উইমেনস বিগ ব্যাশ লিগে (ডব্লিউবিবিএল) হোবার্ট হারিকেনসের মুখোমুখি হয়েছিল মেলবোর্ন রেনেগেডস। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত এমন এক নাটকীয় পরিস্থিতিতে গিয়ে পৌঁছেছিল যা ক্রিকেটের ইতিহাসে বিরলতম ঘটনার জন্ম দিয়েছে। উইজডেনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেষ বলের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ম্যাচটি সুপার ওভারের দিকে গড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু একটি অত্যন্ত বিরল নো-বলের কারণে সেই সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যায় এবং মেলবোর্ন রেনেগেডস চার উইকেটের ব্যবধানে নাটকীয় জয় নিশ্চিত করে। ক্রিকেটপ্রেমী থেকে শুরু করে ধারাভাষ্যকাররাও এই আকস্মিক পরিবর্তনে হতবাক হয়ে যান।
ম্যাচটির শেষ বলের ঠিক আগের দৃশ্যপট ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। স্কোর লেভেল থাকার সুবাদে মেলবোর্ন রেনেগেডসের ব্যাটার ডিয়ান্দ্রা ডটিন নিকোলা কেরির করা ইনিংসের শেষ বলটিতে ব্যাট ছোঁয়াতে ব্যর্থ হন। হোবার্ট হারিকেনসের উইকেটকিপার লিজেল লি স্টাম্পের পেছন থেকে বলটি সংগ্রহ করেন। এই ঘটনাটিকে প্রথমে একটি সাধারণ ডট বল বলে মনে হয়েছিল এবং সবাই ধরে নিয়েছিল যে খেলাটি এবার সুপার ওভারে গড়াচ্ছে। মাঠের ধারাভাষ্যকারও অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন যে স্কোর সমান রয়েছে এবং দলগুলো এখন সুপার ওভারে যাচ্ছে।
তবে এই উত্তেজনার মধ্যেই অন-ফিল্ড আম্পায়াররা একটি সম্ভাব্য স্টাম্পিংয়ের সিদ্ধান্ত টিভি আম্পায়ারের কাছে রেফার করার সিদ্ধান্ত নেন। ঠিক সেই মুহূর্তে হোবার্ট হারিকেনসের ফিল্ডার ও বোলাররা ড্রেসিংরুমের উচ্ছ্বাস নিয়ে নিকোলা কেরিকে একটি দুর্দান্ত শেষ বল করার জন্য অভিনন্দন জানাতে এগিয়ে আসেন। সবাই যখন সুপার ওভারের মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই টিভি স্ক্রিনে এক অভাবনীয় মোড় বা প্লট টুইস্ট অপেক্ষা করছিল। ধারাভাষ্যকার তখন বলেছিলেন যে ক্রিকেট সত্যিই নিষ্ঠুর, কারণ তাঁরা একটি সুপার ওভার আশা করলেও মেলবোর্ন রেনেগেডস শেষ পর্যন্ত নাটকীয়ভাবে জয় ছিনিয়ে নেয়।
টিভি আম্পায়ারের সেই পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনায় এক চাঞ্চল্যকর সত্য উন্মোচিত হয়। রিপ্লেতে দেখা যায় যে উইকেটকিপার লিজেল লি যখন বলটি সংগ্রহ করেছিলেন, তখন তাঁর গ্লাভসগুলো স্টাম্পের ঠিক সামনে অবস্থান করছিল। এমসিসির ক্রিকেট আইনের ২৭.৩ ধারা অনুযায়ী, যা উইকেটকিপারের পজিশন বা অবস্থান নির্ধারণ করে, এটি সরাসরি একটি নো-বল হিসেবে গণ্য হয়। এই নিয়মে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে বোলারের বল ডেলিভারি করার মুহূর্ত থেকে শুরু করে ব্যাটারের ব্যাটে বা শরীরে লাগা কিংবা স্টাম্প অতিক্রম করার আগ পর্যন্ত উইকেটকিপারকে সম্পূর্ণভাবে স্ট্রাইকার প্রান্তের উইকেটের পেছনে থাকতে হবে।
### নিয়মের মারপ্যাচে শেষ মুহূর্তের নাটক
আইন অনুযায়ী, যদি উইকেটকিপার এই নিয়ম লঙ্ঘন করেন, তবে স্ট্রাইকার প্রান্তের আম্পায়ার বল ডেলিভারি হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব নো-বল ঘোষণা ও সংকেত দেবেন। লিজেল লি বলটি যখন স্ট্রাইকার প্রান্ত অতিক্রম করে তখন পুরোপুরি স্টাম্পের পেছনে ছিলেন না, যে কারণে অন-ফিল্ড আম্পায়ার বাধ্য হয়ে সেটিকে নো-বল ঘোষণা করেন। এই একটিমাত্র আধা-ইঞ্চির ভুল বা পজিশনগত ত্রুটি ম্যাচের পুরো ভাগ্যকে আমূল পাল্টে দেয়। হোবার্ট হারিকেনস দল তখন বিজয়ের উৎসবে মত্ত থাকলেও এই সিগনাল তাদের জন্য এক বড় ধাক্কা হয়ে আসে।
এই নো-বলের সুবাদে মেলবোর্ন রেনেগেডসের স্কোরে একটি অতিরিক্ত রান যোগ করা হয়। রান যোগ হওয়ার সাথে সাথে স্কোর লেভেল থেকে এক রান বেশি হয়ে যাওয়ায় রেনেগেডসের চার উইকেটের জয় নিশ্চিত হয়ে যায়। বোলার নিকোলা কেরি এবং হোবার্ট হারিকেনসের পুরো দল এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে স্তব্ধ হয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে পড়েন। উইজডেন জানিয়েছে, ক্রিকেটপ্রেমীরা এই ম্যাচের মাধ্যমে ক্রিকেটের এমন এক নিষ্ঠুর ও অপ্রত্যাশিত নিয়মকে সামনে থেকে উপভোগ করলেন যা সচরাচর দেখা যায় না।
ম্যাচটির এই অভাবনীয় সমাপ্তি ডব্লিউবিবিএল বা মেয়েদের বিগ ব্যাশ লিগের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। এর আগে গত নভেম্বর মাসেও মেলবোর্ন রেনেগেডস দল নাটকীয়ভাবে জয় তুলে নেওয়ার খবর সামনে এসেছিল। আমাদের মাঠের খবরের আর্কাইভ অনুযায়ী, গত ৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায় যে হেইলি ম্যাথিউসের নেতৃত্বে মেলবোর্ন রেনেগেডস হোবার্টের বিপক্ষে শেষ বলের থ্রিলারে জয় পেয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের ঘটনাটি আরও একবার প্রমাণ করল যে ক্রিকেটে শেষ বল পর্যন্ত লড়াই না থামলে যেকোনো মুহূর্তে পাশা উল্টে যেতে পারে।
ক্রিকেট বিশ্বের নজর এখন এই ধরনের রোমাঞ্চকর প্রতিযোগিতাগুলোর দিকে। একদিকে যখন ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ নিয়ে বিশ্বজুড়ে টিকিটের আবেদন ও উন্মাদনা তুঙ্গে—যেখানে আইসিসির তথ্যমতে ১৯৩টি দেশ থেকে ১২ কোটিরও বেশি টিকিটের আবেদন জমা পড়েছে—তখন ঘরোয়া লিগের এমন নাটকীয় ম্যাচগুলো ভক্তদের বাড়তি বিনোদন জোগাচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নানা নাটকীয়তা চলছে, যেমনটি সম্প্রতি পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে দেখা গিয়েছিল যেখানে ফখর জামান ও মিনহাজের বিধ্বংসী ইনিংসে পাকিস্তান শিরোপা জিতেছিল।
লিজেল লি এবং তাঁর দলের জন্য এই ম্যাচটি এক মিশ্র অভিজ্ঞতার বার্তা দিয়েছে। উইজডেনের অন্য একটি তথ্যে জানা গেছে, এই ঘটনার মাত্র দুই দিন আগে লিজেল লি রেকর্ড গড়া একটি নক খেলার পাশাপাশি জাতীয় টুর্নামেন্টে আম্পায়ারিংও করেছিলেন। ফলে ক্রিকেটের নানা ভূমিকায় তাঁর সম্পৃক্ততা সবসময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। তবে হোবার্ট হারিকেনসের বিপক্ষে এই ম্যাচের শেষ মুহূর্তের আম্পায়ারিং সিদ্ধান্ত এবং নো-বলের মারপ্যাচ দীর্ঘদিন ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
পরিশেষে বলা যায়, এই ম্যাচটি আবারও প্রমাণ করল যে ক্রিকেটের আইন কতটা কঠোর এবং সামান্য অসাবধানতা কতটা বড় ব্যবধান গড়ে দিতে পারে। উইজডেনের প্রতিবেদন অনুসারে, লাইভ স্কোর, ম্যাচ পরিসংখ্যান, কুইজ এবং গভীর বিশ্লেষণ পেতে দর্শকরা সবসময় উইজডেনের সাথে যুক্ত থাকতে পারেন। হোবার্ট এবং মেলবোর্নের মধ্যকার এই ম্যাচটি নিশ্চিতভাবেই উইজডেনের পাতায় এক অন্যরকম ইতিহাস হয়ে রইল, যা ক্রিকেটপ্রেমীদের দীর্ঘদিন বিনোদন ও আলোচনার খোরাক জোগাবে।