হিন্দুস্তান টাইমস ক্রিকেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিউজিল্যান্ড ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে ২-৩ ব্যবধানে হেরে গেলেও গ্লেন ফিলিপস উভয় দলের মধ্যে স্পষ্টভাবেই সেরা খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি এই সিরিজে মোট ৩৪১ রান করে সিরিজসেরার পুরস্কার অর্জন করেছেন। ডানহাতি এই ব্যাটার পাঁচ ম্যাচের দ্বিযাক্ষিক সিরিজে সর্বোচ্চ রান করার ক্ষেত্রে ফিল সল্টের আগের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন।
সিরিজের পাঁচ ইনিংসে তার ব্যাট থেকে এসেছে যথাক্রমে ৮২ রান (অপরাজিত), ৭০ রান, তুলনামূলক শান্ত ১৭ রান, বিধ্বংসী ১০৭ রান এবং অপরাজিত ৬৫ রান। পাঁচ ইনিংসে চারটি অর্ধশতক বা তার বেশি রান করার পাশাপাশি তিনি মাত্র তিনবার আউট হয়েছেন। তার ব্যাটিং গড় ছিল ১১৩.৬৭ এবং স্ট্রাইক রেট ১৮৫.৩৩, যা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ক্ষেত্রে অত্যন্ত অসাধারণ পরিসংখ্যান।
এই পরিসংখ্যানগুলো এমন একজন ব্যাটারকে ফুটিয়ে তোলে যিনি এখন আর কেবল ৩০ বা ৪০ রানের সংক্ষিপ্ত বিস্ফোরক ইনিংসের ওপর নির্ভর করেন না। ফিলিপস বারবার তার শুরু পাওয়া ইনিংসগুলোকে বড় স্কোড়ে রূপান্তর করেছেন এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ম্যাচের ফলাফল প্রভাবিত করার পথ খুঁজে নিয়েছেন। ভারতের বিপক্ষে এই সিরিজটি কেবল তার একটি সাময়িক ভালো ফর্ম ছিল না, বরং এটি গত কয়েক বছর ধরে তৈরি হওয়া তার ব্যাটসম্যান হিসেবে বিবর্তনেরই সাম্প্রতিকতম নিদর্শন।
গ্লেন ফিলিপসের ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি পরিসংখ্যানগুলোর তুলনা করলে তার এই অগ্রগতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালে তিনি ১০ ম্যাচে ২০৮ রান করেছিলেন যেখানে তার গড় ছিল ২৩.১১ এবং স্ট্রাইক রেট ১২০.৯৩। এর পরের বছর তিনি ১৬ ম্যাচে ৩৫৪ রান করেন, যার গড় ছিল ৩২.১৮ এবং স্ট্রাইক রেট ছিল ১২৮.২৬। তবে কুঁচকির চোটের কারণে তিনি ২০২৫ সালের বেশিরভাগ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন।
২০২৬ সালে এসে তার পারফরম্যান্স সম্পূর্ণ অন্য এক উচ্চতায় পৌঁছেছে। তিনি ১৭টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ৫২৬ রান সংগ্রহ করেছেন, যেখানে তার গড় ৪৩.৮৩ এবং স্ট্রাইক রেট ১৬০.৮৬। ২০২৩ সালের তুলনায় তার গড় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং প্রতি ১০০ বলে তার রান তোলার হার প্রায় ৪০ রান বেড়েছে। তার রান বৃদ্ধির বিষয়টি কেবল বেশি বাউন্ডারি হাঁকানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ভালো শুরু পাওয়া ইনিংসগুলোকে বড় স্কোড়ে রূপান্তর করার মধ্যেই নিহিত ছিল।
### ইনিংস গড়ার কৌশল ও মাঝের ওভারের পরিসংখ্যান
ফিলিপস কীভাবে টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে ইনিংস গড়ে তোলেন, তার শেকড় রয়েছে তার রান তোলার দক্ষতার মধ্যে। ফিলিপস তার টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক রানের প্রায় ৬৪ শতাংশই সংগ্রহ করেছেন ৭ থেকে ১৫ ওভারের মধ্যে, যেখানে তার স্ট্রাইক রেট ১৪৭। শুরু থেকেই মারমুখী হতে যাওয়ার পরিবর্তে পরিসংখ্যান বলছে যে তিনি এই সময়টাতে ক্রিজে থিতু হতে এবং বোলিং বুঝে নিতে সময় নেন, এরপর গিয়ার পরিবর্তন করেন।
১৫ থেকে ২০ ওভারের মধ্যে তার স্ট্রাইক রেট বেড়ে দাঁড়ায় ১৯০.৭-এ, যা রান জমানোর পাশাপাশি ইনিংস শেষ করার বিস্ফোরক ক্ষমতাকে জোরালো করে তোলে। এই সমন্বিত সামর্থ্য নিউজিল্যান্ডকে এমন একজন ব্যাটার দেয় যিনি কেবল প্রথম বল থেকেই আক্রমণ করা খেলোয়াড়ের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। ফিলিপস চাপ সামলাতে পারেন, বোলিং বিকল্প মূল্যায়ন করতে পারেন এবং গিয়ার বদলানোর আগে নিজের ইনিংসটি ধীরে ধীরে নির্মাণ করতে পারেন।
