অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট অধিনায়ক প্যাট কামিন্স এবং দুই তারকা পেসার মিচেল স্টার্ক ও জশ হ্যাজলউডকে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আসন্ন সীমিত ওভারের সিরিজে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে। গ্রীষ্মের ব্যস্ত মৌসুমে ১৪ সপ্তাহে ১০টি টেস্টের কঠিন সূচির কথা মাথায় রেখেই নির্বাচকরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ক্রিকেট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার ঘোষিত ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি—কোনো স্কোয়াডেই এই তিন অভিজ্ঞ পেসারকে রাখা হয়নি। দুটি সিরিজের জন্যই অলরাউন্ডার মিচেল মার্শকে অধিনায়ক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। দল দুটি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিনটি ওয়ানডে এবং পাঁচটি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলবে।
সামনে থাকা টেস্ট সূচির চাপ সামলাতেই সিনিয়র পেস ত্রয়ীকে বাইরে রাখার এই সিদ্ধান্ত। অস্ট্রেলিয়ার আসন্ন আন্তর্জাতিক সূচিতে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে চার টেস্টের সিরিজ, ভারতের বিরুদ্ধে হাই-ভোল্টেজ পাঁচ টেস্টের সিরিজ এবং পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ১৫০তম বার্ষিকী টেস্ট ম্যাচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতগুলো কঠিন ম্যাচ খেলার আগে কামিন্স, স্টার্ক ও হ্যাজলউডকে বিশ্রাম দিয়ে তাদের শারীরিক ফিটনেস এবং শক্তি পুনরুদ্ধারের পর্যাপ্ত সুযোগ করে দিচ্ছে দেশটির ক্রিকেট বোর্ড।
পেসারদের পাশাপাশি প্রধান ব্যাটারদের ওয়ার্কলোডও সতর্কতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করছে অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচক প্যানেল। জিম্বাবুয়ে এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় দীর্ঘ সফর শেষে আসা ট্রাভিস হেড, ম্যাথিউ রেনশ, জশ ইংলিস, কুপার কনোলি এবং অলরাউন্ডার ক্যামেরন গ্রিনকে টি-টোয়েন্টি সিরিজে দেখে-শুনে খেলানো হবে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফর শেষেই এই ক্রিকেটাররা সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ঢুকছেন, যার ফলে পার্থে টেস্ট ক্যাম্প শুরুর আগে তাদের শারীরিক ক্লান্তি দূর করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
ক্রিকেটারদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং শারীরিক চ্যালেঞ্জের বিষয়টি ফুটে উঠেছে দলের সাম্প্রতিক সফরেও। পূর্বে মাঠের খবর-এ ২০২৬ সালের ২৯ ও ৩০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে অনুষ্ঠিত টেস্টে আঙুলে ভাঙা নিয়ে ব্যাটিং করেই অনবদ্য ১০২ রানের সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন জশ ইংলিস। নিউল্যান্ডসের সেই ঐতিহাসিক সেঞ্চুরির মাধ্যমে তিনি টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি—তিন ফরম্যাটেই সেঞ্চুরি করা প্রথম অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে ইতিহাস গড়েন। আসন্ন টি-টোয়েন্টি সিরিজে তার কাজের চাপ নিয়ন্ত্রণ করার মূল উদ্দেশ্য হলো আসন্ন টেস্ট সিরিজের আগে তাকে শতভাগ ফিট রাখা।
