পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে টানা তিন ম্যাচে হেরে ছিটকে পড়ার পর আগামী বছরের ওয়ানডে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ফের নতুন সমীকরণের মুখে পড়েছে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল। গত ২৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত মাঠের খবরের পূর্ববর্তী প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ১৫৪ রানে ৯ উইকেট হারানোর পর শাদাব খানের অপরাজিত ১১৩ রান এবং হারিস রউফের সঙ্গে গড়ে ওঠা রেকর্ড ৮৯ রানের দশম উইকেট জুটিতে ভর করে ১ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয় ছিনিয়ে নেয় পাকিস্তান। ব্রিটিশ ক্রিকেট বিষয়ক সংবাদমাধ্যম উইজডেনের এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইংল্যান্ডের এই বিপর্যয় ও দলগত সমীকরণের একদম কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পেস অলরাউন্ডার স্যাম কারান—যিনি একই সঙ্গে দলের সবচেয়ে বড় সমস্যা এবং একমাত্র কৌশলগত সমাধান।
কাগজে-কলমে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের এই হতাশাজনক পরাজয়ে কারানের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স বেশ উজ্জ্বল দেখায়। দল মাত্র ৫২ রানে ৪ উইকেট হারানোর পর উইল জ্যাকসের সঙ্গে ৯৩ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ার পথে কারান ৪২ রান সংগ্রহ করেন। এরপর বোলিং হাতে ৮ ওভারে খরচ করেন মাত্র ৩২ রান, অর্থাৎ ওভারপ্রতি রান দেন ঠিক ৪.০০ করে। কিন্তু ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলের যখন উইকেট প্রয়োজন ছিল, তখন কারানের বোলিংয়ে কোনো ধার দেখা যায়নি।
পাওয়ারপ্লের পর মাঝের ওভারে ৪ ওভার বোলিং করার পর ৪০তম ওভারে যখন কারানকে আবার আক্রমণে আনা হয়, তখন পাকিস্তানের ৯টি উইকেট পড়ে গিয়েছিল। একপ্রান্তে সেট ব্যাটার শাদাব খান থাকলেও অন্যপ্রান্তের ১০ নম্বর ব্যাটারকে আউট করে দলকে জয় এনে দিতে একটি মাত্র জাদুকরী ডেলিভারির দরকার ছিল। কিন্তু পুরো স্পেলে কারান একবারের জন্যও সেই উইকেট শিকারি বলটি করতে পারেননি। উল্টো শাদাব ওভারের শেষদিকে অনায়াসে সিঙ্গেল নিয়ে স্ট্রাইক নিজের কাছে রাখেন, যাতে শেষ উইকেট হিসেবে নামা হারিস রউফকে ইংল্যান্ডের মূল উইকেট সংগ্রাহক গাস অ্যাটকিনসনের মুখোমুখি হতে না হয়।
### ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে বিদায় ও কারানের দ্বিমুখী সংকট
একটি মাত্র স্পেল দিয়ে কারানের ওয়ানডে ক্যারিয়ার বিচার করা সম্পূর্ণ ন্যায্য নয়। গ্রীষ্মের মৌসুমে ভারতের বিরুদ্ধে বা ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে ডেথ ওভারে তিনি কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের বিপক্ষে এই সিরিজ ও ইংল্যান্ডের দল নির্বাচন এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যার ঠিক মাঝখানে পড়ে গেছেন কারান। জোফরা আর্চারকে বিশ্রাম দিয়ে গাস অ্যাটকিনসন, জশ টাং, সনি বেকার ও হেনরি ক্রোকোম্বকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলিয়েছে ইংলিশ টিম ম্যানেজমেন্ট। এর পাশাপাশি দ্বিতীয় ও তৃতীয় ওয়ানডেতে অভিজ্ঞ লেগস্পিনার আদিল রশিদকে একাদশের বাইরে রাখা আর্চারের অনুপস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
