### নিয়োগ নীতিমালায় যুগান্তকারী বদল ও ইসিবির অবস্থান
ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) উচ্চপর্যায়ের কোচিং কাঠামোয় এক আমূল পরিবর্তনের সুর বেজে উঠল। জাতীয় দলের কোচ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এতদিন ধরে চালু থাকা বহু বিতর্কিত অথচ সংস্কারমূলক 'রুনি রুল' আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করেছে বোর্ড। ২০১৮ সাল থেকে কার্যকর থাকা এই বিধিমালার অধীনে জাতীয় পুরুষ ও নারী দলের প্রধান কোচ বা সহকারী কোচ নিয়োগের ক্ষেত্রে শর্টলিস্টে অন্তত একজন কৃষ্ণাঙ্গ, এশিয়ান বা অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘু ব্যাকগ্রাউন্ডের যোগ্য প্রার্থীকে রাখা এবং তাদের আনুষ্ঠানিক ইন্টারভিউ নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। তবে ইসিবি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের মেধা অন্বেষণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া অনেক বেশি গতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠায় আলাদা করে এই নিয়মের বাধ্যবাধকতার আর প্রয়োজন পড়ছে না।
বোর্ডের মুখপাত্র জানিয়েছেন, বর্তমান নিয়োগ ব্যবস্থার আওতায় 'টোকেনিজম' বা কেবল লোকদেখানো অন্তর্ভুক্তি পরিহার করে আরও গভীর ও স্বচ্ছ স্কাউটিংয়ের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। ইসিবির দাবি, বৈচিত্র্যময় কোচিং পুল গড়ে তুলতে তৃণমূল পর্যায় থেকেই সংখ্যালঘু কোচদের অভিজ্ঞতা ও লাইসেন্স বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করছে তারা। তবে হঠাৎ করে এই নীতি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি ব্রিটিশ ক্রীড়াঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন ইংলিশ ক্রিকেটে প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবৈষম্য দূর করার তাগিদ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।
### রুনি রুলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ইংলিশ ক্রিকেটে প্রয়োগ
মূলত ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফুটবল লিগে (এনএফএল) পিটসবার্গ স্টিলার্সের প্রয়াত কর্ণধার ড্যান রুনির উদ্যোগে এই নিয়মের সূচনা ঘটেছিল। উদ্দেশ্য ছিল শীর্ষপর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় কৃষ্ণাঙ্গ কোচদের সুযোগ নিশ্চিত করা। পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে নানা ক্রীড়া সংস্থা এই মডেলকে ইতিবাচক বৈষম্য দূরীকরণের অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে। ইসিবি যখন ছয় বছর আগে এটি কার্যকর করে, তখন লক্ষ্য ছিল সাদা চামড়ার বাইরে থাকা কোচদের সর্বোচ্চ স্তরের ক্রিকেট প্রশাসনের সামনে নিজেদের মেলে ধরার সমান ক্ষেত্র প্রস্তুত করা।
কিন্তু বিগত বছরগুলোতে টেস্ট দল কিংবা সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, ক্রিস সিলভারউড কিংবা ম্যাথু মটের মতো হাই-প্রোফাইল নিয়োগের ক্ষেত্রে এই রুনি রুল কতটা কার্যকরভাবে বজায় রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যমে একাধিকবার প্রশ্ন ওঠে। সমালোচকদের অভিমত ছিল, বোর্ডের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যখন আগেই পছন্দের প্রার্থী নির্ধারণ করে রাখা হয়, তখন কেবল আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার স্বার্থে অন্য ব্যাকগ্রাউন্ডের কোচদের ডেকে এনে 'সাজানো' ইন্টারভিউ নেওয়া উল্টো তাদের প্রতি অবিচার ও অসম্মান তৈরি করছিল।
### আইসিইসি রিপোর্টের ছায়া ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে অস্বস্তি
গত বছর প্রকাশিত ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমিশন ফর ইক্যুইটি ইন ক্রিকেট (আইসিইসি)-এর বিস্ফোরক প্রতিবেদন ইংলিশ কাউন্টি ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্ধকার দিকটি জনসমক্ষে উন্মোচন করেছিল। রিপোর্টে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ইংল্যান্ডের ক্রিকেট অভিজাততান্ত্রিক, যৌনবাদী এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্ণবাদী। সেই ধাক্কা সামলাতে যখন ইসিবি নানামুখী কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তখন কোচিং প্যানেল থেকে রুনি রুল বাতিলের পদক্ষেপ অনেকের কাছেই পিছুটান বলে মনে হচ্ছে।
সাবেক কৃষ্ণাঙ্গ ও সাউথ এশিয়ান ক্রিকেটারদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, প্রথম শ্রেণির কাউন্টি দলগুলোতে কৃষ্ণাঙ্গ কিংবা ব্রিটিশ-এশিয়ান সাবেক ক্রিকেটারদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলেও হেড কোচ বা ডিরেক্টর অব ক্রিকেটের মতো প্রভাবশালী চেয়ারগুলোতে বৈচিত্র্য প্রায় অনুপস্থিত। রুনি রুল পুরোপুরি বাদ দেওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় দলের ড্রেসিংরুমে কৃষ্ণাঙ্গ ও এশিয়ান কোচদের প্রবেশের সুযোগ আরও সঙ্কুচিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
### ভবিষ্যৎ নিয়োগ ও ড্রেসিংরুমের সমীকরণ
ইসিবি অবশ্য জোর দিয়ে বলছে, এই নীতি বাতিল মানে বৈচিত্র্যের লক্ষ্য থেকে সরে আসা নয়। বোর্ড এখন জাতীয় দল পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষায়িত ও গ্লোবাল কনসালটেন্সি নেটওয়ার্কের ওপর বেশি ভরসা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রেন্ডন ম্যাককালামকে লাল বলের পাশাপাশি সাদা বলের ফরম্যাটেও সমন্বিত কোচ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে পুরুষদের মূল জাতীয় দলে অদূর ভবিষ্যতে নতুন প্রধান কোচ নিয়োগের সুযোগ এমনিতেই সীমিত।
বোর্ডের নতুন রোডম্যাপ অনুযায়ী, জাতীয় দল ও ডেভেলপমেন্ট স্তরে প্রতিভা বাছাই প্রক্রিয়াকে স্বতঃস্ফূর্ত ও যোগ্যতাভিত্তিক কাঠামোর আওতায় আনা হবে, যেখানে কাউন্টি সার্কিট থেকে শুরু করে দ্য হান্ড্রেড টুর্নামেন্ট পর্যন্ত সব স্তরে সংখ্যালঘু কোচদের পথ প্রশস্ত করা হবে। তবে মাঠের বাস্তবতায় এই 'স্বতঃস্ফূর্ত' প্রক্রিয়া আসলেই সংখ্যালঘু কোচদের ইংল্যান্ডের ড্রেসিংরুমে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম করে তুলবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।