দল নির্বাচন ও খেলোয়াড়দের কাজের চাপ প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাচক জর্জ বেইলি আন্তর্জাতিক সূচির কাঠিন্য তুলে ধরেন। বেইলি জানান, তাদের অলরাউন্ডার ও বহু-ফরম্যাটের খেলোয়াড়রা সরাসরি দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে দলকে শারীরিকভাবে প্রস্তুত রাখার জন্য খুব সংক্ষিপ্ত সময় পাওয়া যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, পার্থে টেস্ট দল একত্রিত হওয়া থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৫০তম বার্ষিকী টেস্ট শেষ হওয়া পর্যন্ত ক্রিকেটারদের ১০০ দিনেরও বেশি সময় বাইরে কাটাতে হবে, যার জন্য প্রতিটি খেলোয়াড়ের আলাদা শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন।
### নতুন মুখ ও স্কোয়াডের সমীকরণ
অভিজ্ঞদের অনুপস্থিতিতে দুটি ফরম্যাটেই তরুণদের সামনে নিজেদের প্রমাণের বড় সুযোগ এসেছে। অস্ট্রেলিয়া এ দলের হয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করার পর উদীয়মান পেসার মাহলি বিয়ার্ডম্যান এবার ওয়ানডেতে অভিষেকের অপেক্ষায় রয়েছেন। পূর্বে কেবল একটি টি-টোয়েন্টি খেলা এই তরুণকে সব ফরম্যাটের ভবিষ্যৎ তারকা হিসেবে দেখছেন নির্বাচকরা। পাশাপাশি, ঘরোয়া ক্রিকেট ও দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি—উভয় দলেই জায়গা করে নিয়েছেন নিউ সাউথ ওয়েলসের অলরাউন্ডার জ্যাক এওয়ার্ডস।
ওয়ানডে স্কোয়াডে ফিরেছেন বাঁহাতি পেসার স্পেন্সার জনসন এবং অলরাউন্ডার লিয়াম স্কট। তবে সাইড স্ট্রেইনের ইনজুরি পুরোপুরি সেরে না ওঠায় ওয়ানডে দলে জায়গা পাননি নাথান এলিস, যদিও তাকে টি-টোয়েন্টি দলে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, হোবার্ট হারিকেনসের তারকা ও অস্ট্রেলিয়ার বর্ষসেরা টি-টোয়েন্টি খেলোয়াড় টিম ডেভিডকে ঘিরে সাজানো হয়েছে কুড়ি ওভারের দল। ২০২৫ সালের পর প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি দলে ফিরেছেন আক্রমণাত্মক ওপেনার জেক ফ্রেজার-ম্যাকগার্ক। এছাড়া বিবিএল এবং ভারতে অস্ট্রেলিয়া এ দলের সফরে চমক দেখানো তরুণ ব্যাটার লাচলান শ প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি স্কোয়াডে ডাক পেয়েছেন।
### কৌশলগত লক্ষ্য ও সামনের পথচলা
সংক্ষিপ্ত ওভারের এই দল নির্বাচনের পেছনে ভবিষ্যৎ রূপরেখাও স্পষ্ট করেছে অস্ট্রেলিয়া। আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৭ আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপে শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্যেই এখন থেকে ওয়ানডে দল গড়ে তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে, ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক এবং পরবর্তী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকে মাথায় রেখে টি-টোয়েন্টি স্কোয়াডে তরুণদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
সামনের সিরিজে মিচেল মার্শের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের ওয়ানডে দলে থাকছেন জেভিয়ার বার্টলেট, মাহলি বিয়ার্ডম্যান, অ্যালেক্স কেয়ারি, কুপার কনোলি, জ্যাক এওয়ার্ডস, ক্যামেরন গ্রিন, ট্রাভিস হেড, জশ ইংলিস, স্পেন্সার জনসন, ওলি পিক, ম্যাথিউ রেনশ, লিয়াম স্কট ও অ্যাডাম জ্যাম্পা। টি-টোয়েন্টি দলে রয়েছেন মার্শ, বার্টলেট, বিয়ার্ডম্যান, নিখিল চৌধুরী, টিম ডেভিড, জোয়েল ডেভিস, এওয়ার্ডস, এলিস, ফ্রেজার-ম্যাকগার্ক, স্যাম হার্পার, জনসন, মিচেল ওয়েন, লাচলান শ ও জ্যাম্পা। সামনে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সীমিত ওভারের লড়াই হলেও, অজিদের আসল নজর থাকবে ১৪ সপ্তাহের মধ্যে ১০ টেস্টের কঠিন সূচিতে শতভাগ সাফল্য অর্জনে।