দ্য গার্ডিয়ান ক্রিকেট প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কেপ টাউন টেস্টের প্রথম দিনটি যদি একটি রোলারকোস্টার রাইডের মতো নাটকীয় হয়, তবে দ্বিতীয় দিনটি ছিল কিছুটা শান্ত গতির, যদিও পাহাড়ঘেরা এই ভেন্যুর আবহ অনুযায়ী দিনটিতেও ছিল নানা উত্থান-পতন। ম্যাচের দ্বিতীয় দিনে দুই দফায় দক্ষিণ আফ্রিকার বোলাররা জোড়া আঘাত হেনে অস্ট্রেলিয়ার সম্ভাবনাময় অবস্থানকে আটকে ফেলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু দুবারই দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে অজি ব্যাটাররা। শেষ পর্যন্ত জশ ইংলাস এবং অ্যালেক্স কেয়ারি অস্ট্রেলিয়াকে দক্ষিণ আফ্রিকার অলআউট হওয়া ৩২৯ রানের জবাবে চার উইকেটে ৩৩০ রান সংগ্রহ করে চালকের আসনে বসিয়ে দিয়েছেন। এখন ছয় উইকেট হাতে রেখে তৃতীয় দিনে নিজেদের সংগ্রহ আরও বাড়িয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
### সকালে ট্রাভিস হেডের ঝড় ও ম্যাথিউ রেনশর রক্ষণাত্মক প্রতিরোধ
দিনের প্রথম সেশনে ট্রাভিস হেড যেভাবে ব্যাট চালিয়েছেন, তাতে মনে হচ্ছিল আগের দিন দক্ষিণ আফ্রিকার এইডেন মার্করাম এবং মার্কুস অ্যাকারম্যান বিভ্রান্ত বোলিংয়ের সামনে যেভাবে ১৪০ রান তুলেছিলেন, হেড বুঝি সেই ধারা বজায় রাখবেন। অফ স্টাম্পের বাইরের বলগুলোতে হাত খোলা রেখে হেড সাতটি বাউন্ডারি আদায় করেন, যেখানে ভাগ্যের ছোঁয়াও ছিল বেশ ভালোই। অন্যদিকে তার নতুন উদ্বোধনী সঙ্গী ম্যাথিউ রেনশ সম্পূর্ণ বিপরীত মেজাজ প্রদর্শন করেন। ডারবানে মিডল অর্ডারে যেমন স্বচ্ছতা দেখিয়েছিলেন, ঠিক তেমনই নৈপুণ্য নিয়ে নতুন বল সামলিয়েছেন রেনশ। বল ছেড়ে দেওয়া এবং রক্ষণাত্মক খেলার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন কেন নির্বাচকরা জেক ওয়েদারাল্ডের বিকল্প হিসেবে তাকেই প্রথমে ওপেনিংয়ে দেখতে চেয়েছিলেন, যদিও পরবর্তীতে নিক ম্যাডিসনকে নিয়ে নির্বাচকদের সেই সংক্ষিপ্ত ও ব্যর্থ পরীক্ষা হয়েছিল।
হেডের ৪১ বলে করা রান এবং সামগ্রিক অবদান তার ব্যাটিং পজিশন নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও উসকে দেবে। আধুনিক মানদণ্ড অনুযায়ী একজন ওপেনারের গড় ৪৯ বেশ দুর্দান্ত হলেও, হেডের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান ভিন্ন কথা বলে। ম্যাচের প্রথম ইনিংসে তার গড় ২৩, দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৩, তৃতীয় ইনিংসে ৭১ এবং চতুর্থ ইনিংসে তা ৬০। ম্যাচ যখন এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছায় যা তার খেলার ধরনের সঙ্গে মানানসই, তখন হেড প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেন, কিন্তু শুরুর দিকে যখন কঠিন কন্ডিশনে টিকে থাকা জরুরি, তখন তিনি লম্বা সময় ব্যাট করতে পারেননি। মূল্যবান এই সম্পদকে কাজে লাগানোর সেরা উপায় হতে পারে ওপরের দিকে একজন রক্ষাকবচ বা শিল্ড রাখা, যাতে হেড মাঝের ওভারে নেমে ঝড় তুলতে পারেন।
### মারনাস লাবুশেনের ফর্মহীনতা এবং রিভিউ বিতর্ক
হেডের বর্তমান আরেকটি বড় সমস্যা হলো স্টাম্পে বল টেনে আনা। এদিন সাইমন হারমারের অফ স্পিনে একটি অদ্ভুত কাট করতে গিয়ে তিনি বোল্ড হন। গত ১৫ ইনিংসে এটি তার অষ্টম বোল্ড হওয়ার ঘটনা, যা এর আগের ৬৬ ইনিংসে ছিল মাত্র ২০ বার। একই ওভারে হারমার আবার আঘাত হানেন এবং মারনাস লাবুশেনকে স্লিপে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন। টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া মৌসুম শুরুর আগে তরুণ কাউকে সুযোগ দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে এটিই হতে পারে লাবুশেনের শেষ সুযোগ। লাবুশেনের মূল সমস্যা শুধু শূন্য রানে আউট হওয়া নয়, বরং তার টেকনিকের জড়তা। স্পিনের বিপক্ষে গতিশীলভাবে পা নড়ানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম করা একজন ব্যাটার এদিন যেন সিমেন্টে পা গেঁথে উইকেটে দাঁড়িয়েছিলেন এবং এমন একটি বলের পেছনে খামখেয়ালিভাবে ব্যাট চালাচ্ছিলেন যা স্টাম্পের অনেক পাশ দিয়ে চলে যেত। তাত্ত্বিকভাবে তাকে বাঁচানোর জন্য আরেকটি ইনিংস বাকি আছে, কিন্তু সেদিন তার ব্যাটিংয়ের যে ভঙ্গি দেখা গেছে, তাতে মনে হয়নি তিনি সেই সুযোগ সদ্ব্যবহার করার অবস্থায় আছেন।