অকল্যান্ডে তার ৪৯ বলে ১০৭ রানের ইনিংসটি ভারত সিরিজের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ ছিল, তবে তার অপরাজিত ৮২ ও ৬৫ রানের ইনিংসগুলো প্রমাণ করেছে যে তিনি আক্রমণাত্মক মানসিকতা বজায় রেখেই ইনিংস সাজাতে সক্ষম। সিরিজের সময় ফিলিপসের সাথে ড্রেসিংরুম ভাগ করে নেওয়া টিম সাইফার্ট মধ্যবর্গের এই ব্যাটারকে আটকানো কেন কঠিন, তা নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
ম্যাচ শেষে টিম সাইফার্ট বলেন, তিনি শুরুতেই মারমুখী হয়ে ওঠেননি, বরং নিজেকে থিতু করেছেন এবং ইনিংসজুড়ে নিজের পছন্দের ম্যাচ-আপ বেছে নিয়েছেন। গ্লেন ফিলিপসের শক্তির জায়গা নিয়ে কখনো প্রশ্ন ওঠেনি, কিন্তু সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে খেলায় ধারাবাহিকতা আনার ক্ষমতাই তাকে একজন বিপজ্জনক ব্যাটার হিসেবে গড়ে তুলেছে।
### ওয়ানডে ও টেস্ট ফর্ম্যাটে সম্ভাবনা
ভারতের বিপক্ষে রেকর্ড গড়া এই টি-টোয়েন্টি সিরিজে কেবল তার রানই নয়, বরং তিনি কীভাবে সেই রানগুলো গড়ে তুলেছেন সেটিই ছিল মূল বিষয়। বোলিং পড়া, চাপ সামলানো এবং গতি বাড়িয়ে দেওয়ার এই সামর্থ্য তাকে আসন্ন ওয়ানডে ও টেস্ট সিরিজেও সমানভাবে হুমকিস্বরূপ করে তুলেছে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে ওয়ানডে গড় বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৫৩.৮৫, যেখানে তিনি ১৪ ম্যাচে ৩৭৭ রান করেছিলেন। আর ২০২৫-২৬ মৌসুমে তিন ওয়ানডেতে সেঞ্চুরিসহ তার গড় ছিল ৭৫।
চলতি বছরের শুরুতে ইন্দোরে ভারতের বিপক্ষে তার ১০৬ রানের ইনিংসটি ইনিংস টেনে নেওয়ার সামর্থ্য ফুটিয়ে তুলেছিল। নিউজিল্যান্ড ৫৮ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ার পর তিনি ড্যারিল মিচেলের সাথে ২১৯ রানের জুটি গড়েন এবং পরে রান বাড়িয়ে ১৩৭ রান করেন। ইনিংসের পর ফিলিপস নিজে বলেন, আপনি ওয়ানডেতে সময় নিতে পারেন, ইনিংস বড় করতে পারেন এবং এরপর নিজের শটস খেলতে পারেন।
ওয়ানডে সিরিজ থেকে রাচিন রবীন্দ্র এবং মার্ক চ্যাপম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটাররা চোটে পড়ে বাদ পড়ায় নিউজিল্যান্ডের এমন একজন ব্যাটার দরকার যিনি দায়িত্ব কাঁধে নিতে পারেন এবং বড় ইনিংস গড়তে পারেন। গ্লেন ফিলিপস হয়তো তাদের হুবহু বিকল্প নন, তবে টি-টোয়েন্টিতে পুরো ব্যাটিং অর্ডারের দায়িত্ব যেভাবে তিনি নিয়েছেন, তা প্রমাণ করে যে কিউইরা ওয়ানডে সিরিজেও তাকে তাদের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে ভরসা করতে পারে।
অন্যদিকে টেস্ট ফরম্যাট একটি ভিন্ন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করলেও ফিলিপস সেখানেও উৎসাহব্যঞ্জক লক্ষণ দেখিয়েছেন। ১৯ টেস্টে তিনি ৩৫.৪১ গড়ে ৯৫৬ রান করেছেন। ২০২৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই টেস্টে তিনি সেঞ্চুরিসহ ৬০.৩৩ গড়ে ১৮১ রান করেন। টেস্ট ফরম্যাটে তার অফ স্পিন বোলিং তাকে আরও বেশি আলাদা করে তোলে। ১৯ ম্যাচে তিনি ৩৩ উইকেট শিকার করেছেন, যার মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি পাঁচ উইকেট শিকারও রয়েছে।
এই ফরম্যাটের প্রতি তার ক্রমবর্ধমান অনুরাগ নিয়ে ফিলিপস বলেছেন যে, তিনি বোলিং শুরু না করা পর্যন্ত বুঝতেই পারেননি টেস্ট ক্রিকেটকে তিনি কতটা বেশি ভালোবাসেন। ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে তার রান তোলার গতি আটকে রাখা। টি-টোয়েন্টি সিরিজ দেখিয়ে দিয়েছে থিতু হওয়ার পর তিনি কতটা বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন। ওয়ানডেতে তিনি পাওয়ার বাড়ানোর আগে ইনিংস গড়তে পারেন, আর টেস্টে তিনি নিজের অলরাউন্ডিং দক্ষতা দিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারেন।