তার করেন।
সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচ থেকেই গ্লেন ফিলিপসের রান ক্ষুধা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ড যখন ৮০ রানে ২ উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়েছিল, তখন উইকেটে এসেই তাণ্ডব শুরু করেন ফিলিপস। তিনি মাত্র ৪০ বলে ৮২ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে দলকে ২২৫ রানের বিশাল সংগ্রহের দিকে নিয়ে যান। যদিও সেই ম্যাচে জয় পেয়েছিল ভারত, কিন্তু ফিলিপসের ধ্বংসাত্মক রূপ তখনই প্রকাশ পায়।
দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ড আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। ম্যাচের তৃতীয় ওভারে মাত্র ১৮ রানে ২ উইকেট হারিয়ে তারা যখন কাঁপছিল, তখন ফিলিপস ব্যাট হাতে হাল ধরেন। তিনি ৪৩ বলে ৭০ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন এবং জ্যাকবসের সঙ্গে ১১৬ রানের কার্যকরী জুটি গড়ে নিউজিল্যান্ডের স্কোর ১৮০/৫-এ উন্নীত করেন। তবে ফিলিপসের এই লড়াকু ইনিংস সত্ত্বেও প্রথম দুটি ম্যাচ জিতে নেয় ভারতীয় দল।
### রেকর্ড গড়া শতক ও ব্ল্যাকক্যাপসদের প্রত্যাবর্তন
সিরিজের তৃতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচটিই ছিল একমাত্র খেলা যেখানে ফিলিপস ৫০ রানের গণ্ডি পার হতে ব্যর্থ হন। ভারতীয় দল এই ম্যাচটি জিতে নিয়ে সিরিজের প্রথম তিন ম্যাচেই জয় নিশ্চিত করে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে সিরিজ জয় নিশ্চিত করে। তবে এই হারের পর চতুর্থ টি-টোয়েন্টিতে গ্লেন ফিলিপস তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা এবং দৃষ্টিনন্দন ইনিংস উপহার দেন। মাত্র ৪৯ বলে ১০৭ রান সংগ্রহ করে তিনি নিউজিল্যান্ডকে ২০ ওভারে ২৫৯/৭ রানের পাহাড়সম স্কোরে পৌঁছে দেন। এই ম্যাচে নিউজিল্যান্ড তাদের সিরিজের প্রথম জয় তুলে নেয়। মাঠের খবরের আর্কাইভ অনুযায়ী (৩০ অক্টোবর ২০২৬), সেই চতুর্থ ম্যাচে ভারী পরাজয় সত্ত্বেও ভারতের বাঁহাতি পেসার আরশদীপ সিং এক পঞ্জিকাবর্ষে পূর্ণ সদস্য দেশের বোলারদের মধ্যে টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ উইকেটের ব্যক্তিগত কীর্তি গড়েছিলেন।
হ্যামিল্টনের সেডন পার্কে অনুষ্ঠিত রোববার সিরিজের পঞ্চম ও শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে নিউজিল্যান্ড টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভারতকে ২০ ওভারে ১৯১/৮ রানে আটকে ফেলে। ১৯২ রানের জয়ের লক্ষ্যে খেলতে নেমে নিউজিল্যান্ডের সূচনা খুব একটা বিধ্বংসী ছিল না। তবে ওপেনার টিম সাইফার্ট ৫০ বলে ৯৩ রানের চমৎকার ইনিংস খেলে ভিত্তি স্থাপন করেন। এরপর ফিলিপস উইকেটে এসে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেন। ফিলিপস ৩৮ বলে ৬৫ রানের অপরাজিত ঝোড়ো ইনিংস খেলে ৭ উইকেটের বড় জয় নিশ্চিত করেন এবং ১২ বল বাকি থাকতেই দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন।
### পরিসংখ্যানের তফাত ও সিরিজের সমীকরণ
সিরিজের রান সংগ্রাহকদের তালিকায় গ্লেন ফিলিপসের প্রভাব কতটা ছিল, তা বোঝা যায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের পরিসংখ্যান দেখলে। এই সিরিজে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন ভারতের অভিষেক শর্মা, যিনি ৫ ম্যাচে মোট ১৯৭ রান করেছিলেন। ফিলিপস এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যকার রানের তফাত ছিল ১৪৪ রানের বিশাল ব্যবধান। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে পুরো সিরিজজুড়ে ফিলিপস অন্য উচ্চতায় ব্যাটিং করেছেন।
মাঠের খবরের পূর্ববর্তী প্রতিবেদন (১ নভেম্বর ২০২৬) অনুযায়ী, ৩-২ ব্যবধানে সিরিজ ট্রফি জেতার পর ভারতের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর স্বীকার করেছেন যে সব ফরম্যাটে জাতীয় দল পরিচালনা করার মানসিক ক্লান্তি রয়েছে, তবে অনভিজ্ঞ বোলিং আক্রমণ নিয়ে অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ারের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন তিনি। পঞ্চম ম্যাচে হারের পর গম্ভীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা দেন যে ভারতীয় দল একটি দল হিসেবে তৈরি হয়েছে এবং দল হিসেবেই জয় অর্জন করেছে। সিরিজ হাতছাড়া হলেও কিউইদের জন্য গ্লেন ফিলিপসের এই ঐতিহাসিক ও রাজকীয় ফর্মই সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।