ক্যামেরন গ্রিন ইনিংস পুনর্গঠনের জন্য উইকেটে আসেন, তবে জেরাল্ড কোয়েটজির বোলিংয়ে একটি ক্যাচ নিয়ে তৃতীয় আম্পায়ার নটআউট দেওয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকা দল বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছিল। দ্বিতীয় স্লিপে ফিল্ডিং করা হারমার নিশ্চিত ছিলেন যে ক্যাচটি সঠিক হয়েছে। রিপ্রেজগুলোতে দেখা গেছে, খেলোয়াড়ের আঙুল মাটির সমান্তরালে রেখে বল তালুতে জমা করার আগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে এর মিল রয়েছে। তবে এবার অনফিল্ড বা তৃতীয় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে তা আউট দেওয়া হয়নি। এই জুটি ভাঙার আগে অস্ট্রেলিয়া আরও ৮৫ রান যোগ করে। এর মধ্যে কাগিসো রাবাদার শর্ট বলের বারারেজের বিপক্ষে গ্রিন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে হুক শট খেলে পরপর দুটি ছক্কা ও একটি চার হাঁকান। হারমার রেনশকেও একটি অসাধারণ ডেলিভারিতে পরাস্ত করেছিলেন যা বাঁহাতি ব্যাটারের পাশ দিয়ে ঘুরে ব্যাক প্যাডে লাগে, কিন্তু উচ্চতার কারণে আম্পায়ার্স কল হিসেবে নটআউট থাকেন।
### জুটি গড়ার লড়াইয়ে ইংলাস ও কেয়ারির দৃঢ়তা
অবশেষে মার্কো জানসেন এই জুটির হতাশার অবসান ঘটান। অতিরিক্ত বাউন্সের কারণে রেনশের হাফ হার্টেড আপার কাটের টপ এজ হয়ে বল জমা পড়ার ঘটনাটি তৃতীয় আম্পায়ারের সাহায্য নিয়ে প্রমাণ করতে হয়। এরপর জানসেনের পরের ওভারে স্লিপে হারমারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন গ্রিন। চা বিরতির ঠিক আগে অস্ট্রেলিয়ার থিতু হওয়া দুই ব্যাটার ৭৪ এবং ৬৫ রান করে সাজঘরে ফেরেন। দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে তখনও ১৪৪ রানে পিছিয়ে থেকে ১৮৫ রানে চার উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল অস্ট্রেলিয়া, ফলে দলের জন্য বড় কিছু প্রয়োজন ছিল।
ঠিক তখনই উইকেটে আসেন দুই উইকেটরক্ষক-ব্যাটার জশ ইংলাস এবং অ্যালেক্স কেয়ারি। ইংলাস তার চিরাচরিত কাউন্টারপাঞ্চিং শৈলী বেছে নেন, অন্যদিকে কেয়ারি রক্ষণাত্মক খেলার পাশাপাশি সৃজনশীল শটের মাধ্যমে রান সংগ্রহ করতে থাকেন। দুই ব্যাটারই অর্ধশতকের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে একটি শক্ত জুটি গড়ে ওঠে। হারমারের বোলিংকে সহজে খেলা হয় এবং রাবাদাও ছিলেন কিছুটা অকার্যকর। ইংলাস ফিফটি পূরণের পর খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন এবং হারমার ও রাবাদা উভয়ের বলেই ছক্কা হাঁকান, পাশাপাশি কোয়েটজির বলে পরপর দুটি চার মারেন।
### দিনের শেষ চিত্র ও তৃতীয় দিনের সম্ভাবনা
এই জুটিতে কিছু বিপদের মুহূর্তও ছিল, যেমন হারমারের একটি বল ইংলাসের প্রায় অফ স্টাম্প উড়িয়ে দিচ্ছিল এবং কয়েকটি টপ এজ নিরাপদ জায়গায় গিয়ে পড়েছিল। তবে অস্ট্রেলিয়ার রান তোলার গতি দক্ষিণ আফ্রিকার ফিল্ডকে ছড়িয়ে দিতে বাধ্য করে। আগের দিন সন্ধ্যায় মিচেল স্টার্কের নতুন বলের ধ্বংসাত্মক স্পেলের বিপরীতে দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন বলের ব্যবহার কেবল রান তোলার গতিকেই বাড়িয়ে দিয়েছিল। দিন শেষে এই জুটির রান ছিল অপরাজিত ১৪৫, যেখানে কেয়ারি অপরাজিত ছিলেন ৫১ রানে এবং ইংলাস ৮৫ রানে। ম্যাচের প্রথম দিনে অধিনায়ক প্যাট কামিন্স নিজের ব্যাটিং ক্ষমতার ওপর পর্যাপ্ত আত্মবিশ্বাসের অভাবে টস জিতে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা দিন শেষে সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তৃতীয় দিনে অস্ট্রেলিয়া কি একটি সিদ্ধান্তমূলক লিডের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, নাকি দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের দ্রুত আটকে ফেলতে সক্ষম হয়।