গতি ও নিয়ন্ত্রণের সমন্বয়ে ১০ ওভারের নির্ভরতা দেওয়া আর্চার এবং রহস্যময় স্পিনে উইকেট তোলার ক্ষমতা রাখা রশিদ—এই দুজনের অনুপস্থিতি ইংলিশ বোলিং আক্রমণের বিশ্বস্ততা ও কার্যকারিতা দুটিই কেড়ে নেয়। এই দুই প্রধান বোলারের অনুপস্থিতি কারানকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেয়। গ্রীষ্মে যখন তিনি স্বাধীনভাবে ওয়াইড স্লোয়ার কিংবা গতির বৈচিত্র্য ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছিলেন, তখন তিনি কার্যকর ছিলেন। কিন্তু রাওয়ালপিন্ডি বা গাদ্দাফির মতো ব্যাটিংবান্ধব ফ্ল্যাট উইকেটে অন্যপ্রান্ত থেকে চাপ তৈরি করার মতো বোলার না থাকলে কারানের এই বৈচিত্র্যময় বোলিং সহজেই সীমানার বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব।
কারানের ক্যারিয়ারে ইংল্যান্ড তাকে বারবার বেন স্টোকসের মতো বিকল্প অলরাউন্ডার হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে, যিনি দলের বিপদে ব্যাট ও বল হাতে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। কিন্তু কারান সেরকম খেলোয়াড় নন এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি তা হওয়ার চেষ্টাও করেননি। ২০২৪ সালের শেষে সাদা বলের দল থেকে বাদ পড়ার পর বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগে দুর্দান্ত পারফর্ম করে তিনি দলে ফেরেন। এরপর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে তাকে মিডল অর্ডার ব্যাটার ও পাওয়ারপ্লে স্পেশালিস্ট হিসেবে ওয়ানডে একাদশে ফেরানো হয়।
### বিশ্বকাপ সমীকরণ ও ইংলিশদের টেকটিক্যাল দ্বিধা
নিউজিল্যান্ডে জ্যাকব বেথেলের পাশাপাশি কারানকে পঞ্চম বোলার হিসেবে ব্যবহার করে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল ইংল্যান্ড। সেই ভুল শুধরাতে এই সিরিজে উইল জ্যাকসকে দ্বিতীয় অলরাউন্ডার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যাতে ব্যাটিং শক্তি না কমিয়ে ষষ্ঠ বোলিং অপশন পাওয়া যায়। তত্ত্বগতভাবে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ভুল এড়াতে কারান ও জ্যাকসের এই সমন্বয় বেশ কার্যকরী ছিল। কিন্তু বাস্তবতার চিত্র ভিন্ন।
বিগত এক বছরে ওয়ানডেতে পুনরায় সুযোগ পাওয়ার পর ব্যাটে-বলে কারানের পরিসংখ্যান বেশ হতাশাজনক। এই সময়ে তিনি ব্যাটিংয়ে গড়ে ১৭.৫ রান করেছেন এবং বোলিংয়ে প্রতি উইকেটের জন্য খরচ করেছেন ৪০.৩ রান। তার ব্যাটিং গড় ও বোলিং গড়ের পার্থক্য দাঁড়িয়েছে মাইনাস ২২.৮, যা গত এক বছরে কমপক্ষে ১০০ রান ও ১০টি উইকেট নেওয়া ক্রিকেটারদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।
পরিসংখ্যান দুর্বল হলেও কারানকে একাদশ থেকে বাদ দেওয়া ইংল্যান্ডের জন্য সহজ নয়। তাকে বাদ দিয়ে বাড়তি ব্যাটার খেলালে নিউজিল্যান্ড সিরিজের মতো বেথেলের ওপর ষষ্ঠ বোলার হিসেবে অতিরিক্ত নির্ভর করতে হবে। অন্যদিকে তাকে বাদ দিয়ে মূল পেসার খেলালে ব্যাটিং লাইনআপ ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, যা লিআম ডসন বা আদিল রশিদের মতো স্পিনারদের খেলাই জটিল করে তোলে। টি-টোয়েন্টি লিগের সাফল্যকে ওয়ানডেতে রূপান্তর করার আশায় ইংল্যান্ড কারানের ওপর প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। আর্চার দলে ফিরলে এবং রশিদের একাদশে নিয়মিত হওয়া নিশ্চিত হলে কারানের ওপর থেকে অতিরিক্ত চাপের বোঝা কমবে, যা তাকে আবার সফল করে তুলতে পারে। তবে চলতি সিরিজে যে দল গঠন করা হয়েছিল, তা কারানকে এমন এক মূল বোলারের ভূমিকায় ঠেলে দিয়েছে, যা তিনি যে নন তা ইংল্যান্ড দল আগেই খুব ভালোভাবেই জানত।