স্পোর্টস্টার (দ্য হিন্দু)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিরিজের নির্ধারণী তৃতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কেপ টাউনের নিউল্যান্ডসে বেশ কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা। তৃতীয় দিনের খেলা শেষে তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে চার উইকেটে ১৪০ রান। প্রথম ইনিংসের ঘাটতির সুবাদে তাদের প্রকৃত লিড এখন মাত্র ৪০ রান। দিনের একেবারে শেষ মুহূর্তে অজি স্পিনার নাথান লায়নের ঘূর্ণিতে টেম্বা বাভুমার উইকেট পতনের মাধ্যমে ম্যাচের পাল্লা পুরোপুরি অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
দিনের শুরুটা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ব্যাটিং দিয়ে। আগের দিন চার উইকেটে ৩৩০ রান নিয়ে খেলা শুরু করা অস্ট্রেলিয়া শেষ পর্যন্ত সব উইকেট হারিয়ে ৪২৯ রান সংগ্রহ করে। ফলে তারা প্রথম ইনিংসের সুবাদে ১০০ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড পায়। যদিও তারা তাদের শেষ ছয় উইকেট হারায় মাত্র ৯৯ রানের ব্যবধানে। দিনের প্রথম ঘণ্টায় স্পিনার সাইমন হারমারের বলে দুই সেট ব্যাটার সাজঘরে ফেরেন, যা দক্ষিণ আফ্রিকাকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও শেষ রক্ষা হয়নি।
অস্ট্রেলিয়ার এই বড় সংগ্রহের পেছনে বড় ভূমিকা রাখেন জশ ইংলিশ। তিনি অবিচ্ছিন্ন ৮৫ রান নিয়ে দিন শুরু করে ১৩২ বলে নিজের দ্বিতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নেন। স্পোর্টস্টার জানিয়েছে, তার দুটি টেস্ট সেঞ্চুরিই এসেছে দেশের বাইরে, যার মধ্যে গত বছর শ্রীলঙ্কায় অভিষেকে তিনি ১০২ রান করেছিলেন। ইংলিশ তার ইনিংসে ১১টি চার ও দুটি ছক্কা হাঁকান। পঞ্চম উইকেটে অ্যালেক্স কেয়ারির সঙ্গে তার ১৮৫ রানের দুর্দান্ত জুটি অস্ট্রেলিয়াকে সাড়ে তিন শ রানের গণ্ডি পার করে দেয়।
অ্যালেক্স কেয়ারি ১৬৮ বলে ৮টি চারের সাহায্যে ৮০ রান করে সাইমন হারমারের শিকার হন এবং স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। এরপর কাগিসো রাবাদার বলে শূন্য রানে এলবিডব্লিউ হন প্যাট কামিন্স এবং জেরাল্ড কোয়েটজির বলে উইকেটকিপারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন মিচেল স্টার্ক। মধ্যাহ্নভোজের বিরতির সময় অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ দাঁড়ায় ৪১১ রান আট উইকেটের বিনিময়ে। মধ্যাহ্নভোজের পর অস্ট্রেলিয়া কেবল আর ২৯ রান যোগ করতে পারে। কুপার কনরলি ৮৩ বলে তিনটি চারের সাহায্যে ২৯ রান করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে সাইমন হারমার ১০৪ রান খরচ করে চারটি উইকেট নেন এবং মার্কো ইয়ানসেন ৬০ রান দিয়ে নেন তিনটি উইকেট।
### দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় ইনিংস ও ব্যাটিং বিপর্যয়
প্রথম ইনিংসে ১০০ রানে পিছিয়ে থেকে ব্যাটিংয়ে নামা দক্ষিণ আফ্রিকা শুরুতেই বিপদে পড়ে। ইনিংসের তৃতীয় ওভারেই মিচেল স্টার্কের বলে এইডেন মার্করাম মিড অফে ট্রাভিস হেডের হাতে সহজ ক্যাচ দিয়ে আউট হন। প্রথম ইনিংসে মার্করামের একটি সহজ ক্যাচ ফেলে দিয়েছিলেন হেড, তবে দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি কোনো ভুল করেননি। স্টার্কের বলে এই উইকেট পতনের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম ইনিংসের ঘাটতি মেটানোর আগেই তিন উইকেট হারিয়ে বসে।
