২০২৬ সালের ৪ নভেম্বর অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে ভারতীয় পেস আক্রমণভাগে নিজের সামর্থ্যের জোরালো প্রমাণ দেন বাঁ-হাতি পেসার অর্শদীপ সিং। ক্রিকেটভিত্তিক ওয়েবসাইট ক্রিকট্র্যাকারের তথ্য অনুযায়ী, এই ম্যাচে তিনি মাত্র ৭০ রান খরচ করে তুলে নেন গুরুত্বপূর্ণ চারটি উইকেট। তার এই ধারালো বোলিংয়ের সুবাদেই স্বাগতিক নিউজিল্যান্ড দল মাত্র ১৮৫ রানে গুটিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিউই ইনিংসের স্থায়িত্ব ছিল মোটে ৪০.২ ওভার। ম্যাচটিতে প্রথম থেকেই নিজের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের দ্যুতি ছড়িয়েছেন অর্শদীপ, যা ভারতীয় দলের বোলিং ইউনিটকে শক্ত অবস্থানে পৌঁছে দেয়।
নিউজিল্যান্ডের ইনিংসে অর্শদীপের শিকার হওয়া চার ব্যাটারের তালিকায় ছিলেন উইল ইয়ং, হেনরি নিকোলস, কাইল জেমিসন এবং গ্লেন ফিলিপস। এই ব্যাটারদের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সাজঘরে ফিরিয়ে দিয়ে তিনি নিজের চার উইকেটের কোটা পূর্ণ করেন। তার এই বোলিং পারফরম্যান্স তাকে ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে একটি বিশেষ আসনে বসিয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি মোহাম্মদ শামি এবং জাভাগাল শ্রীনাথের পর মাত্র তৃতীয় ভারতীয় পেসার হিসেবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে ফরম্যাটে ইনিংসে চার উইকেট শিকারের কৃতিত্ব অর্জন করলেন।
শুধু তাই নয়, নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ওয়ানডে ম্যাচে ভারতীয় কোনো পেস বোলারের চতুর্থ সেরা বোলিং ফিগার হিসেবেও রেকর্ড বইয়ে জায়গা করে নিয়েছে অর্শদীপের ৪/৭০ রান। ইডেন পার্কের এই ম্যাচে বৃষ্টি বিঘ্নিত পরিস্থিতিতে ভারতের রান তাড়ার কাজ সহজ হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত Duckworth-Lewis-Stern বা ডিএলএস পদ্ধতিতে ম্যাচের ফয়সালা হয়। নির্ধারিত লক্ষ্য কিছুটা সংশোধিত হয়ে দাঁড়ায় ৩২ ওভারে ১৪৩ রান। সেই পরিবর্তিত লক্ষ্য অর্জনে ভারত পাঁচ উইকেট হাতে রেখেই এবং ওভার বাকি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যেই জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে।
ম্যাচ শেষে অর্শদীপের এই পারফরম্যান্স ভারতীয় ক্রিকেট মহলে ব্যাপক প্রশংস কুড়ায়, বিশেষ করে ভারতের সাবেক অধিনায়ক সুনীল গাভাসকরের নজর কাড়ে তার নিখুঁত লাইন-লেন্থ ও সুইংয়ের ক্ষমতা। সনি স্পোর্টস নেটওয়ার্কে দেওয়া বক্তব্যে গাভাসকর এই বাঁ-হাতি পেসারের ভূয়সী প্রশংসা করে জানান যে, বল উভয় দিকেই সুইং করানোর অসাধারণ দক্ষতা তার রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে অর্শদীপের ইনসুইং এবং আউটসুইংয়ের এই মিশ্রণ ব্যাটারদের মনে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি করে, যার ফলে তারা বুঝতে পারেন না কোন বলটি কোন দিকে বাঁক নেবে।
