আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের অপেক্ষায় রয়েছেন জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটার আনতুম নাকভি। উইজডেনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানের বিপক্ষে আসন্ন দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের জন্য জিম্বাবুয়ের স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন তিনি। এর আগেও একাধিকবার জাতীয় দলের স্কোয়াডে ডাক পেলেও এখনও পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে লাল বলের জার্সি গায়ে মাঠে নামার সুযোগ হয়নি তার। ক্রিকেট অঙ্গনে তার এই অন্তর্ভুক্তি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, কারণ পেশাগত জীবনে তিনি একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত বাণিজ্যিক পাইলটও বটে।
২০২৩-২৪ মৌসুমে ঘরোয়া ক্রিকেটের লোগান কাপে হারারেতে টাস্কার্সের বিপক্ষে রাইনোসের হয়ে ৩১২ রান বা ৩০০ রানের বেশি রানের অনবদ্য এক ইনিংস খেলে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন নাকভি। উইজডেনের তথ্য অনুযায়ী, লোগান কাপের দীর্ঘ ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো ট্রিপল সেঞ্চুরি। শুধু তাই নয়, এটি এখনও পর্যন্ত জিম্বাবুয়ের মাটিতে নিজ দেশের কোনো ক্রিকেটারের করা একমাত্র প্রথম শ্রেণির ট্রিপল সেঞ্চুরি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়ে আছে।
তবে নাকভির ক্যারিয়ার কেবল একটি মাত্র বড় ইনিংসের ওপর নির্ভরশীল নয়। দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে তার ধারাবাহিকতা বেশ নজরকাড়া। উইজডেনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তিনি ৩৪ ইনিংসে ব্যাট করে মোট ১,৮৭১ রান সংগ্রহ করেছেন। তার চমকপ্রদ ব্যাটিং গড় হলো ৬০.৩৫। এই রান করার পথে তিনি ১৪টি পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস খেলেছেন, যা তার সামর্থ্য এবং উইকেটে টিকে থাকার ক্ষমতার প্রমাণ দেয়।
শুধু ব্যাট হাতেই নয়, বল হাতেও সমান কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকেন এই ক্রিকেটার। তার অফ-ব্রেক বোলিংয়ের সুবাদে তিনি দলে একজন প্রকৃত অলরাউন্ডারের মর্যাদা পেয়ে থাকেন। উইজডেনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২৪টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে বল হাতে তিনি ৬২টি উইকেট শিকার করেছেন। বল হাতে তার বোলিং গড় ২৬.৬৬। ২৭ বছর বয়সি এই ক্রিকেটারের লিস্ট এ ক্রিকেট এবং টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটেও বেশ ভালো রেকর্ড রয়েছে।
জাতীয় দলের হয়ে এর আগেও বেশ কয়েকবার স্কোয়াডে ডাক পেয়েছিলেন নাকভি। জিম্বাবুয়ে দল ২০২৪ সালে ঘরের মাঠে ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের স্কোয়াডে তাকে রেখেছিল, যদিও সেবার তিনি কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি। একইসঙ্গে গত বছর আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের স্কোয়াডেও তিনি ছিলেন, কিন্তু সেবারও অভিষেক হয়নি। তবে বর্তমান দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে তাকে নিয়ে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা এবং সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এবার তার আন্তর্জাতিক অভিষেক প্রায় নিশ্চিত বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে।
### আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিরল এক মাইলফলকের হাতছানি
আফগানিস্তানের বিপক্ষে আসন্ন এই সিরিজে যদি আনতুম নাকভির চূড়ান্ত অভিষেক হয়, তবে তিনি এক ঐতিহাসিক রেকর্ডের অংশ হবেন। উইজডেনের তথ্যমতে, তিনি হবেন পুরুষদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া প্রথম ক্রিকেটার। পাশাপাশি মূল ইউরোপ মহাদেশে জন্ম নেওয়া অষ্টম ক্রিকেটার হিসেবে টেস্ট ক্রিকেট খেলার গৌরব অর্জন করবেন তিনি। তার আগে মূল ইউরোপে জন্ম নেওয়া যে সাতজন ক্রিকেটার টেস্ট খেলেছেন তারা হলেন নরওয়ের 'বাস্টার' নুপেন, জার্মানির ডোনাল্ড কার ও পল টেরি, ইতালির টেড ডেক্সটার, ডেনমার্কের আমজাদ খান এবং পর্তুগালের ডিক ওয়েস্টকট ও মোইসেস হেনরিকস।
আনতুম নাকভির প্রাথমিক জীবন এবং বেড়ে ওঠার পথচলাও বেশ বৈচিত্র্যময়। এশিয়ান বংশোদ্ভূত ব্রাসেলসে জন্ম নেওয়া নাকভি মাত্র চার বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। অস্ট্রেলিয়াতেই তিনি তার পড়াশোনা এবং অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি একটি বাণিজ্যিক পাইলটের লাইসেন্স অর্জন করেন। পাইলট হিসেবে যোগ্যতা অর্জনের পর তিনি জিম্বাবুয়েতে চলে আসেন এবং সেখানে রাইনোসের হয়ে নিজের প্রথম শ্রেণির অভিষেক ম্যাচেই ১৪০ রান করে অপরাজিত থাকেন।
উইজডেনের এই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিশ্ব ক্রিকেটের বিভিন্ন খবরাখবর, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের লাইভ স্কোর, ম্যাচ পরিসংখ্যান, কুইজ এবং দলগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে সবসময় আপডেট থাকে সংশ্লিষ্ট মাধ্যমটি। তবে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে নাকভির অন্তর্ভুক্তি এবং তার পাইলট থেকে অলরাউন্ডার হয়ে ওঠার গল্পটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে এক অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে এই টেস্ট সিরিজটি জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অ্যাসাইনমেন্ট। গত বছরও আফগানদের বিপক্ষে স্কোয়াডে থাকা সত্ত্বেও অভিষেক না হওয়া নাকভির জন্য এটি নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার উপযুক্ত মঞ্চ হতে পারে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৬০-এর বেশি গড় এবং লিস্ট এ ও টি-টোয়েন্টির পারফরম্যান্স তাকে এক নির্ভরযোগ্য অলরাউন্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখন দেখার বিষয়, ২২ গজের লড়াইয়ে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চের চাপে তিনি তার সেই ঘরোয়া ফর্ম কতটা ধরে রাখতে পারেন।
সামগ্রিকভাবে, আনতুম নাকভির টেস্ট স্কোয়াডে ফেরা এবং অভিষেকের সম্ভাবনা জিম্বাবুয়ে দলের মিডল অর্ডার ও বোলিং আক্রমণকে বাড়তি শক্তি জোগাবে। দলের কোচিং স্টাফ ও নির্বাচকরা তার বহুমুখী প্রতিভার ওপর ভরসা রাখছেন। ক্রিকেটপ্রেমী ও বিশ্লেষকরা এখন অপেক্ষা করছেন সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটির জন্য, যখন বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া এবং ককপিট থেকে সরাসরি উইকেটে আসা এই ক্রিকেটার জিম্বাবুয়ের টেস্ট ক্যাপ মাথাতে তোলেন।