দ্বিতীয় সেশনের শেষদিকে চা-বিরতির ঠিক আগে ডেভিড বেডিংহাম সাজঘরে ফিরে যান। জশ হ্যাজলউডের শর্ট বল পুল করতে গিয়ে টপ-এজ হয়ে ডিপে নাথান লায়নের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। এরপর মার্কুস অ্যাকারম্যান এবং অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা মিলে চা-বিরতির আগের ও পরের সময়টাতে ইনিংসকে কিছুটা স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন। প্রথম ইনিংসে দুর্দান্ত ৯৫ রান করা অ্যাকারম্যান এই ইনিংসেও মাত্র ৬৪ বলে আটটি চারের সাহায্যে তার ফিফটি তুলে নেন।
ম্যাচটিকে বাঁচানোর লড়াইয়ে অ্যাকারম্যান ৮০ বলে ৬২ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলে দলকে এগিয়ে নেন। তবে মিচেল স্টার্কের একটি ভয়ঙ্কর বাউন্সার তার হেলমেটের গ্রিলে সজোরে আঘাত হেনে স্লিপে ক্যাচে পরিণত হলে ৯৫ রানে তিন উইকেট হারিয়ে বসে প্রোটিয়ারা। মাঠে তখন দলের রান কিছুটা সমৃদ্ধ হলেও অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণ ও স্পিনারের সামনে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা এবং ম্যাথিউ ব্রিটজকে এরপর নাথান লায়নের তীক্ষ্ণ টার্ন সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। প্যাট কামিন্সের বলে বেশ কিছু ক্লোজ চান্স বা ক্যাচের সুযোগ তৈরি হলেও তারা কোনো রকমে দিন পার করার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। বাভুমা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ১১৫ বল খেলে ৩৫ রান সংগ্রহ করেন। তবে দিনের খেলা শেষ হওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে ঠিক সতীর্থদের পথ অনুসরণ করে নরম শটে উইকেট বিলিয়ে দেন তিনি।
লায়নের লেগ সাইডে বল সুইপ করতে গিয়ে ব্যাটে-বলে করতে ব্যর্থ হন বাভুমা এবং ব্যাট ও প্যাডের ফাঁক দিয়ে বল সোজা স্টাম্পে আঘাত হানে। এর মাধ্যমেই তার ১১৫ বলের ধৈর্যশীল ইনিংসটির সমাপ্তি ঘটে। এই নিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে লায়ন সাতবার বাভুমাকেট শিকার করলেন এবং চলতি ম্যাচের দুই ইনিংসেই তাকে আউট করলেন অজি এই স্পিনার। এর আগে এইডেন মার্করাম ও ডেভিড বেডিংহামও একইভাবে সহজ উইকেটে বিদায় নিয়েছিলেন।
দিনের খেলা শেষ হওয়ার সময় উইকেটে অপরাজিত ছিলেন ম্যাথিউ ব্রিটজকে (১৯ রান) এবং রায়ান রিকেলটন (৮ রান)। দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ চার উইকেটে ১৪০ রান হওয়ায় তাদের সার্বিক লিড দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪০ রানে। অস্ট্রেলিয়ার পেসার মিচেল স্টার্ক ২৯ রান খরচ করে দুটি উইকেট তুলে নেন এবং এই ম্যাচে তার মোট উইকেট সংখ্যা দাঁড়ায় আটটিতে।
### সিরিজের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ সমীকরণ
তিন ম্যাচের এই টেস্ট সিরিজটি বর্তমানে ১-১ সমতায় রোমাঞ্চকর এক পর্যায়ে রয়েছে। সিরিজের প্রথম টেস্টে ডারবানে অস্ট্রেলিয়া দল ২১৪ রানের বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেছিল। পরবর্তীতে ঘুরে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা জেকেবেরার দ্বিতীয় টেস্টে এক ইনিংস ও ৩১ রানের ব্যবধানে দুর্দান্ত জয় তুলে নেয়। কেপ টাউনের বর্তমান এই তৃতীয় টেস্টটি তাই দুই দলের জন্যই সিরিজ নির্ধারণী ফাইনাল হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
পিচের আচরণ নিয়ে স্পোর্টস্টার জানিয়েছে, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কেপ টাউনের পিচ ব্যাটিংয়ের জন্য আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে চতুর্থ ও পঞ্চম দিনে অস্ট্রেলিয়ার সামনে লক্ষ্য নির্ধারণ বা রান তাড়া করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের বাকি থাকা ছয় উইকেট নিয়ে লিড কতদূর বাড়াতে পারে এবং অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যাটিং কেমন হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে এই মর্যাদাপূর্ণ সিরিজের ভাগ্য।