সুনীল গাভাসকর আরও বলেন যে সেই ম্যাচে অর্শদীপের বোলিং লেংথ অত্যন্ত চমৎকার ছিল এবং লাইনও ছিল নিখুঁত। তার মতে, বাঁ-হাতি এই পেসার ডানহাতি ব্যাটারদের মিডল ও অফ স্টাম্প থেকে বল ড্রাইভ করতে বাধ্য করছিলেন এবং মাঝেমধ্যে বল ভেতরেও ঢুকিয়ে দিচ্ছিলেন। গত দুই থেকে তিন বছর ধরে অর্শদীপের ধারাবাহিক উন্নতি লক্ষ্য করে গাভাসকর একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন যে, সাদা বলের ক্রিকেটে যদি তিনি এত বেশি সুইং আদায় করতে পারেন, তবে লাল বলের টেস্ট ক্রিকেটে তিনি কতটুকু সুইং পেতে পারেন। এই সাদা বলের পারফরম্যান্সই তাকে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য বিবেচনায় নেওয়ার জোরালো দাবি তুলেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
### টেস্ট ক্রিকেটে বাঁ-হাতি পেসারের গুরুত্ব ও কৌশলগত লাভ
সুনীল গাভাসকরের পাশাপাশি ভারতের অভিজ্ঞ ব্যাটার এবং কলকাতা নাইট রাইডার্সের সাবেক অধিনায়ক অজিঙ্কা রাহানেও অর্শদীপ সিংকে দীর্ঘ ফরম্যাটের ক্রিকেটে দেখার পক্ষে নিজের জোরালো মতামত প্রকাশ করেছেন। ক্রিকট্র্যাকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাহানে টেস্ট ক্রিকেটে একজন বাঁ-হাতি সিমারের ট্যাকটিক্যাল বা কৌশলগত গুরুত্বের দিকটি বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। তার মতে, বাঁ-হাতি পেসারদের বোলিংয়ের অ্যাঙ্গেল বা কোণ ভিন্ন ধরনের হয়, যা প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
অজিঙ্কা রাহানে ব্যাখ্যা করেছেন যে টেস্ট ক্রিকেটে একজন বাঁ-হাতি সিমার থাকলে বোলিং আক্রমণে ভিন্ন বৈচিত্র্য আসে এবং বোলিংয়ের সময় যে রাফ বা ক্ষয়ে যাওয়া অংশ তৈরি হয়, তা দলের অফ স্পিনারদের জন্য দারুণ সহায়ক হয়। স্পিনাররা যখন সেই ফুটমার্ক বা পায়ের দাগের ওপর বল ফেলেন, তখন ব্যাটারদের বিপক্ষে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। রাহানের মতে, অর্শদীপের যে দক্ষতা এবং উইকেট শিকারের সহজাত ক্ষমতা সাদা বলের ক্রিকেটে দেখা গেছে, ঠিক একই ধরনের সামর্থ্য তার লাল বলের ক্রিকেটেও রয়েছে।
### ঘরোয়া ক্রিকেটে অর্শদীপের পরিসংখ্যান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
অর্শদীপ সিংকে টেস্ট দলে অন্তর্ভুক্ত করার এই জোরালো দাবিগুলোর পেছনে তার আন্তর্জাতিক সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের অভিজ্ঞতা এবং প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের পরিসংখ্যানও যথেষ্ট জোরালো ভিত্তি যোগ করছে। তিনি ইতোমধ্যে ভারতের হয়ে ১০৪টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং ১৯টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন, যা তার সীমিত ওভারের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছে। তবে এখন পর্যন্ত তিনি টেস্ট দলের ক্যাপ বা অভিষেক অর্জনে সফল হননি।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অর্শদীপের পরিসংখ্যানও বেশ নজরকাড়া। তিনি এখন পর্যন্ত ২৪টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলে শিকার করেছেন ৭৩টি উইকেট, যেখানে তার বোলিং গড় রয়েছে ৩০.৭১। অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তার এই সাম্প্রতিক চার উইকেট অর্জনের পর নির্বাচকদের টেবিলে এই প্রথম শ্রেণির পারফরম্যান্স এবং পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। সামনে ভারতের টেস্ট স্কোয়াড গঠনের প্রক্রিয়ায় এই বিষয়গুলো কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।