লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে এক অবিশ্বাস্য রান উৎসবের ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে ৫৫ রানে হারিয়ে নিজেদের ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের সফর শেষ করেছে ইংল্যান্ড। ব্রিটিশ দৈনিক 'দ্য গার্ডিয়ান'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে ক্যারিয়ার সেরা ১৬৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে ইংল্যান্ডের জয়ের ভিত গড়ে দেন বাঁহাতি ওপেনার বেন ডাকোট। পরবর্তীতে ৩৮৭ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নামা শ্রীলঙ্কাকে ৩৩১ রানে গুটিয়ে দিতে বল হাতে মূল ভূমিকা পালন করেন বাঁহাতি স্পিনার লিয়াম ডসন। এই জয়ে সিরিজের শেষ নিয়মরক্ষার ম্যাচটিতে সান্ত্বনার মুখ দেখল হ্যারি ব্রুকের দল।
শ্রীলঙ্কা আগেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শনিবারের বহুল প্রতিক্ষিত ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে রেখেছিল। তবে রাওয়ালপিন্ডিতে ৪৩০ রানের অবিশ্বাস্য লক্ষ্য তাড়া করে জয়ের ইতিহাস গড়া লঙ্কানরা লাহোরেও আরেক অলৌকিক জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। ৩৮৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে লঙ্কান মিডল অর্ডার ব্যাটার পবন রথনায়েকে ফের শতক হাঁকিয়ে ইংলিশ শিবিরে কাঁপন ধরিয়ে দেন। শেষ ১০ ওভারে শ্রীলঙ্কার প্রয়োজন ছিল ৮৭ রান, আর হাতে ছিল পর্যাপ্ত উইকেট। তবে আগের ম্যাচে অধিনায়ক হ্যারি ব্রুকের অনবদ্য ২০২ রানের ট্র্যাজিক পরিণতি থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার নিজেদের স্নায়ু ধরে রাখে ইংলিশ বোলাররা।
ম্যাচে টসে হেরে প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে ইংলিশ ওপেনার বেন ডাকোট ও টম ব্যান্টন শুরু থেকেই প্রতিপক্ষ বোলারদের ওপর চড়াও হন। লাহোরের পরিচিত উইকেটে ডাকোট ছিলেন দারুণ সাবলীল। ২৫ ওভারে ১৬৩ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়ে তোলেন তারা। ব্যান্টন তার ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ইনিংসে পঞ্চম অর্ধশতক তুলে নেন। তবে শাহানাকার বলে উইকেটের পেছনে পা ঠিকমতো না চলায় ৭৪ রানে বোল্ড হয়ে ফেরেন ব্যান্টন। অন্যপ্রান্তে ডাকোট তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের তৃতীয় শতক স্পর্শ করেন ৮৯ বলে। সেঞ্চুরির পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন তিনি; পরের ৫০ রান তুলতে তিনি খরচ করেন মাত্র ২৯ বল। গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে গত বছর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে করা ১৬৫ রানের ব্যক্তিগত রেকর্ডকে টপকে শেষ পর্যন্ত ১৬৭ রানে থামেন এই বাঁহাতি ব্যাটার।
### রেকর্ড সংগ্রহ ও লঙ্কানদের দুর্দান্ত লড়াই
তিন নম্বর পজিশনে নিজেকে প্রমোট করে অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক ৪৪ রান করে আউট হন। জো রুটকে ব্যাটিংয়ে নামার প্রয়োজনই পড়েনি, শেষ দিকে উইল জ্যাকস, জর্ডান কক্স ও স্যাম কারানের দ্রুতগতির ইনিংসে ভর করে ৫ উইকেটে ৩৮৬ রান তোলে ইংল্যান্ড। যা গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের ইতিহাসে ওয়ানডে ফরম্যাটে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ। শ্রীলঙ্কার পক্ষে আসিথা ফার্নান্দো ৬৩ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন।
