আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চকে বিদায় জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার তারকা অলরাউন্ডার গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যম 'দ্য গার্ডিয়ান'-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে ৩৮ বছর বয়সী এই বিস্ফোরক ব্যাটারের বর্ণাঢ্য কিন্তু কিছুটা অসমাপ্ত আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে স্মরণ করা হয়েছে। ঘরের মাঠে বা সফরকারী হিসেবে আসন্ন ইংল্যান্ড সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার টি-টোয়েন্টি দলে সুযোগ না পাওয়ার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এবং ভিক্টোরিয়ার হয়ে ৫০ ওভার ও চার দিনের প্রথম শ্রেণির ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি। এর আগে গত ৩ নভেম্বর 'মাঠের খবর'-এর এক প্রতিবেদনেও তার এই বিদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল। তিনবারের বিশ্বকাপ জয়ী এই অলরাউন্ডারের পেছনে রেখে যাওয়া ট্রেইল অফ ডেস্ট্রাকশনের মধ্যে সেরা ছয়টি ইনিংস নিয়ে সাজানো হয়েছে এই বিশেষ পর্যালোচনা।
অসাধারণ হ্যান্ড-আই কোঅর্ডিনেশন, উদ্ভাবনী শট খেলার দক্ষতা এবং মাঠের ৩৬০ ডিগ্রি জুড়ে চার-ছক্কার বৃষ্টি নামানোর ক্ষমতায় ম্যাক্সওয়েল ছিলেন অনন্য। দেশের হয়ে সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে এবং বিশ্বমঞ্চে নিজের সেরাটা উজাড় করে দেওয়াই ছিল তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দ্য গার্ডিয়ানের মূল্যায়নে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারজুড়ে খেলা সেরা ছয়টি ক্লাসিক ইনিংস নিচে তুলে ধরা হলো:
### গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের সেরা ছয় বিধ্বংসী ইনিংস
১. ২০১* বনাম আফগানিস্তান (মুম্বাই, ২০২৩ ওডিআই বিশ্বকাপ): ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ২৯২ রানের জয়ের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ৯১ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যয়ে পড়েছিল অস্ট্রেলিয়া। ড্রেসিংরুমে যখন বিদায়ের ঘণ্টা বাজছিল, তখন অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে সঙ্গে নিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম অবিশ্বাস্য এক ইনিংস খেলেন ম্যাক্সওয়েল। মারাত্মক ক্র্যাম্পের কারণে হাঁটতে না পেরে ক্রিজে দুই পা স্থির রেখেও ১২৮ বলে ২১টি চার ও ১০টি ছক্কায় ২০১ রানের অনবদ্য অপরাজিত ইনিংস উপহার দেন তিনি। এর মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া অবিশ্বাস্যভাবে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে এবং শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয়।
২. ১৪৫* বনাম শ্রীলঙ্কা (পাল্লেকেলে, সেপ্টেম্বর ২০১৬): টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ওপেন করতে নেমে শ্রীলঙ্কার বোলারদের ওপর তান্ডব চালান ম্যাক্সওয়েল। ৬৫ বলে ১৪টি চার ও ৯টি ছক্কার সাহায্যে ১৪৫ রানের মারকুটে ইনিংস খেলেন তিনি। ফিফটি পূর্ণ করেছিলেন মাত্র ২৭ বলে এবং পরবর্তী ২২ বলে পৌঁছে যান শতকে। অস্ট্রেলিয়া ২৬৩ রান সংগ্রহ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের তৎকালীন সর্বোচ্চ দলগত স্কোরের রেকর্ড স্পর্শ করেছিল।
৩. ১০৪ বনাম ভারত (রাঁচি, ২০১৭ টেস্ট): সব ধরনের টেস্ট ম্যাচ না খেললেও মাত্র ৭টি টেস্টের সংক্ষিপ্ত লাল বলের ক্যারিয়ারে তিনটি ফরম্যাটেই সেঞ্চুরি করা ছয়জন অস্ট্রেলীয় ব্যাটারের একজন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন ম্যাক্সওয়েল। ভারতের বিপক্ষে রাঁচি টেস্টে অত্যন্ত ধৈর্যশীল ব্যাটিংয়ের পরিচয় দিয়ে ১৮৫ বলে ১০৪ রান করেন তিনি। এটিই ছিল লাল বলের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার প্রথম ও একমাত্র শতক।
৪. ১০২ বনাম শ্রীলঙ্কা (সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড, ২০১৫ ওডিআই বিশ্বকাপ): সিডনিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মাত্র ৫১ বলে সেঞ্চুরি হাঁকান তিনি, যা তৎকালীন ওয়ানডে ইতিহাসে অজিদের পক্ষে দ্রুততম এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড ছিল। ১০টি চার ও ৪টি ছক্কায় ১০২ রানের এই বিধ্বংসী ইনিংসটি দলকে বড় জয় এনে দেয় এবং সে বছর অজিদের ওডিআই বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৫. ১০০ বনাম নেদারল্যান্ডস (নতুন দিল্লি, ২০২৩ ওডিআই বিশ্বকাপ): নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ৪১তম ওভারে উইকেটে এসে মাত্র ৪০ বলে সেঞ্চুরি হাঁকান ম্যাক্সওয়েল, যা ওয়ানডে বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্রুততম শতকের রেকর্ড গড়ে। ৪৮তম ওভার শেষে ৭৫ রানে থাকা ম্যাক্সওয়েল বাস ডি লিডের এক ওভারেই দুটি চার ও দুটি ছক্কা মেরে এবং শেষ পর্যন্ত নো-বলে হুক শটে সেঞ্চুরি স্পর্শ করেন।
৬. ১২০* বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ (অ্যাডিলেড ওভাল, ২০২৪ টি-টোয়েন্টি): ২০২৪ সালের শুরুতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে মাত্র ৫০ বলে শতক পূর্ণ করে ৮টি ছক্কায় ৫৫ বলে ১২০ রান করেন ম্যাক্সওয়েল। এটি ছিল আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তার পঞ্চম শতক, যার মাধ্যমে তিনি ভারতীয় কিংবদন্তি ব্যাটার রোহিত শর্মার সর্বোচ্চ টি-টোয়েন্টি শতকের রেকর্ডে ভাগ বসান। উল্লেখ্য, রোহিত শর্মাও সম্প্রতি বিজয় হাজারে ট্রফিতে খেলার ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় রয়েছেন (১ নভেম্বর ২০২৬-এ 'মাঠের খবর'-এ প্রকাশিত)।
### আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান ও প্রভাব
পরিসংখ্যান বলছে, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল অস্ট্রেলিয়ার সর্বকালের সেরা প্রভাবশালী ম্যাচ-উইনারদের একজন। অজিদের ২০১৫ ওডিআই বিশ্বকাপ, ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং ২০২৩ ওডিআই বিশ্বকাপ জয়ে সরাসরি ভূমিকা ছিল তার। যদিও ক্রিকেট বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশের মতে, তার অপার সম্ভাবনা ও লাল বলের ক্রিকেটের আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গি সময়ের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও টেস্ট ক্রিকেটে তার পুরোটা পায়নি দল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিলেও লিগ ক্রিকেটে তার বিধ্বংসী রূপ আরও কিছুদিন উপভোগ করতে পারবেন ক্রিকেট সমর্থকেরা।