৩৮৭ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শ্রীলঙ্কা মোটেও ভেঙে পড়েনি। সনি বাকারের বলে অভিষ্কা ফার্নান্দোর ক্যাচ ডিপ ফাইন লেগে ড্রপ হলেও দ্রুতই কামিন্দু মেন্ডিসকে আউট করেন বাকার। এরপর কুশল মেন্ডিস ও পবন রথনায়েকে দারুণ জুটি গড়ে দলকে জয়ের পথে রাখেন। কুশল মেন্ডিসের ব্যাটে জেসন রয় কিংবা গাস অ্যাটকিনসনের বোলিং বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ২৬ ওভারে ২ উইকেটে ১৭৭ রান তুলে শ্রীলঙ্কা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়।
অবস্থা বেগতিক দেখে ব্রুক বল তুলে দেন জো রুটের অফ-স্পিনে। রুট ৮৯ রানে থাকা কুশল মেন্ডিসকে উইকেটকিপার কক্সের ক্যাচে পরিণত করে গুরুত্বপূর্ণ ব্রেকথ্রু এনে দেন। তিন ওভার পর ডসনের লেগ-বিফোর সিদ্ধান্তের সফল রিভিউতে সাজঘরে ফেরেন লঙ্কান অধিনায়ক দাসুন শানাকা। তবে অন্যপ্রান্তে রথনায়েকে তার স্বভাবসুলভ নিচু হাতের ফ্লিকে একে একে চার-ছক্কার পসরা সাজিয়ে শতক পূরণ করেন (১১৮ রান)।
### ডসনের স্পিন জাদুতে ইংল্যান্ডের জয় ও সফর পর্যালোচনা
শেষ ১০ ওভারে যখন শ্রীলঙ্কার রান তাড়া হাতের নাগালে মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই বোলিংয়ে ফিরে অবিশ্বাস্য ঘুরে দাঁড়ায় ইংল্যান্ড। হেনরি ক্রোকম্বের ওভারে শাহান আরচ্চিগেকে লং-অনে ক্যাচ বানান ব্রুক। স্যাম কারানের বুদ্ধিদীপ্ত ফিল্ডিংয়ে রানআউট হন দুনিথ ওয়েল্লালাগে। ডসন তার শেষ ওভারে ফেরেন এবং লঙ্কানদের শেষ আশা রথনায়েকেকে শর্ট ফাইন লেগে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন। ডসন ৪৯ রান খরচায় ৪ উইকেট শিকার করে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন।
ম্যাচ শেষে ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক ডার্বিশায়ারের স্পিনার ডসনের ভূয়সী প্রশংসা করে দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, "আমি মোটেও নার্ভাস ছিলাম না। বোলারদের জন্য আমাদের স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল। দুই দিন আগের সেই তিক্ত হার থেকে ছেলেরা অনেক কিছু শিখেছে। যেভাবে তারা আজ ম্যাচটি শেষ করেছে, তা সত্যিই অসাধারণ।"
এই জয় ইংল্যান্ডের জন্য এক অদ্ভুত সফরের সমাপ্তি ঘটাল। সফরে জেতা ম্যাচ হাতছাড়া করার মতো দুটি ঘটনা ঘটার পর লাহোরের ৭০০ এর বেশি রানের এই হাই-স্কোরিং ম্যাচে ডসনের চার উইকেট ছিল সবচেয়ে বড় স্বস্তি। আগামী মাসে অস্ট্রেলিয়া সফরে দলে ফিরছেন জ্যাকব বেথেল। ব্যান্টনের সাম্প্রতিক ফর্ম ও ডাকোটের দুর্দান্ত ওপেনিং রসায়ন ইংল্যান্ডের টপ-অর্ডার নির্বাচনে ইতিবাচক এক মধুর সমস্যায় ফেলবে ম্যানেজমেন্টকে। অন্যদিকে, হারের পরও শনিবার লাহোরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ফাইনালের আগে আত্মবিশ্বাসী থাকবে শ্রীলঙ্কা।